শাহ আলম নূর
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা স্থিতিশীল হলেও শিল্পখাতে ডলার সঙ্কটের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব, ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ধীরগতি, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহার এবং কার্যকর মূলধনের সঙ্কটে দেশের টেক্সটাইল, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, ওষুধ, ইস্পাত, প্লাস্টিক ও প্রকৌশল খাতের বহু প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে অনেক কারখানা আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে, কোথাও উৎপাদন সমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে, আবার কোথাও নীরবে শ্রমিক ছাঁটাই চলছে। তারা বলছেন, সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছে সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানাগুলো, যেগুলো দেশের রফতানিমুখী শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সঙ্কটের সময়ে সবচেয়ে কম সহায়তা পায়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে শিল্প কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ২৯ বিলিয়ন ডলার। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪২ শতাংশ। অন্য দিকে এলসি নিষ্পত্তির গতি এখনো ধীর। ফলে কাগজে-কলমে এলসি খোলা বাড়লেও অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সময়মতো হাতে পাচ্ছে না। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, ব্যাংকগুলো এখনো ডলার সরবরাহে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। অনেক েেত্র অতিরিক্ত মার্জিন, দীর্ঘ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং ডলারের সীমিত প্রাপ্যতার কারণে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সবচেয়ে বড় চাপে রয়েছে দেশের প্রাথমিক টেক্সটাইল খাত। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) তথ্যমতে, দেশে টেক্সটাইল ও স্পিনিং খাতে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ রয়েছে। কিন্তু গত দুই বছরে ডলার সঙ্কট, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ায় অনেক মিল লোকসানে পড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে বিটিএমএ দেশের সব স্পিনিং ও টেক্সটাইল মিল অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণাও দিয়েছিল।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল নয়া দিগন্তকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করার সমতা আমাদের নেই। পরে সরকারের আশ্বাসে কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও শিল্পের সঙ্কট কাটেনি। তিনি বলেন, বর্তমানে অনেক স্পিনিং মিল ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ সমতায় চলছে। শিল্পে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ সুতা বিক্রি না হওয়ায় প্রায় ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ পণ্য মজুদ রয়েছে। এতে নগদ অর্থপ্রবাহে সঙ্কট তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, দুই বছর আগেও তাদের কারখানায় তিন শিফটে উৎপাদন চলত। এখন একাধিক ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানিতে বিলম্ব এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে কারখানার সমতা কমিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছেন তারা।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বড় শিল্প নয়, সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট ও মাঝারি সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানাগুলো। আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে এমন অসংখ্য কারখানা রয়েছে, যারা বড় রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কাজ নিয়ে উৎপাদন করে। কিন্তু বৈশ্বিক বাজারে অর্ডার কমে যাওয়া এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব উৎপাদন সমতা বাড়িয়ে দেয়ায় এসব কারখানার কাজ কমে গেছে।
আশুলিয়ার জামগড়া এলাকার একটি পোশাক কারখানার মালিক বলেন, আগে প্রতি মাসে ৮ থেকে ১০টি বড় অর্ডার পেতেন, এখন তা নেমে এসেছে চার থেকে পাঁচটিতে। ফলে ১৫০ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৪০ জনকে ছাঁটাই করতে হয়েছে।
চট্টগ্রামের একটি সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার সুপারভাইজার আনিছুর রহমান জানান, আগে তাদের কারখানায় ৪৫০ শ্রমিক কাজ করতেন। বর্তমানে শ্রমিকসংখ্যা ৩০০-এর নিচে নেমে এসেছে। তিনি বলেন, বড় ফ্যাক্টরিগুলো নিজেদের অর্ডার নিজেরাই করছে। ছোট কারখানার জন্য কাজ কমে গেছে। কয়েক দফা শ্রমিক কমাতে হয়েছে।
গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক শাহীন মিয়া বলেন, আগে মাসে ২০-২২ হাজার টাকা আয় হতো। এখন ওভারটাইম নেই বললেই চলে। আয় কমে ১৪-১৫ হাজার টাকায় নেমে এসেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
এ দিকে শ্রমিক নেতারা বলছেন, প্রকৃত কর্মসংস্থান সঙ্কট সরকারি পরিসংখ্যানে পুরোপুরি ধরা পড়ে না। কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান আনুষ্ঠানিকভাবে ছাঁটাই না করে শ্রমিকদের ওভারটাইম বন্ধ করে দেয়, চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের বাদ দেয় অথবা কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেয়। ফলে চাকরি হারানোর সংখ্যা বাস্তবে আরো বেশি।
এ দিকে ওষুধ শিল্প তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও এই খাতও চাপের বাইরে নয়। ওষুধ উৎপাদনে ব্যবহৃত অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই), বিশেষায়িত রাসায়নিক ও প্যাকেজিং উপকরণ আমদানিতে বিলম্বের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত মজুদ রাখতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। একইভাবে ইস্পাত, প্লাস্টিক ও প্রকৌশল শিল্পেও কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খোলা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও নিষ্পত্তি কমেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগ বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখা যাচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। শিল্প খাতের সাথে প্রত্য ও পরোভাবে কয়েক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। ফলে শিল্পে উৎপাদন কমে গেলে এর প্রভাব শুধু কারখানার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা রাজস্ব আয়, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, ব্যাংকিং খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, শিল্পের জন্য কাঁচামাল আমদানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। উৎপাদন ব্যাহত হলে কর্মসংস্থান ও রফতানি দু’টিই তিগ্রস্ত হবে। তিনি বলেন, শিল্প খাতের সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর পড়বে।
শিল্পখাতের সঙ্কট মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ৬০০ বিলিয়ন টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। এর একটি অংশ বন্ধ ও সঙ্কটাপন্ন কারখানা আবার চালু এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, শুধু প্রণোদনা দিয়ে পরিস্থিতির সমাধান হবে না। শিল্পের জন্য ডলার সরবরাহ স্বাভাবিক করা, কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রাধিকার দেয়া, ব্যাংক ঋণের সুদহার কমানো এবং উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ এখন এলডিসি উত্তরণের পথে। এমন সময়ে স্থানীয় ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প দুর্বল হয়ে পড়লে রফতানি খাতের প্রতিযোগিতা সমতা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তারা বলছেন, বর্তমান সঙ্কট দৃশ্যমান বিপর্যয়ে রূপ না নিলেও এর নীরব প্রভাব ইতোমধ্যে কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে পড়তে শুরু করেছে।
দ্রুত কার্যকর পদপে না নিলে আগামী মাসগুলোতে আরো বেশি কারখানা উৎপাদন কমাতে বা শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারে। শিল্পখাতে ডলার প্রবাহ, কাঁচামাল আমদানি এবং বিনিয়োগ পরিবেশ স্বাভাবিক করা এখন দেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে তারা মনে করছেন।



