অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
পতন সামলে ফের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে দেশের পুঁজিবাজার। এরই অংশ হিসেবে গতকাল সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসটিও সূচকের উন্নতি দিয়েই পার করেছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এর আগে রোববার দিনের শুরুতে বড় পতনের ধাক্কা সামলে শেষদিকে এসে ইতিবাচক ধারায় দিন শেষ করে। এ নিয়ে টানা দু’দিন ভালো কেটেছে পুঁজিবাজারের। সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেরও উন্নতি ঘটেছে বাজারগুলোতে। তবে এ ধারা আদৌ টিকবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
আগের সপ্তাহে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই প্রধান সূচকটির ২৬৫ পয়েন্টের বেশি হারায় দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। অপর পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রায় ৪০০ পয়েন্ট। বাজার পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন না হলেও সে অবস্থা কাটিয়ে এ সপ্তাহে বাজারগুলো যে ইতিবাচক ধারায় ফিরছে তা আদৌ টিকে থাকবে কি না সে প্রশ্ন বিনিয়োগকারীদের। নিজেদের পুঁজির বেশির ভাগ হারালেও এখন যা আছে তা নিয়ে তারা একটু নিরাপদ থাকতে চান। আশ^স্ত হতে চান বাজার আবার স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসবে।
বাজারের ধারাবাহিক পতনে সর্বস্বান্ত বিনিয়োগকারীরা নিজেদের বিভিন্ন দাবি নিয়ে নানা কর্মসূচি পালন করে আসছিল। তারা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে তা অবহিত করার পাশাপাশি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তাদের অভিযোগ উত্থাপন করে তার প্রতিকার চান। সর্বশেষ রোববার তারা আগারগাঁওয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কার্যালয়ের বিক্ষোভ পালন ও সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বাজারের চলমান সমস্যা সমাধানের দাবি জানান। তবে বিনিয়োগকারীদের নেয়া এসব কর্মসূচির পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি। এরই মধ্যে গত দু’দিন বাজারগুলো ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করে।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪২ দশমিক ৮১ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। সকালে চার হাজার ৭৩২ দশমিক ১৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় চার হাজার ৭৭৪ দশমিক ৯৬ পয়েন্টে। লেনদেন শুরুর প্রথম একটি ঘণ্টা সূচকটি বেশ কয়বার ওঠানামার মধ্য দিয়ে পার করে। বেলা ১১টার পর ঊর্ধ্বমুখী হওয়া সূচকটি বেলা ১টার কিছু আগে পৌঁছে যায় চার হাজার ৭৯৮ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে ডিএসই সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৬৬ পয়েন্ট। তবে পরবর্তীতে বিক্রয়চাপ সক্রিয় হলে বৃদ্ধি পাওয়া সূচকের পুরোটা ধরে রাখতে পারেনি বাজারটি। দিনশেষে চার হাজার ৭৭৪ পয়েন্টে স্থির হয় সূচক। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৯ দশমিক ৩৭ ও ১৫ দশমিক ২৯ পয়েন্ট।
একই সময় দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের আচরণ ছিল মিশ্র। এখানে প্রধান সূচক সিএএসপিআই ৬১ দশমিক ৭৪ পয়েন্টে উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বিশেষায়িত দুই সূচকের একটি সিএসই-৩০ সূচকটি ১৩ দশমিক ৬৬ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। তবে বিশেষায়িত অন্য সূচক সিএসসিএক্স এ সময় ৩০ দশমিক ৫২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়।
ইতিবাচক আচরণে ফেরা পুঁজিবাজারগুলোতে গতকাল লেনদেনেরও কিছুটা উন্নতি ঘটে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৩৪৮ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৫০ কোটি টাকা বেশি। রোববার বাজারটির লেনদেন ছিল ২৯৮ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারের লেনদেন পৌঁছে যায় ১৪ কোটিতে। রোববার এখানে মাত্র চার কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি হয়েছিল।
দিনের বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায় গত ক’দিন ধরে যেসব কোম্পানি সবচেয়ে বেশি দর হারিয়েছিল গতকাল এগুলোই মূল্যবৃদ্ধির তালিকার শীর্ষে ছিল। এদের মধ্যে বেশির ভাগ ছিল কম মূল্যস্তরে থাকা কোম্পানিগুলো। মৌলভিত্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা বা চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন নেতিবাচক হওয়ায় এসব কোম্পানি গত ক’দিনে বড় ধরনের দরপতনের শিকার ছিল। এদের কিছু কিছু গতকাল মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় উঠে আসে। তবে একই সময় কিছু কিছু কোম্পানির লভ্যাংশ ঘোষণার রেকর্ড পরবর্তী মূল্যসমন্বয় ঘটলে যথারীতি দরপতনের শিকার হয়।
গতকাল ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। রেকর্ড পরবর্তী মূল্যসমন্বয়ে কিছুটা দর হারিয়ে গতকাল ১৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির সাত লাখ ৩৬ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ১২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায় ১৪ লাখ ৭৫ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করা প্রকৌশল খাতের আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং ছিল দিনের দ্বিতীয় কোম্পানি। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, রানার অটোমোবাইলস, ওরিয়ন ইনফিউশন, লাভেলো আইসক্রিম, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, বারাকা পতেঙ্গা পাওয়ার ও মনোস্পুল পেপারস।
ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল প্রকৌশল খাতের জিপিএইচ ইস্পাত। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৮৬ শতাংশ। ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ইনটেক অনলাইন উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। মূল্যবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায় আরো ছিল যথাক্রমে ইনফরমেশন সিস্টেমস নেটওয়ার্ক, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, লাভোলা আইসক্রিম, এনসিসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পপুলার লাইফ ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, সিলকো ফার্মাসিউটিক্যালস ও এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড।
ডিএসইতে দরপতনের শীর্ষে উঠে আসে ফার ইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং। কোম্পানিটির দর পতনের হার ছিল ১০ শতাংশ। বিগত অর্থবছরে ১২ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করা টেক্সটাইল খাতের কোম্পানিটি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে লোকসানের শিকার হওয়ায় এ দরপতন ঘটে। রোববারও কোম্পানিটি ৯ দশমিক ৬১ শতাংশ দর হারায়। ৫ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকায় দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ফিনিক্স ফিন্যান্স। ডিএসইর দরপতনে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, রানার অটোমোবাইলস, ক্রাউন সিমেন্ট, প্রিমিয়ার লিজিং, স্কয়ার টেক্সটাইলস, লাফার্জ হোলসিম, ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার ও শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি।



