জাতীয় গৃহায়নে বিতর্কিতদের ‘প্রাইজ-পোস্টিং’ নিয়ে তোলপাড়

Printed Edition

মনিরুল ইসলাম রোহান

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপে সাম্প্রতিক বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলির আদেশকে কেন্দ্র করে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে বিতর্কিত ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কেউ কেউ এই বদলির আদেশকে ‘প্রাইজ-পোস্টিং’ বলে অভিহিত করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর দাবি, গুরুতর অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদায়ন করায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এমনকি ড্রাফটসম্যান পদ না থাকা সত্ত্বেও ওই পদ সংযুক্ত করে স্থাপত্য শাখার একজনকে ‘প্রাইজ-পোস্টিং’ দেয়া হয়েছে।

জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপরে উপপরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিণ) মো: মুশফিকুল ইসলামের স্বারিত এক অফিস আদেশে গত ১৩ জুলাই ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়। এই আদেশ প্রকাশের পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ে ব্যাপকভাবে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ উঠেছে, যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী মাত্র ছয় মাস থেকে দেড় বছর আগে ঢাকার বাইরে থেকে বদলি হয়ে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত প্রধান কার্যালয়ে যোগদান করেছিলেন, তাদের কয়েকজনকে কোনো সুস্পষ্ট প্রশাসনিক প্রয়োজন বা যৌক্তিক কারণ ছাড়াই আবার বদলি করা হয়েছে। এ ধরনের বদলি সরকারি বদলি নীতিমালা ও প্রশাসনিক রীতিনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় অধিদফতরের প্রকৌশলী বিভাগে ড্রাফটসম্যানের শূন্যতা রয়েছে। এজন্য বাইরে থেকে চুক্তিভিত্তিক কাজ করা হচ্ছে। কিন্তু ‘ড্রাফটসম্যান’ প্রকৌশলী দফতরে সংযুক্তি দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা না করে ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা শাখায় সংযুক্ত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এটি নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ সুবিধা দেয়ার একটি উদাহরণ মাত্র। তথ্য বলছে, ড্রাফটসম্যান মো: হানিফ মিয়াকে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের স্থাপত্য শাখা থেকে উপপরিচালক ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-২ এ বদলি করা হয়েছে। ঢাকা ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের হিসাব সহকারী মো: মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদ ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো: আশরাফুল ইসলামকে সেগুনবাগিচার জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা-১ দফতরে এবং মো: মাজেদুল ইসলামকে জাতীয় কর্তৃপক্ষের সেগুনবাগিচার অফিস থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী কার্যালয় ঢাকা-২-এর-মতো গুরুত্বপূর্ণ শাখায় বদলি করা হয়েছে। সূত্র বলছে, হিসাব সহকারীদের কাজ হলো আর্থিক বিষয়াদি দেখভাল করা। কিন্তু সংশ্লিষ্ট দফতরে বদলি না করে নকশা অনুমোদন, ফাট-বাড়ির পরিকল্পনা ও অনুমোদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতরে বদলি করা হয়েছে। আরেক জনকে প্রকৌশলী বিভাগে থাকার কথা থাকলেও তাকে ভূমি ও সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বদলি করা হয়েছে।

এ দিকে একাধিক কর্মচারীর অভিযোগ, যাদের বিরুদ্ধে স্বার জাল, ভুয়া চালান এবং বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত বা বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করে; বরং গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হয়েছে। বিশেষ করে হিসাব সহকারী মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদের পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। তাদের দাবি, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না করে এ ধরনের পদায়ন প্রতিষ্ঠানে ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে। কারণ এর আগে সিলেটে কর্মরত অবস্থায় জাতীয় গৃহায়নের সরকারি চালান জাল করে ২৭ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগে বিভাগীয় মামলা করা হয় ফুয়াদের বিরুদ্ধে। পরে তিনি টাকা ফেরত দিয়ে মা চেয়ে চাকরিতে পুনর্বহাল হন। এ বিষয়ে মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদ নয়া দিগন্তকে বলেন, ২৭ লাখ টাকা নয়, ১০ লাখ টাকার জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়। পরবর্তীতে এটা নিয়ে একটা বিভাগীয় মামলা করা হয়েছিল। ওই মামলা নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। ওই মামলায় আমি নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছি।

চালান জালিয়াতি করা ফুয়াদের খালাতো ভাই ফারুককেও প্রাইজ-পোস্টিং করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ উঠেছে। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, ড্রাফটসম্যান মো: হানিফ মিয়া, হিসাব সহকারী মো: মোস্তফা হোসাইন ফুয়াদ, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মো: আশরাফুল ইসলাম, হিসাব সহকারী মো: মাজেদুল ইসলামকে ‘প্রাইজ-পোস্টিং’ দেয়ার জন্য এক উপপরিচালকের সাথে ১৫ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। হানিফ, ফুয়াদ, আশরাফুল ও মাজেদুল একই সিন্ডিকেটের সদস্য এবং আওয়ামী আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী ছিলেন। বদলির আদেশে স্বাক্ষরিত জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপরে উপপরিচালক (প্রশাসন ও প্রশিণ) মো: মুশফিকুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘লেনদেনের বিষয়ে আমি কিছু জানি না, এটা সত্য নয়। এটা ডাহা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।’

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোসা: ফেরদৌসী বেগম নয়া দিগন্তকে বলেন, যথাযথ নিয়ম মেনেই বদলির আদেশ দেয়া হয়েছে। আমি দুর্নীতি ও অনিয়মকে কখনোই প্রশয় দিই না, ভবিষ্যতেও দিবো না। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক বদলির ঘটনায় যদি কোনো দুর্নীতি হয়, আর যদি কেউ অভিযোগ করে থাকে তাহলে অবশ্যই তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।