মিয়ানমারে জান্তার সাথে সশস্ত্র যুদ্ধ

সাবেক স্পেশাল ফোর্সের মাধ্যমে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ : মংডুর ২৭০ কিলোমিটার এলাকা ‘স্বাধীন রাষ্ট্র’ চায় আরাকান আর্মি

এস এম মিন্টু
Printed Edition

মিয়ানমারের জান্তা বাহিনীর সাথে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির (এএ) তুমুল ও দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের নেপথ্যে ক্রমেই বেরিয়ে আসছে একের পর এক চাঞ্চল্যকর ও গভীর উদ্বেগজনক তথ্য। প্রায় দুই বছর ধরে চলমান এ সংঘাত আর কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রূপ নিচ্ছে আন্তর্জাতিক শক্তির পরোক্ষ সম্পৃক্ততা, আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকিতে।

একাধিক গোয়েন্দা সূত্র ও আরাকান আর্মির ভেতরের নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, জান্তাদের বিরুদ্ধে আরাকান আর্মির এ লাগাতার যুদ্ধের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাবেক স্পেশাল ফোর্স সদস্যদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। একই সাথে মংডু টাউনশিপ জান্তাদের হাত থেকে পুনর্দখলের ক্ষেত্রে চীনের নীরব কিন্তু কার্যকর সহায়তার কথাও উঠে এসেছে।

সাবেক স্পেশাল ফোর্স : প্রশিক্ষণ ও যুদ্ধ সহায়তার অভিযোগ : গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের অবসরপ্রাপ্ত স্পেশাল ফোর্স কর্মকর্তা ও সৈনিকরা ভাড়াটে সামরিক কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ, গেরিলা যুদ্ধকৌশল, ড্রোন ব্যবহার, স্নাইপার অপারেশন এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল শেখাচ্ছেন। এসব কার্যক্রম কোনো রাষ্ট্রীয় ঘোষণার আওতায় নয়; বরং ব্যক্তিগত ও গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

সূত্র অনুযায়ী, বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে এসব সাবেক সেনাসদস্য আরাকান আর্মির যুদ্ধ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে ভূমিকা রাখছেন। অস্ত্র সংগ্রহ, যুদ্ধক্ষেত্রের লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত প্রতিরোধ গড়ে তোলাই এ সহায়তার মূল লক্ষ্য। আরাকান আর্মির একটি সূত্র দাবি করেছে, রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের প্রায় ২৭০ কিলোমিটার এলাকা দীর্ঘমেয়াদে জান্তামুক্ত রেখে সেটিকে কার্যত একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দিকে এগিয়ে নেয়াই এ আন্তর্জাতিক সহায়তার কৌশলগত উদ্দেশ্য।

বাংলাদেশের সীমান্তে বাড়তে থাকা ঝুঁঁকি : এ সশস্ত্র সংঘাতের সরাসরি ও ভয়াবহ প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্ত এলাকায়। টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি, ঘুমধুম ও আশপাশের জনপদগুলো বর্তমানে চরম নিরাপত্তা ঝুঁঁকির মুখে।

গত বছরের ১১ আগস্ট কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের বালুখালী সীমান্তে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কাছে অস্ত্রসহ এক যুবক আত্মসমর্পণ করেন। বিজিবির ভাষ্যমতে, ওই যুবক মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপের একটি ক্যাম্প থেকে পালিয়ে আসা আরাকান আর্মির সক্রিয় সদস্য। তার কাছ থেকে একটি একে-৪৭ রাইফেল, দু’টি ম্যাগাজিন এবং ৫২ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়।

আত্মসমর্পণকারী যুবক নিজেকে জীবন তঞ্চঙ্গ্যা (২১) নামে পরিচয় দিয়ে দাবি করেন, তার বাড়ি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার গর্জবুনিয়া গ্রামে।

তৎকালীন বিজিবি উখিয়া ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, জিজ্ঞাসাবাদে ওই যুবক বলেছেন ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ঝুঁঁকির কারণে তিনি ক্যাম্প ছেড়ে পালিয়ে আসেন। একই সাথে তিনি দাবি করেন, ওই ক্যাম্প থেকে আরো অন্তত ৩০০ আরাকান আর্মির সদস্য পালানোর চেষ্টা করেছিল এবং তাদের কেউ কেউ যেকোনো সময় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে পারে।

পরবর্তীতে ওই সদস্যরা বাংলাদেশে প্রবেশ করেনি। গোয়েন্দা সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, জান্তা বাহিনীর তীব্র আক্রমণের সময় তারা বাংলাদেশে পালানোর পরিকল্পনা করলেও পরবর্তীতে অস্ত্র, খাদ্য ও অর্থের স্থায়ী জোগান পাওয়ায় মিয়ানমারের ভেতরেই অবস্থান ধরে রাখে।

অবৈধ ব্যবসায়ী, মাদককারবারি ও সীমান্ত সিন্ডিকেট : গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, আরাকান আর্মির এ দীর্ঘ যুদ্ধ টিকিয়ে রাখতে অর্থ ও রসদের বড় একটি অংশ আসছে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার অসাধু মাদককারবারি, চোরাকারবারি ও কিছু জেলের মাধ্যমে। এসব চক্র সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী মিয়ানমারে পাচার করছে।

এ অবৈধ জোগানের ওপর ভর করেই প্রায় ৩০০ আরাকান আর্মি সদস্য সীমান্তজুড়ে শক্তিশালী ঘাঁটি নির্মাণ করেছে বলে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে।

সীমান্তজুড়ে তৎপরতা ও ত্রিমুখী সংঘাত : গোপন তথ্যে জানা গেছে, উখিয়া, নাইক্ষ্যংছড়ি ও মংডুর বিপরীতে অন্তত ১৩টি পয়েন্টে আরাকান আর্মি ও রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসার তৎপরতা বেড়েছে। টাউংপিও লেৎ-ইয়ার, এনগারাঘ্যুং, বাউতলাসরিশিং পাড়া, বাউদুল্লামাহিতাউং, অকচিলপাড়া, রেজুপাড়া, চৌধুরীপাড়া এবং লেম্বুচড়াল্যাংমুইপাড়া বেল্টকে ঝুঁঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

স্থানীয় ও গোয়েন্দা সূত্র জানায়, জান্তা বাহিনী আরাকান আর্মির অবস্থানে বিমান হামলা, ড্রোন স্ট্রাইক ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে। অন্য দিকে রোহিঙ্গাদের তিনটি সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থলভাগে আরাকান আর্মির সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। এ ত্রিমুখী সংঘাত টেকনাফ সীমান্তকে ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলি ও মর্টার শেল নিয়মিতভাবে এসে পড়ছে টেকনাফে। গত রোববার আরাকান আর্মির ছোড়া গুলিতে টেকনাফের শিশু হুজাইফা আফনান মাথায় গুরুতর আহত হয়। পর দিন সোমবার আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে মো: হানিফ (২৮)-এর বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

আরাকান আর্মির সক্ষমতা ও ভেতরের ভাঙন : গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে আরাকান আর্মি একটি ‘লেভেল-২’ সামরিক সক্ষমতাসম্পন্ন গোষ্ঠী। তারা মূলত ‘জঙ্গল ওয়ারফেয়ার’-এ দক্ষ। বর্তমানে তারা চীনা রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল, মর্টার শেল, রকেট লাঞ্চার, গ্রেনেড ও ড্রোন ব্যবহার করছে। তবে তাদের কাছে এখনো মিসাইল বা এয়ার ডিফেন্স ব্যবস্থা নেই।

গত বছরের আগস্টে দীর্ঘ সংঘর্ষ, মাদক ও লুটের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ এবং যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় সংগঠনের ভেতরে বড় ধরনের ভাঙন দেখা দেয়। নতুন সদস্যদের বড় অংশ রাখাইন নয় ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হওয়ায় ভাষাগত সমস্যা ও যুদ্ধ অনীহা কার্যক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁঁকি : গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে আরাকান আর্মির সদস্য সংখ্যা প্রায় ৪৫ হাজার। তাদের ক্ষুদ্রাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতাও রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় অবাধ যাতায়াত, উপজাতি সম্প্রদায়ের সাথে আত্মীয়তা, স্থানীয় নারীদের সাথে বিবাহ এবং বসতি স্থাপনের মাধ্যমে তারা বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। আরাকান আর্মি অস্ত্র, মাদক ও মানবপাচারের জন্য মেনচংপাড়া-আলীকদম-চকরিয়া এবং চন্দকপাড়া-থানচি রুট ব্যবহার করছে। একই সাথে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ইয়াবা ও অস্ত্র পাচারও চালাচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্র সতর্ক করে বলছে, মংডু অঞ্চলকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামো গড়ে উঠলে তা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর হুমকিতে পরিণত হতে পারে।