নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির চাপে সাধারণ মানুষ

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাজারে গেলেই যেন নিত্যনতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন কিংবা কাঁচামরিচ প্রায় প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত এলপিজির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে সমন্বয় করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করা হচ্ছে, অন্য দিকে নিত্যপণ্যের বাজারে অভিযান চালিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তবে ভোক্তার ব্যয় কমছে না। বরং সরকারি মূল্য ঘোষণার পরও অনেক এলাকায় নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে, আবার উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার পরও হঠাৎ করে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি পরিসংখ্যানে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিললেও সাধারণ মানুষের বাজার ব্যয়ে তার প্রতিফলন এখনো স্পষ্ট নয়। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও কাঁচামরিচের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পাশাপাশি রান্নার জ্বালানি এলপিজির দামও ভোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয় ও সরবরাহ শৃঙ্খলের বাস্তব খরচের পাশাপাশি বাজারে অতিরিক্ত মুনাফার অভিযোগও মূল্যস্ফীতি দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে আসছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল আন্তর্জাতিক বাজারকে দায়ী করলে বাস্তব চিত্রের একটি বড় অংশ আড়ালেই থেকে যায়।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যে দেখা যায়, ২০২৬ সালের জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। তবে এই হার এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নয়। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যের কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ব্যয় কমেনি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বাজারে তার প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে। পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং বাজারে তথ্যের অস্বচ্ছতাও খুচরা বাজারে উচ্চমূল্য ধরে রাখছে।

এ দিকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আন্তর্জাতিক বাজারে সৌদি আরামকোর কনট্রাক্ট প্রাইস, ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, শুল্ক, পরিবহন ও বিপণন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি মাসে এলপিজির সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করছে। সর্বশেষ আগষ্ট মাসের জন্য ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জুলাই মাসে এ দাম ছিল এক হাজার ৫২৮ টাকা। এর আগে জুনে দাম ছিল এক হাজার ৮৮৫ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যয় পরিবর্তনের কারণেই এই সমন্বয় করা হয়েছে বলে কমিশন জানিয়েছে।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিত্যপণ্যের বাজারেও একই ধরনের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। উৎপাদন ও আমদানিতে বড় ধরনের সঙ্কট না থাকলেও অনেক সময় কাঁচামরিচ, পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও অন্যান্য কৃষিপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে যায়। কৃষকের কাছ থেকে কম দামে পণ্য সংগ্রহ করা হলেও ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেই দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়। উৎপাদক, আড়তদার, পাইকার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতা একাধিক ধাপ অতিক্রম করার সময় পরিবহন ব্যয়, গুদামজাতকরণ, কমিশন ও ব্যবসায়িক মুনাফা যোগ হয়। কিন্তু কোথায় প্রকৃত ব্যয় বাড়ছে আর কোথায় অতিরিক্ত মুনাফা যোগ হচ্ছে, সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রাবাজার আগের তুলনায় স্থিতিশীল হলেও আমদানিনির্ভর পণ্যের খুচরা মূল্য একই হারে কমেনি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ডলারের বিনিময় হার মূল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র কারণ নয়। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও আগের উচ্চমূল্যে কেনা মজুদ, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, সীমিত প্রতিযোগিতা এবং তথ্যের অস্বচ্ছতার কারণে বাজারে মূল্য কমতে দেরি হয়। তাই ডলার স্থিতিশীল হলেও ভোক্তার ব্যয় একই গতিতে কমছে না।

দেশের পাইকারি বাজার মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি হাজী সৈয়দ মো: বশির উদ্দিন নয়া দিগন্তকে বলেন, পরিবহন ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি, ব্যাংকঋণের সুদ এবং গুদামজাতকরণ ব্যয় বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।

অন্য দিকে ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর অভিযোগ, বাস্তব ব্যয়ের বাইরে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফাও নেয়া হচ্ছে। তারা বলছেন, বাজারে গিয়ে একজন ক্রেতা যে দাম পরিশোধ করছেন, তার সাথে সরকারি মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের পার্থক্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বাজার কারসাজির অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে মজুদের তথ্য, আর্থিক লেনদেন ও বাজার কাঠামোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রয়োজন। অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতি কোনো একক কারণে সৃষ্টি হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের বিনিময় হার, আমদানিনির্ভরতা, পরিবহন ব্যয়, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা এবং বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা- সবগুলো কারণ একসাথে কাজ করছে। সরকারি তথ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত দিলেও সেই সুফল এখনো সাধারণ ভোক্তার কাছে পুরোপুরি পৌঁছায়নি। ফলে শুধু মূল্য নির্ধারণ নয়, বাজারে স্বচ্ছতা, কার্যকর নজরদারি এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমলেও বাজারে তার প্রভাব পৌঁছাতে সময় লাগে। তবে একই সাথে সরবরাহ ব্যবস্থার অদক্ষতা, বাজারে সীমিত প্রতিযোগিতা এবং মূল্য নির্ধারণে অস্বচ্ছতাও খুচরা বাজারে দাম বেশি থাকার অন্যতম কারণ হতে পারে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমেছে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম এখনো এমন পর্যায়ে রয়েছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ প্রফেসর গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেবল সুদের হার সমন্বয় বা আমদানি বাড়ানো যথেষ্ট নয়। একই সাথে কৃষক থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরের মূল্য তথ্য উন্মুক্ত করা, পাইকারি বাজারে ডিজিটাল স্টক মনিটরিং চালু করা, বিইআরসির নির্ধারিত এলপিজি মূল্য কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং বাজারে আধিপত্য বা সমন্বিত মূল্য নির্ধারণের অভিযোগে স্বাধীন তদন্ত জোরদার করা জরুরি। এতে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণ দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

এ দিকে সরকারি তথ্য বলছে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সেই সুফল এখনো পুরোপুরি পৌঁছেনি সাধারণ ভোক্তার কাছে। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু মূল্য নির্ধারণ নয়, বরং সেই মূল্য কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টি করা। তা না হলে আন্তর্জাতিক বাজার স্থিতিশীল হলেও দেশের সাধারণ মানুষকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও রান্নার জ্বালানির জন্য বাড়তি মূল্যই গুনতে হবে। এই বাস্তবতাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়, কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।