আয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়। মাসের শুরুতে বেতন হাতে পাওয়ার পর যে পারিবারিক হিসাব একসময় মোটামুটি সহজেই মিলে যেত, এখন মাস শেষ হওয়ার আগেই সেই হিসাব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বাসাভাড়া, বাজার-সদাই, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও যাতায়াতসহ প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়তি ব্যয় সামলাতে গিয়ে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে সঞ্চয় কমাতে হচ্ছে। কেউ কেউ কাটছাঁট করছেন প্রয়োজনীয় খরচ, আবার অনেকে জরুরি ব্যয় মেটাতে ধারদেনার ওপর নির্ভর করছেন। ফলে পরিবারে পুষ্টিগ্রহণ হ্রাস পাচ্ছে, বাড়ছে অস্বস্তি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য বলছে, গত জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। মে মাসে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক বছর আগে, ২০২৫ সালের জুনে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ মে মাসের তুলনায় জুনে মূল্যস্ফীতির হার সামান্য কমলেও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে ব্যয়ের চাপ খুব একটা কমেনি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ বাজারদর কমে যাওয়া নয়। এর অর্থ হলো আগের তুলনায় দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিভিন্ন সেবার যে উচ্চমূল্য তৈরি হয়েছে, তা থেকেই যাচ্ছে। ফলে আয় একই হারে না বাড়লে মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়।
তিনি বলেন, ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনেও এর প্রভাব স্পষ্ট। মাসিক আয়ের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাবার ও নিত্যপণ্যে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, গোশত, ডিম, সবজি, মসলা থেকে শুরু করে সাবান, ডিটারজেন্ট ও অন্যান্য গৃহস্থালি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। তিনি বলেন, একটি পরিবারের বাজার খরচ মাসে একবার বড় অঙ্কে না বাড়লেও প্রতিদিনের ছোট ছোট মূল্যবৃদ্ধি মাস শেষে বড় ব্যবধান তৈরি করছে। আগে যে পরিবার মাসের শুরুতে বড় বাজার করে মাসের শেষ পর্যন্ত সামলে নিতে পারত, এখন অনেকেই প্রয়োজন অনুযায়ী অল্প অল্প করে বাজার করছেন। অনেক পরিবার মাছ-গোশতের পরিমাণ কমিয়েছে, তুলনামূলক কম দামের পণ্য বেছে নিচ্ছে এবং বাইরে খাওয়ার অভ্যাস কমিয়ে দিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও এর প্রতিফলন রয়েছে। ২০২৬ সালের মে মাসে দেশের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ২১ শতাংশ, যা ওই সময়ের মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম। অর্থাৎ শ্রমজীবী ও বেতনভোগী মানুষের আয় যে হারে বেড়েছে, পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে তার চেয়ে বেশি হারে। ফলে নামমাত্র আয় বাড়লেও প্রকৃত অর্থে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। এ দিকে খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি খাদ্যবহির্ভূত ব্যয়ও মধ্যবিত্তের বাজেটকে চাপে ফেলছে। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, পোশাক ও অন্যান্য সেবার ব্যয় একসাথে বাড়লে পরিবারের জন্য মাসিক বাজেট সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ঢাকায় মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয়ের বড় একটি অংশ বাসাভাড়ায় চলে যায়। বিশেষ করে বেসরকারি চাকরিজীবী ও সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য বাসাভাড়া একটি স্থায়ী ব্যয়। আয় না বাড়লেও বাসাভাড়া, সার্ভিস চার্জ ও অন্যান্য আবাসিক ব্যয় বাড়লে মাসের শুরুতেই আয়ের একটি বড় অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান নয়া দিগন্তকে বলেন, বাসাভাড়া নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সময়ে সরকারি উদ্যোগ নেয়া হলেও বাস্তবে অনেক ভাড়াটিয়াকে বাড়তি ব্যয় বহন করতে হয়। বাসা পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও নতুন বাসার অগ্রিম, স্থানান্তর ব্যয় এবং কর্মস্থল থেকে দূরত্বের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। ফলে কম ভাড়ার বাসা খুঁজতে গিয়ে অনেক পরিবারকে শহরের অপেক্ষাকৃত দূরের এলাকায় চলে যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে সময় বাড়ছে, অন্য দিকে যাতায়াতের ব্যয়ও বাড়ছে।
তিনি বলেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য সন্তানের শিক্ষাব্যয়ও এখন বড় চাপ। স্কুলের বেতন, কোচিং, বই-খাতা, পোশাক, শিক্ষা উপকরণ, পরিবহনসহ নানা খাতে প্রতি মাসে অর্থ ব্যয় করতে হয়। খাদ্য বা পোশাকের ব্যয় কিছুটা কমানো সম্ভব হলেও সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় হঠাৎ করে কমিয়ে দেয়া কঠিন। ফলে অনেক পরিবার অন্যান্য খাতে ব্যয় কমিয়ে শিক্ষার খরচ ধরে রাখছে। একইভাবে চিকিৎসা ব্যয়ও পরিবারের বাজেটে অনিশ্চিত চাপ তৈরি করছে। নিয়মিত ওষুধ, চিকিৎসকের ফি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা কিংবা হঠাৎ হাসপাতালে ভর্তি যে কোনো একটি ঘটনা পুরো মাসের হিসাব বদলে দিতে পারে। যেসব পরিবার আগে চিকিৎসার জন্য আলাদা সঞ্চয় রাখত, তাদের অনেকেই এখন সেই অর্থ অন্যান্য বাড়তি ব্যয়ে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ চিকিৎসা বা পরীক্ষা-নিরীক্ষা পিছিয়ে দিচ্ছেন।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার মধ্যবিত্তের জন্য পরিবহন ব্যয়ও গুরুত্বপূর্ণ। কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য প্রয়োজনে প্রতিদিন যাতায়াত করতে হয়। গণপরিবহনের ভাড়া, রাইড শেয়ারিং, ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ সব মিলিয়ে এই খাতে মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য। এদিকে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে পেট্রল, ডিজেল ও কেরোসিনের দাম বাড়ানো হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় এবং পণ্য পরিবহনের খরচে চাপ তৈরি হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির চাপের একটি বড় প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ের ওপর। আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান কমে যাওয়ায় মাস শেষে হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ কমছে। আগে যে পরিবার মাসে ১০ হাজার টাকা সঞ্চয় করতে পারত, একই আয় ও জীবনযাত্রার মধ্যে এখন হয়তো তার অর্ধেকও সঞ্চয় করতে পারছে না। কারও কারও ক্ষেত্রে মাস শেষে কোনো সঞ্চয়ই থাকছে না। সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তাও দুর্বল হচ্ছে। সন্তানের উচ্চশিক্ষা, বাড়ি কেনা, চিকিৎসা, অবসরকালীন নিরাপত্তা কিংবা জরুরি পরিস্থিতির জন্য যে অর্থ জমা করার কথা ছিল, সেটি এখন দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে চলে যাচ্ছে।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে পরিবারগুলো জীবনযাত্রার ধরনেও পরিবর্তন আনছে। বাইরে খাওয়া, বিনোদন, ভ্রমণ, পোশাক কেনা এবং অন্যান্য ঐচ্ছিক ব্যয় কমছে। অনেক পরিবার নতুন আসবাব, ইলেকট্রনিক পণ্য বা অন্যান্য বড় কেনাকাটা স্থগিত করছে। কেউ কেউ পুরনো ঋণ পরিশোধের সময় বাড়াচ্ছেন কিংবা ক্রেডিট কার্ডের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশী শ্রমিক অধিকারকর্মী এবং সম্মিলিত গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের (এসজিএসএফ) সভাপতি নাজমা আক্তার নয়া দিগন্তকে বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এর প্রভাব শুধু বর্তমান ভোগের ওপর পড়ে না, ভবিষ্যৎ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের ওপরও পড়ে। শ্রমিক শ্রেণীর মানুষ দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ে, কারণ তাদের আয় অনেক কম।
তিনি বলেন, ঢাকার খেটে খাওয়া মানুষগুলোর পরিবারের প্রকৃত চাপ বোঝার জন্য একই ধরনের পরিবারের এক বছরের ব্যবধানের আয়-ব্যয়ের তুলনা গুরুত্বপূর্ণ। ১০টি পরিবারের মাসিক আয়, বাসাভাড়া, খাবার ও নিত্যপণ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন, ইউটিলিটি বিল এবং অন্যান্য ব্যয়ের তথ্য সংগ্রহ করলে মূল্যস্ফীতির বাস্তব প্রভাব আরো স্পষ্টভাবে পাওয়া যাবে বলে তিসি মনে করেন।
এদিকে সরকার চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে মূল্যস্ফীতি কমানোর পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনা, সরবরাহব্যবস্থা শক্তিশালী করা, নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং মানুষের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে মূল্যস্ফীতি কোনো পরিসংখ্যানের বিষয় নয়। এটি মাসের বাজারের তালিকা ছোট হয়ে যাওয়া, বাসা বদলের চিন্তা, সন্তানের শিক্ষার ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ, চিকিৎসা পিছিয়ে দেয়া, যাতায়াতের খরচ হিসাব করে চলা এবং মাস শেষে সঞ্চয়ের অর্থ না থাকার বাস্তবতা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুনে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নামলেও দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য স্বস্তি এখনো পুরোপুরি আসেনি। বাজারে পণ্যের দাম আগের উচ্চস্তরেই রয়েছে, আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না এবং মাসিক ব্যয়ের সাথে তাল মিলিয়ে সঞ্চয় করার সুযোগ ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবিত্তের পারিবারিক বাজেটে এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে মাসের আয় দিয়ে মাসের প্রয়োজন মেটানোর পর ভবিষ্যতের জন্য অর্থ হাতে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।



