‘ভাই,পানি লাগবে? পানি?’- জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সেই মানবিক আহ্বান আজও প্রতিধ্বনিত হয়। আহত আন্দোলনকারীদের হাতে পানি তুলে দিতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। দুই বছর পরও তার পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায়। চব্বিশের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরা আজমপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আহত আন্দোলনকারীদের হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি তাদের মধ্যে পানি, বিস্কুট ও রুটি বিতরণ করছিলেন মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। এ সময় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ভাই, পানি লাগবে? পানি?’-এই কয়েকটি শব্দই পরিণত হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মানবিক প্রতীকে।
মুগ্ধর বন্ধু ও প্রত্যক্ষদর্শী নাঈমুর রহমান আশিক জানান, আহতদের হাসপাতালে নেয়ার পাশাপাশি মুগ্ধ নিজে আন্দোলনকারীদের পানি দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে গুলির শব্দে সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। পরে তিনি দেখেন, মুগ্ধর কপালে গুলির আঘাত লেগেছে। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া হলেও আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
মুগ্ধর যমজ ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, মৃত্যুর পর ক্রিসেন্ট হাসপাতাল থেকে দ্রুত লাশ সরিয়ে নেয়ার জন্য চাপ দেয়া হচ্ছিল। সে সময় পুলিশ বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে লাশ নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। পরে লাশ নিয়ে উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টর কবরস্থানে দাফনের চেষ্টা করা হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ১৯ জুলাই জুমার নামাজের পর উত্তরা কামারপাড়া বামনারটেক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
মুগ্ধর মৃত্যুর পর পরিবার এখনো স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি। স্নিগ্ধ বলেন, প্রতিটি উৎসব এখন তাদের কাছে বেদনার দিন। বাবা হার্টের জটিলতায় ভুগছেন, মায়েরও কিডনির সমস্যা রয়েছে। পরিবারের প্রতিটি সদস্য এখনো সেই শোক বয়ে বেড়াচ্ছেন।
মুগ্ধর বড় ভাই মীর মাহমুদুর রহমান দীপ্ত জানান, আন্দোলনের দিন গলায় থাকা মুগ্ধর পরিচয়পত্রে এখনো রক্তের দাগ লেগে আছে। স্মৃতি সংরক্ষণ করতে ভালোবাসা মানুষটি আজ পরিবারের সবচেয়ে বেদনাময় স্মৃতিতে পরিণত হয়েছেন।
পরিবার জানায়, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) মুগ্ধকে হত্যা সংক্রান্ত মামলার অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। ‘১৮ জুলাই মীর মুগ্ধসহ উত্তরার বাকি সকল শহীদ’ শিরোনামের ওই মামলায় উত্তরায় নিহতদের ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত শেষ হয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, যারা এই গণহত্যার সাথে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে- সেটিই পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা।
মুগ্ধর বাবা মীর মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ১৭ জুলাই আবদুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডে ছেলের সাথে তার শেষ দেখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র ও দেশের মানুষ সেই আত্মত্যাগের শিক্ষা ধারণ করে ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করবে।



