জঙ্গল সলিমপুরে যৌথবাহিনীর ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দিলো সন্ত্রাসীরা

৩ ঘণ্টা বন্দুকযুদ্ধ আটক ২৫

Printed Edition

চট্টগ্রাম ব্যুরো

‘রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র’ খ্যাত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য র‌্যাব-পুলিশের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর একটি ক্যাম্প ৩১ মে উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের। এর আগেই রোববার দিবাগত রাত ১টায় কয়েক শত সন্ত্রাসী গুলি ছুড়তে ছুড়তে আক্রমণ করে সেই ক্যাম্পে। এক্সক্যাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ক্যাম্পটি। যৌথবাহিনীর সাথে সন্ত্রাসীদের প্রায় তিন ঘণ্টাব্যাপী চলা এ বন্দুকযুদ্ধের পর আবার ওই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। ঘটনাস্থল থেকে ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। র‌্যাব-৭ চট্টগ্রামের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান জানান, সেখানে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়কের পাশেই পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুর ও আলীনগর। জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, এখানে তিন হাজার ১০০ একর খাসজমি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বিভিন্ন ভূমিদস্যু ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। গত ১৯ জানুয়ারি সন্ত্রাসী ইয়াসিনকে গ্রেফতার অভিযানে গিয়ে বেধড়ক পিটুনিতে প্রাণ হারান র‌্যাব-৭ এর গোয়েন্দা টিমের প্রধান নায়েব সুবেদার মো: মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া। আহত হন আরো তিন র‌্যাব সদস্য। এরপর ৯ মার্চ সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশ মিলে ২০০ সদস্যের বিশাল যৌথবাহিনী সেখানে সাঁড়াশি অভিযান চালায়। ইয়াসিনকে গ্রেফতার করতে না পারলেও জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে বলে ঘোষণা দেয়। সেখানে যৌথবাহিনীর দু’টি অস্থায়ী ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ ছাড়া পুলিশ একাডেমি, কারাগারসহ আরো বিভিন্ন সরকারি স্থাপনা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া হয়।

গভীর রাতে হামলা : রোববার গভীর রাতে সন্ত্রাসীরা অতর্কিতে এসে গুলি ছোড়ে র‌্যাবের ক্যাম্পে। এরপর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় ক্যাম্পের দেয়ালসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যাতে ঘটনাস্থলে অভিযান চালাতে না পারেন, সেই লক্ষ্যে লিংক রোডে জঙ্গল সলিমপুরের প্রবেশমুখ থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে খেজুরতলা এলাকায় দুই স্থানে, এর আধা কিলোমিটার দূরে পাথরিঘোনা এলাকা এবং আরো এক কিলোমিটার পরে আলীনগর চৌরাস্তার মোড়ে রাস্তা কেটে ফেলা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সন্ত্রাসীরা পাহাড়ের ওপর থেকে প্রথমে গুলি শুরু করে। তারপর দুই দিক থেকে গুলি ছুড়তে ছুড়তে আসতে থাকে। পরে ট্রাক আর এক্সক্যাভেটর নিয়ে ক্যাম্পটি গুঁড়িয়ে দেয়। এ সময় তারা ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে উল্লাস করতে থাকে।

র‌্যাব জানিয়েছে, রাস্তা কেটে দেয়াসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও রাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান চালান আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। র‌্যাবের দাবি, ‘সন্ত্রাসী’ ইয়াসিন বাহিনীর দুই শতাধিক সদস্য এ হামলার সাথে জড়িত। হামলার পর যৌথবাহিনী অভিযান চালিয়ে কমপক্ষে ২৫ জনকে আটক করে। সন্ত্রাসীদের ফেলে যাওয়া দু’টি মোটরসাইকেল, দু’টি এক্সক্যাভেটর ও একটি ট্রাক জব্দ করা হয়। বর্তমানে এলাকাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

গতকাল সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জঙ্গল সলিমপুরে এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে র‌্যাব ও যৌথ বাহিনীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে রাস্তার অন্তত চারটি স্থানে বড় গর্ত তৈরি করে রাখে। যা ছিল দু’টি ক্যাম্পের ঠিক মাঝামাঝি জায়গায়। পাঁচ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই তারা এই কাজটি করেছে। এতে যানবাহন নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি। পরে সদস্যরা হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তবে সেই সুযোগে মূল সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়।

র‌্যাব অধিনায়ক জানান, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে র‌্যাব, জেলা পুলিশ, রেঞ্জ রিজার্ভ পুলিশ (আরআরএফ) ও এপিবিএনের সমন্বয়ে যৌথ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বর্তমানে ওই এলাকায় প্রায় ১৫০ জন সদস্য অবস্থান করছেন এবং পরিস্থিতি এখন স্বাভাবিক রয়েছে।

যৌথবাহিনীর ক্যাম্প ৩১ মে উদ্বোধন : আলীনগর প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্যাম্প থেকে পূর্বে ৫০ গজের মতো গেলে যৌথবাহিনীর নতুন সার্বক্ষণিক ক্যাম্পটি গড়ে তোলা হয়েছিল। পাকা পিলারের সাথে চারদিকে টিনের ঘেরা দিয়ে ক্যাম্পটি নির্মাণ করা হয়। ক্যাম্পটিতে প্রতি শিফটে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করছিলেন র‌্যাব, জেলা পুলিশ ও এপিবিএনের পাঁচজন করে সদস্য মিলে ১৫ জন। পুলিশের সমন্বয়ে যৌথবাহিনীর এ ক্যাম্প ৩১ মে উদ্বোধন করার কথা ছিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের। রোববার সকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ কর্মসূচির বিষয়টি চূড়ান্ত হয়। রাতেই সন্ত্রাসীবাহিনীরা ওই ক্যাম্পে হামলা চালায় এবং এক্সক্যাভেটর দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় ক্যাম্পটি।

এ অবস্থায় ৩১ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যৌথবাহিনীর ক্যাম্প উদ্বোধন কর্মসূচি বহাল থাকছে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। র‌্যাব-৭ অধিনায়ক ও এসপি উভয়ে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কর্মসূচি পালন করা যাবে। নিরাপত্তার কোনো ঘাটতি হতে তারা দেবেন না।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম বললেন, নতুন এই ক্যাম্পটার ওপর সন্ত্রাসীদের যথেষ্ট ক্ষোভ ছিল। পুলিশের শক্ত প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা টিকতে না পেরে দ্রুত পাহাড়ের দিকে পালিয়ে যায়।