যুদ্ধবিরতি আলোচনার তৃতীয় দিনেও থেমে নেই গাজায় ইসরাইলি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • বিনিময় চুক্তির জন্য বন্দীদের নামের তালিকা হস্তান্তর করেছে হামাস
  • যুদ্ধ অবসানের নিশ্চয়তা চায় হামাস, নেতানিয়াহুর কণ্ঠে ভিন্ন সুর
  • যুদ্ধবিরতির আলোচনা ইতিবাচক হচ্ছে, ইঙ্গিত মিসরের প্রেসিডেন্টের
  • গাজায় নির্বিচার হামলায় নিহত শিশুর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়াল

মিসরের শারম আল-শেইখে তিন দিন ধরে ট্রাম্পের দেয়া ২০ দফা যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছে হামাস ও ইসরাইলি প্রতিনিধিদল। এই বৈঠকের মাঝেই ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় মঙ্গলবার থেকে গতকাল বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গাজা উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে কমপক্ষে আটজন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৬১ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

রাফাহর উত্তরে একটি ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রের সামনে সাহায্যের অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর গুলিবর্ষণে অন্তত একজন নিহত এবং আরো কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নাসের হাসপাতালের সূত্র, যা আলজাজিরা আরবিকে জানানো হয়েছে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থাও একটি চিকিৎসা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, শাকুশ এলাকায় খাবারের জন্য অপেক্ষায় থাকা মানুষের ওপর ইসরাইলি বাহিনীর গুলি একজনের মাথায় গুরুতর আঘাত হানে। শাকুশ এলাকা রাফাহর উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটছে এমন সময়ে, যখন আলোচনা চলছে।

বিনিময় চুক্তির জন্য বন্দীদের নামের তালিকা হস্তান্তর করেছে হামাস : যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজাযুদ্ধ শেষ করার পরিকল্পনা নিয়ে মিসরে চলমান আলোচনার বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। বুধবার সংগঠনটি জানিয়েছে, এই পরিকল্পনার বন্দী অদলবদল চুক্তির অংশের জন্য তারা ইসরাইলি বন্দী ও ফিলিস্তিনি বন্দীদের নামের একটি তালিকা বিনিময় করেছে। হামাস জানিয়েছে, তারা ইসরাইলের কাছে ফিলিস্তিনি বন্দীদের তালিকা দিয়েছে। যার মধ্যে মারওয়ান বারগুতিসহ আরো অনেক শীর্ষ ফিলিস্তিনি নেতা রয়েছেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে দখলদার ইসরাইলের কারাগারে বন্দী আছেন। হামাস আরো জানিয়েছে, আলোচনায় যুদ্ধ থামানোর প্রক্রিয়া, গাজা থেকে ইসরাইলি বাহিনী প্রত্যাহার এবং বন্দী বিনিময় চুক্তির বিষয়টিতে বেশি জোর দেয়া হচ্ছে। আলোচনার বিষয়ে জ্ঞাত ফিলিস্তিনি একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, আলোচনায় অগ্রগতির পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হবে হামাসকে অস্ত্র ত্যাগ করার জন্য চাপ দেয়া, তারা এখনো পর্যন্ত এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় অনিচ্ছুক। এই সূত্র আরো জানিয়েছেন, মিসরের অবকাশযাপন শহর শারম আল-শেখে চলা আলোচনায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ২০ দফা প্রস্তাবের প্রথম পর্ব বাস্তবায়নের সময়কাল নিয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।

গাজায় ইসরাইলি আগ্রাসনের সূচনার বর্ষপূর্তির দিন মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একটি চুক্তির জন্য হওয়া অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। শারম আল-শেখে চলমান পরোক্ষ শান্তি আলোচনার তৃতীয় দিনে একটি মার্কিন প্রতিনিধিদল যোগ দেয়। এই দলে বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ ও ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারও আছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে কুশনার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূতের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রধান আস্থাভাজন ইসরাইলের কৌশলগত বিষয়বিষয়ক মন্ত্রী রন ডার্মার বুধবার বিকেলে আলোচনা যোগ দেবেন। দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখা কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুর রাহমান আলে-সানিরও এ আলোচনায় যোগ দেয়ার কথা জানানো হয়েছে।

যুদ্ধ অবসানের নিশ্চয়তা চায় হামাস, নেতানিয়াহুর কণ্ঠে ভিন্ন সুর

মিসরে ইসরাইলের সাথে দ্বিতীয় দিনের আলোচনায় যুদ্ধের অবসান ও গাজা থেকে ইসরাইলি সেনাদের সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চেয়েছে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। আলজাজিরা জানায়, একই সাথে, ইসরাইলি বন্দীদের মুক্তির সময়সূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বন্দী মুক্তির শেষ ধাপের মধ্যেই উপত্যকা থেকে চূড়ান্তভাবে ইসরাইলি সেনাদের প্রত্যাহার করতে হবে বলে দাবি তুলেছেন হামাস কর্মকর্তারা।

মিসরের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত আল-কাহেরা নিউজের খবরে বলা হয়, হামাসের শীর্ষ আলোচক খলিল আল-হায়া বলেছেন, হামাস ‘এক সেকেন্ডের জন্যও দখলদারিত্বের ওপর আস্থা রাখে না’। ইসরাইল আগের দু’টি যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, গাজায় যুদ্ধ শেষ হবে এবং পুনরায় শুরু হবে না- হামাস এর ‘প্রকৃত গ্যারান্টি’ চায়। এ বিষয়ে কথা বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বন্দী মুক্তির পর ‘ইসরাইল গাজায় পুনরায় হামলা করবে না’ বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কথায় তেমন কোনো ইঙ্গিত বা নিশ্চয়তার আভাস মেলেনি। তিনি ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের অভিযানের বার্ষিকী উপলক্ষে এক বিবৃতি প্রকাশ করেছেন। যাতে, হামাসই গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের যুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল বলে উল্লেখ করেন এবং গত দুই বছরের সঙ্ঘাতকে ‘ইসরাইলের অস্তিত্ব এবং ভবিষ্যতের জন্য যুদ্ধ’ বলে অভিহিত করেছেন।

যুদ্ধবিরতি আলোচনার দিকে সরাসরি ইঙ্গিত না করেই নেতানিয়াহু বলেন, ইসরাইল ‘সিদ্ধান্তের এক দুর্ভাগ্যজনক দিনে’ প্রবেশ করছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ‘ইসরাইল যুদ্ধের সমস্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্য কাজ চালিয়ে যাবে। যার মধ্যে রয়েছে- সমস্ত বন্দীকে ফিরিয়ে আনা, হামাসের শাসনের অবসান ঘটানো এবং গাজা যাতে আর ইসরাইলের জন্য হুমকি না হয় তা নিশ্চিত করা’।

যুদ্ধবিরতির আলোচনা ইতিবাচক হচ্ছে, ইঙ্গিত মিসরের প্রেসিডেন্টের

তবে আলোচনা ইতিবাচক হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদুল-ফাত্তাহ আল-সিসি। গতকাল বুধবার কায়রোতে পুলিশ কর্মকর্তাদের গ্র্যাজুয়েশেন অনুষ্ঠানে সিসি বলেন, “কাতার, মিসর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিরা শার্ম এল-শেইখে পৌঁছেছে। আর আমি আলোচনাস্থল থেকে যে খবর পাচ্ছি এগুলো খুব আশা জাগানিয়া।” টাইমস অব ইসরাইল জানায়, মিসর যুদ্ধ বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন সিসি। তিনি আরো বলেন, “যুদ্ধবিরতি, বন্দী ও আটকের ফিরিয়ে আনা, গাজা পুনর্গঠন এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া যা ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠন করবে এটির অর্থ হলো আমরা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঠিক পথে রয়েছি।” যদি চলমান আলোচনার মাধ্যমে গাজাযুদ্ধ বন্ধ ও যুদ্ধবিরতি হয় তাহলে চুক্তিটি করতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেকে মিসরে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন তিনি। গতকাল পর্যন্ত তিনদিন ধরে মিসরে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত এ আলোচনা ভালোভাবে চলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

গাজায় নির্বিচার হামলায় নিহত শিশুর সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়াল

গাজায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ভয়াবহ মাত্রায় পৌঁছেছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হামাস চরম প্রতিশোধ নেয়ার পর ইসরাইলের দিক থেকে শুরু হওয়া আগ্রাসনে এখন পর্যন্ত ৬৭ হাজার ১৭৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার ১৭৯ জন শিশু। আহত হয়েছে আরো ১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৮০ জন।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হামলায় চিকিৎসা অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে, নিহত হয়েছে ১ হাজার ৭০১ জন স্বাস্থ্যকর্মী এবং আটক হয়েছে আরো ৩৬২ জন। অবরোধ ও বোমাবর্ষণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ৪৬০ জন, যাদের মধ্যে শিশু ১৫৪ জন। জাতিসঙ্ঘ বলছে, গাজা উপত্যকার মাত্র ১৮ শতাংশ এলাকা এখনো উচ্ছেদ নির্দেশ বা সামরিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে লাখো ফিলিস্তিনি দক্ষিণে পালিয়ে যাচ্ছে। গত আগস্ট থেকে কেবল গাজা সিটি থেকেই ৪ লাখ ১৭ হাজার মানুষ স্থান পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে।

ইসরাইলি কারাগারে আটক ১১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি

ইসরাইলি কারাগারে বর্তমানে ১১ হাজার ১০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি আটক অবস্থায় রয়েছেন বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনি বন্দীদের সংগঠন পিপিএস। চলতি অক্টোবর মাসের আগ পর্যন্ত এই হিসাব করা হয়। খবর আলজাজিরার। সংগঠনটি এক বিবৃতিতে জানায়, ২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর এটিই বন্দীদের সর্বোচ্চ সংখ্যা। সেখানে বলা হয়, অক্টোবর মাসের হিসেবে ইসরাইলি কারা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৬০ জনেরও বেশি। এ ছাড়া আজীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী এবং যাদের বিরুদ্ধে আজীবন কারাদণ্ডের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, এমন বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৩৫০ জন। এর মধ্যে ৩০৩ জন ইতোমধ্যে দণ্ডপ্রাপ্ত, আর ৪০ জনের বিরুদ্ধে আজীবন কারাদণ্ডের অভিযোগ গঠন প্রক্রিয়াধীন।

সংগঠনটি আরো জানায়, আবদুল্লাহ বারগুতি সর্বাধিক দণ্ডপ্রাপ্ত বন্দী তাকে ৬৭টি আজীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তার পরেই আছেন ইব্রাহিম হামেদ, যিনি পেয়েছেন ৫৪টি আজীবন কারাদণ্ড। এ পর্যন্ত অন্তত ৫৩ জন নারীকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে তিনজন গাজা থেকে এবং দু’জন কিশোরী। এ ছাড়া ওফের ও মেগিদ্দো কারাগারে ৪০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে বন্দী করে রাখা হয়েছে।