বাসস
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধ্বংসস্তূপ থেকে উত্থানের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন তারেক রহমান। তার রাজনৈতিক যাত্রা বাংলাদেশের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ধারাবাহিকতায় স্বতন্ত্রভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত তিনটি প্রেক্ষাপটে দেখা যায়- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের সামরিক নেতৃত্ব, খালেদা জিয়ার বিএনপি পুনর্গঠন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলের পুনর্জাগরণ।
১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর স্বাধীনতা ঘোষণা করে বাংলাভাষী সেনাদের সমর্থন নিশ্চিত করেন। সাধারণ মানুষ মুহূর্তেই বুঝতে পারল যে পেশাদার ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী তাদের পাশে রয়েছে। যুদ্ধের মধ্যে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণা বাংলাদেশের মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছিল এবং মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক ও সামরিক বাস্তবতায় শক্তিশালী করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরে তিনি সামরিক ক্যারিয়ারে উন্নতি করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান অল্প সময়ে দেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা মোকাবেলা করে পেশাদার সেনাবাহিনী পুনর্গঠনের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন।
রাজনীতিক হিসেবে তার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল নতুন রাজনৈতিক দল ও মতাদর্শের উত্থান। জিয়াউর রহমান একটি মধ্যপন্থী ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠনের প্রাথমিক কাজ করেছেন, তবে দলের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ তার জীবদ্দশায় সম্ভব হয়নি। অসমাপ্ত কাজটি সম্পন্ন করেন বেগম খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি পুনর্গঠিত হয়, অন্তর্দলীয় কোন্দল প্রশমিত হয় এবং দলটি আবারো দেশের প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তার আপসহীন এবং অনমনীয় নেতৃত্ব বিএনপিকে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে বিজয়ী করেছিল এবং দলকে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে ওয়ান ইলেভেন, দীর্ঘ মেয়াদি আওয়ামী লীগ শাসন এবং দলীয় নেতৃত্বের অনুপস্থিতির কারণে বিএনপি গভীর সঙ্কটে পড়ে। বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন, কারাবাস, গুম এবং রাজনৈতিক বাধাপ্রক্রিয়ার কারণে দল ধ্বংসপ্রায় অবস্থায় পৌঁছায়। দেশের বাইরে দীর্ঘ ১৭ বছর কাটানো তারেক রহমানের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল বহুমাত্রিক।
প্রথমত, বিএনপির বিরুদ্ধে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও মিডিয়া-ভিত্তিক ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়েছিল। দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার গুরুতর অসুস্থতা এবং কারাবাস দলের মধ্যে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি করেছিল। তৃতীয়ত, তারেক রহমান লন্ডন থেকে সরাসরি দলের সাথে যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন ছিলেন। চতুর্থত, আদালতের মাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা এবং সামাজিক-অনলাইন যোগাযোগের বাধা বিরোধী ন্যারেটিভকে শক্তিশালী করেছিল। পঞ্চমত, বিএনপির ভেতরে বিভাজন ও অন্তর্দলীয় কোন্দল দলকে দুর্বল করার চেষ্টা করেছিল।
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করতে তারেক রহমান ধৈর্য, সহনশীলতা এবং কৌশলগত নেতৃত্ব দেখান। তিনি অনলাইনে ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সাথে সংহতি বজায় রাখেন। দলের মধ্যে নানা মত ও পথের মানুষের কথা শুনে সবাইকে মধ্যপন্থী অবস্থানে পরিচালিত করেন। তারেক রহমানকে নেতাকর্মীরা আবিষ্কার করেন সহনশীল, নমনীয় এবং সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে, যা বিরোধীরা আগে ডেমনাইজ করার চেষ্টা করেছিল।
তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসকাল তাকে রাজনীতি ও দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ দিয়েছিল। দীর্ঘকালীন পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার ভিত্তিতে তিনি বিএনপিকে ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন করেন। তিনি দলকে নতুন করে নেতৃত্ব, সংহতি এবং রাজনৈতিক অবস্থান নিশ্চিত করেন। বিএনপি এখন মধ্যপন্থী, গণতান্ত্রিক, সহনশীল ও ইনক্লুসিভ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই উত্থান এক বিস্ময়কর অধ্যায়। ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন নির্মাণ, রাজনৈতিক সংহতি ও দলীয় ঐক্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা- সবই তারেক রহমানের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে সম্ভব হয়েছে। তিনি তার বাবা জিয়াউর রহমানের মতো কম কথা বলেন এবং কার্যত নেতৃত্ব প্রদানে বিশ্বাসী। পাশাপাশি, মায়ের মতো নেতৃস্থানীয় সংবেদনশীলতা ও সংহতি বজায় রেখে দলের ভেতরে সম্পর্ক ও যোগাযোগ স্থাপন করেছেন।
ফলে তার দেশে প্রত্যাবর্তন কোনো সাধারণ রাজনৈতিক ঘটনা নয়। এটি ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন, রাজনৈতিক শক্তি পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং মধ্যপন্থী, ইনক্লুসিভ রাজনীতির পুনর্জাগরণের প্রতীক। তারেক রহমান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা ও ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।
তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ধ্বংসস্তূপ থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তি ও পুনর্গঠন প্রতিষ্ঠার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দীর্ঘ প্রবাসকাল, রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং দলের ঐক্য রক্ষার যাত্রা তাকে অনন্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। এটি শুধু বিএনপির পুনর্জাগরণ নয়, বরং সমগ্র বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি নতুন দৃষ্টান্ত।



