ইনু ও হানিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ ২ নভেম্বর

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে ইনুর কথোপকথনের মাধ্যমেও কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণ করে। আমরা ট্রায়ালে সব দেখাব। অতএব তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করি।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে আদেশ দেয়া হবে আগামী ২ নভেম্বর।

একই দিন গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের আরেকটি মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আদেশ দেয়া হবে।

বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গতকাল মঙ্গলবার এই আদেশ দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।

গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাসানুল হক ইনুকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী। তিনি বলেন, উল্লেখিত মামলায় গত ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে প্রসিকিউশন ফরমাল চার্জ দাখিল করেছে। ফরমাল চার্জে প্রসিকিউশন বাংলাদেশের স্বাধীনতা হতে ৫ আগস্ট ২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ৫৪ বছর সময়কালের মধ্যে খণ্ডিত অংশের অসত্য, বানোয়াট ও বিকৃত তথ্য উপস্থাপন করেছে এবং বিগত জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এ বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির প্রকৃত সত্য সম্পূর্ণ আড়াল করে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে মিথ্য, ভিত্তিহীন ও মনগড়া অভিযোগ সাজিয়ে দাখিল করেছে। ফলে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস আইন, ১৯৭৩-এ বর্ণিত কোনো অপরাধের চার্জ গঠনের বিন্দুমাত্র কোনো উপাদান নেই।

এরপর মনসুরুল হক চৌধুরী আদালতের সামনে সংবিধানের ৩৭ও ৩৮ নম্বর অনুচ্ছেদ পড়ে শোনান। এ সময় আদালত বলেন, আপনি ট্রাইব্যুনালের সামনে আর্টিকেল ৪৭-এর ৩ অনুচ্ছেদ পড়ে শোনান। এই আর্টিকেল পড়ে শোনানোর পর মনসুরুল হক বলেন, মাইলর্ড কোর্ড সব কিছুই জানে তবুও চোপ থাকে। কারণ উভয় পক্ষ যে যুক্তি উপস্থাপন করে তার ভিত্তিতেই মামলার কার্যক্রম চলে। এ ছাড়া এমন কোনো উদাহরণ নেই যে চার্জ হেয়ারিংয়ের পর চার্জ ফ্রেমিং হয় নাই। আদালত তখন প্রশ্ন করেন, আজ কি এর ব্যতিক্রম করতে চান? জবাবে হাসানুল হক ইনুর আইনজীবী বলেন, যে অভিযোগ এখানে আনা হয়েছে তা সংঘটিত হওয়ার সময় আমি মেম্বার অব পার্লামেন্ট ছিলাম না। শুধু ১৪ দলের নেতা ছিলাম।

পরে সংবাদ সম্মেলনে মনসুরুল হক বলেন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের জন্য গত দিনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রস্তাব রাখেন প্রসিকিউশন। আজ আসামিপক্ষে এই অভিযোগ গঠন হবে কি হবে না সেই ব্যাপারে আইনি বিধান অনুযায়ী আমি ট্রাইব্যুনালের সামনে বক্তব্য উপস্থাপন করেছি। রাষ্ট্রপক্ষ আমার আসামির বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ এনেছে। এর মধ্যে সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি ও কমপ্লিসিটি অন্যতম। তবে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি প্রমাণ করার এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত তার বিরুদ্ধে আনতে পারেনি রাষ্ট্রপক্ষ। কমপ্লিসিটি বা সম্পৃক্ততা নিয়েও তার ব্যাপারে কোনো কিছু দেখাতে পারেনি বলে আমি ট্রাইব্যুনালকে জানিয়েছি।

তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোনিক কনভারসেশন (ফোনে কথোপকথন) থেকে আমি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছি, কথোপকথনে তারা বলেছেন, যারা আন্দোলন করছে তাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য আহ্বান করতে হবে, যেন আন্দোলন বেগবান না হয়। সেজন্য কারফিউ জারি করে; যেন মানুষ আনরুলি (নিয়ন্ত্রণহীন) না হয় কিংবা সহিংস কোনো ঘটনা না ঘটাতে পারে। এজন্য শেখ হাসিনাকে পরামর্শ দিয়েছেন হাসানুল হক ইনু। এ ছাড়া তারা আরো বলেছেন, কেউ যদি কোনো ভায়োলেন্ট অ্যাক্ট (সহিংস কাজ) করে তাকে আটক করা হবে বা থানায় নিয়ে যাওয়া হবে। টেলিভিশনে প্রচার করা হবে যে তাকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর থানায় রেখে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। এ অবস্থায় এই কনভারসেশন থেকে স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় আওয়ামী লীগ সরকারসহ ১৪ দল সাধারণ জনগণের আন্দোলন দমন করার জন্য কোনো রূপ অন্যায় আশ্রয় নেয়নি। ট্রাইব্যুনাল আমাদের কথা শুনেছেন।

এ সময় প্রসিকিউশনের পক্ষে চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেন, ১৪ দলীয় জোটের শরিক নেতা ছিলেন হাসানুল হক ইনু। জুলাই-আগস্ট আন্দোলন দমনে শেখ হাসিনার সাথে সব পরিকল্পনায় ছিলেন জোট নেতারা। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সাথে ইনুর কথোপকথনের মাধ্যমেও কমান্ড রেসপনসিবিলিটি প্রমাণ করে। আমরা ট্রায়ালে সব দেখাব। অতএব তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের প্রার্থনা করি। তাজুল ইসলাম বলেন, ওনার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তার একটি সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি। শেখ হাসিনা যখন হেলিকপ্টর দিয়ে বোম্বিং করার কথা বলেন। উনি তাতে সম্মতি জানিয়েছিলেন। ওবায়দুল কাদের যখন মিটিং করে ছাত্রদের ওপর অ্যাকশন নেয়ার কথা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন তখন আসামি পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। না বলেননি।

এর আগে ২৩ অক্টোবর এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করে প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ)।

দুই পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হবে কি না, সে বিষয়ে আগামী ২ নভেম্বর আদেশ দেয়ার দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় একমাত্র আসামি হাসানুল হক ইনু। তাকে আজ ট্রাইব্যুনালে আনা হয়।

আরেক মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন, কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সদর উদ্দিন খান, কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসগর আলী ও কুষ্টিয়া পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান। তারা সবাই পলাতক।

তাদের পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মো: আমির হোসেন। তিনি এ মামলা থেকে এই চার আসামির অব্যাহতির আবেদন করেন। এর আগে গতকাল সোমবার হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের আবেদন করে প্রসিকিউশন। দুই পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ মামলায় হানিফসহ চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হবে কিনা সে বিষয়ে আগামী ২ নভেম্বর আদেশ দেয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে।