দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে দ্রুত পরিবর্তনের হাওয়া বইছে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের ফলে। মোবাইল ব্যাংকিং, কিউআর কোডভিত্তিক লেনদেন এবং অনলাইন আর্থিক সেবার বিস্তারে নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর থেকে শুরু করে গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা এখন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সহজেই আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করছেন। অর্থনীতিবিদদের মতে, ডিজিটাল আর্থিক সেবার এই বিস্তার গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন গতিশীলতা দিয়েছে এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের শুরুতে নিবন্ধিত এমএফএস অ্যাকাউন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৯৩ লাখে, যা এক বছর আগে ছিল প্রায় ২১ কোটি ৯০ লাখ। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে প্রায় দুই কোটির বেশি নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন ডিজিটাল আর্থিক সেবায়।
একই সাথে লেনদেনের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন হচ্ছে এই সেবার মাধ্যমে- যা দেশের ডিজিটাল আর্থিক খাতের দ্রুত সম্প্রসারণের স্পষ্ট ইঙ্গিত।
কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফেজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, এই লেনদেনের বড় অংশ এখন গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রবাহিত হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে মোবাইল ব্যাংকিং দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তার মতে, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে কৃষি খাতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে কৃষকদের ফসল বিক্রির টাকা পেতে সময় লাগত এবং নগদ অর্থ বহনের ঝুঁকি থাকত। এখন ব্যবসায়ীরা সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাঠিয়ে দিচ্ছেন।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে কৃষিপণ্যের বাজারে স্বচ্ছতা বেড়েছে। কৃষকরা সরাসরি লেনদেন করতে পারছেন এবং দ্রুত অর্থ পাচ্ছেন। সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষক আবদুল কাদের বলেন, আগে ধান বিক্রির পর নগদ টাকা নিতে হতো, এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাওয়ায় সময় ও ঝুঁকি দুটোই কমেছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্রামীণ অর্থনীতির বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসা। হাট-বাজারের দোকান, মুদি ব্যবসা, কৃষি উপকরণ বিক্রেতা- সবখানেই এখন ডিজিটাল পেমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৪ লাখের বেশি মোবাইল আর্থিক সেবা এজেন্ট কাজ করছেন, যাদের বড় অংশ গ্রামীণ এলাকায় অবস্থান করছেন। ফলে গ্রামের মানুষ সহজেই অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে পারছেন।
গ্রামীণ বাজারে এখন অনেক দোকানেই কিউআর কোড টাঙানো দেখা যায়। ক্রেতারা মোবাইল ফোন দিয়ে স্ক্যান করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেমেন্ট সম্পন্ন করছেন। এতে নগদ অর্থের ব্যবহার কমছে এবং লেনদেনের গতি বাড়ছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার কারণে গ্রামীণ নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। অনেক নারী ঘরে বসেই অনলাইন ব্যবসা পরিচালনা করছেন এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ গ্রহণ করছেন। বগুড়ার শেরপুর উপজেলার কাফুরা গ্রামের কৃষি উদ্যোক্তা তাওহিদুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে ব্যাংকিং সেবা নিতে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হতো, এখন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সহজেই লেনদেন করা যাচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, এই ব্যবস্থা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বাস্তবায়নেও ডিজিটাল পেমেন্ট কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ভাতা, কৃষি প্রণোদনা ও বিভিন্ন সহায়তার অর্থ এখন সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে।
ডিজিটাল আর্থিক সেবার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বেও উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল মানি লেনদেনের বড় একটি অংশ এখন বাংলাদেশে সম্পন্ন হচ্ছে। ২০২৪ সালের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে গড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি ডিজিটাল লেনদেন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি। আগে অনেক মানুষ ব্যাংকিং সেবার বাইরে ছিল, এখন তারা সহজেই আর্থিক লেনদেন করতে পারছেন। তার মতে, এখনো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকলেও ডিজিটাল সেবার বিস্তারে এই ব্যবধান দ্রুত কমছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। গ্রামাঞ্চলের অনেক এলাকায় এখনো ইন্টারনেট অবকাঠামো দুর্বল এবং ডিজিটাল লেনদেন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এ ছাড়া সাইবার প্রতারণার ঘটনাও মাঝে মাঝে সামনে আসছে। প্রতারক চক্র বিভিন্ন কৌশলে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারকারীদের লক্ষ্য করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থাকে আরো নিরাপদ করতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং জনগণের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো জরুরি। তারা বলেন, এই ব্যবস্থার সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক বছরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরো বড় পরিবর্তন আসবে। কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, খুচরা ব্যবসা ও সেবা খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব আরো বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নগদনির্ভর অর্থনীতি থেকে ধীরে ধীরে ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। আর এই পরিবর্তনের ঢেউ ইতোমধ্যেই গ্রামবাংলার অর্থনীতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।



