গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে চট্টগ্রামের রফতানিমুখী কারখানা

নূরুল মোস্তফা কাজী, চট্টগ্রাম ব্যুরো
Printed Edition

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে গ্যাস সঙ্কট ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে চলছে গ্যাস বিতরণ কার্যক্রম। গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে প্রায় দেড় হাজার শিল্পকারখানা, বিশেষ করে চার শতাধিক রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানাগুলো। টেক্সটাইল কারখানাগুলোর শতভাগই গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে বলে বিজিএমইএ সংশ্লিষ্টদের দাবি। পাশাপাশি বাসাবাড়ির চুলায় গ্যাসের চাপ কম থাকায় খাবারের দোকানগুলোতে বাড়তি চাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানিয়েছে, সামগ্রিকভাবেই দেশজুড়ে গ্যাসের জোগান স্বাভাবিকের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ কম। ফলে দেশজুড়ে এই সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এমনিতেই চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে গ্যাস সরবরাহে। চাহিদা সাড়ে চার শ’ মিলিয়ন ঘনফুট হলেও সরবরাহ মিলে সোয়া তিন শ’ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি গ্যাস। অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে রেশনিংয়ের মাধ্যমে চলছে এসব গ্যাস বিতরণ। হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ, নয়তো রাষ্ট্রায়ত্ত সারকারখানা বন্ধ রাখতে হয়। কিন্তু বেশ কিছু দিন ধরে সেটিও মিলছে না। ফলে ৪২০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন রাউজান তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র (ইউনিট ১ ও ২) এবং শিকলবাহা ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বাড়বকুণ্ড ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সঙ্কটের কারণে বন্ধ রাখতে হয়েছে।

সূত্র জানিয়েছে, পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী গতকাল চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হয়েছে ২৮০ মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। আজ রোববার তা আরো কমতে পারে বলে আভাস দিয়েছে কেজিডিসিএল সূত্র। সূত্রমতে, চট্টগ্রামের গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের চাহিদা ১৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে মাত্র ২৯ মিলিয়ন ঘনফুট; যা গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে এর মধ্যে বহুজাতিক সারকারখানা কাফকো এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সিইউএফএলকেই দেয়া হচ্ছে ৯০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। অবশ্য আজ তা আরো কমতে পারে বলেও সূত্র জানিয়েছে। বাকি গ্যাস দিয়ে দেড় সহস্রাধিক শিল্পকারখানা এবং বিপুলসংখ্যক নগরবাসীর বাসাবাড়িতে সরবরাহ দেয়া হচ্ছে।

এ দিকে সামগ্রিকভাবে গ্যাসের চাপ কম থাকায় নগরীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাসাবাড়িতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত চুলা জ্বলে মিটি মিটি। ফলে উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক সামগ্রী যেমন রাইস কুকার, ইলেকট্রিক কেটলি, ইনফ্রারেড কুকার, ইনডাকশন কুকার, ওয়াটার হিটার, মাইক্রোওভেন প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে একটি অংশ নিজেদের খাবারের কোনো রকমে ব্যবস্থা করতে পারলেও নাগরিকদের বেশির ভাগকেই খাবারের জন্য উচ্চ মূল্য গুনতে হয়েছে।

কর্নফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানির (কেজিডিসিএল) মহাব্যবস্থাপক (ইঞ্জিনিয়ারিং) প্রকৌশলী মো: শফিউল আজম খান নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা যতটুকু পাচ্ছি রেশনিং করেই সব সেক্টরে বিতরণ করতে হয়। এখন দু’টি সারকারখানায় গ্যাস দিতে হচ্ছে, ফলে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সারকারখানাগুলোকে বর্তমানের চেয়ে আরো কিছুটা কম এবং পিডিবিকেও যা দেয়া হচ্ছে এর চেয়ে কম দেয়ার কথা জানানো হয়েছে। ঢাকার দিকে সরবরাহ কিছুটা বাড়ায় এখানে এত দিন যা দেয়া হচ্ছিল, এর চেয়ে ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত কম সরবরাহ দেয়া হচ্ছে। ফলে এর প্রভাব তো সব সেক্টরেই পড়বে। তবে চট্টগ্রামের অবস্থান এলএনজি টার্মিনালের আপস্ট্রিমে হওয়ায় চাপ সঙ্কট ঢাকার তুলনায় কম বলেও তিনি জানান।

তৈরী পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর পরিচালক সাইফ উল্লাহ মানসুর নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থা অনেকটাই আমদানিকৃত এলএনজিনির্ভর। সরকার অযৌক্তিকভাবে গ্যাসের দাম বাড়ালেও তা আমরা মেনে নিয়েছি নিরবচ্ছিন্নভাবে সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়াতে। সরকার গ্যাসের দাম দ্বিগুণ করার সময় আমাদের শতভাগ কমিটমেন্ট দিয়েছে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস দেয়ার। কিন্তু আমরা সরকারের প্রতিশ্রুত নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাইনি। অধিকন্তু আমদানি ও চাহিদার যে গ্যাপ, আমাদের গ্যাসনির্ভর যেসব কারখানা আছে সেগুলো চালানোর তো বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই। রফতানিমুখী গার্মেন্ট কারখানার প্রায় ৫০ শতাংশই গ্যাসনির্ভর উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো এখন ধ্বংসের পথে। আমাদের এক্সপোর্ট নির্ভর করছে গার্মেন্টের ওপর। গার্মেন্ট নির্ভর করছে টেক্সটাইলের ওপর। কাপড়ের বিদেশ নির্ভরতা কমাতে টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিকে এনকারেজ করা হচ্ছে। আর টেক্সটাইল তো শতভাগই গ্যাসনির্ভর। তিনি বলেন, নতুন বিনিয়োগ তো পরের কথা, যেগুলো বিনিয়োগ হয়ে গেছে, ব্যাংক লোন নিয়ে গ্যাস বেসড ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করেছে- গ্যাস না পেলে তো তাদের কারখানা রান করার কোনো সম্ভাবনা নেই। রাষ্ট্রকে আমার চাহিদানুযায়ীই তো গ্যাস আমদানি করতে হবে। নইলে এর দায়-দায়িত্ব কে নেবে? রফতানি আয় ধরে রাখতে সাপ্লাই চেইন নিরবচ্ছিন্ন রাখতে হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।