তেলমুক্ত ধানের কুঁড়া নিতে চায় চীন ‘আপাতত না’ বাংলাদেশের

রফতানির জন্য উভয় দেশ থেকে খসড়া প্রটোকল চূড়ান্ত করা হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত রফতানির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

কাওসার আজম
Printed Edition

বাংলাদেশ থেকে গো-খাদ্য তথা ফিড তৈরির উপাদান তেলমুক্ত ধানের কুঁড়া নিতে চায় চীন। চালের কুঁড়া থেকে উৎপন্ন (বায়োপ্রডাক্ট) প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন সমৃদ্ধ ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান বা তেলমুক্ত ধানের কুঁড়া আমদানির চীনা প্রস্তাবনার উপর পর পর দুটি বৈঠক করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ। ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান রফতানির আবশ্যকতা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জসমূহ পর্যালোচনায় গত মে মাসের শেষ সপ্তাহে পর পর দুটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পিপিসি) ড. মো: মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় কৃষি মন্ত্রণালয় ও অধিভুক্ত সংস্থা/দফতর ছাড়াও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। রফতানির জন্য উভয় দেশ থেকে খসড়া প্রটোকল চূড়ান্ত করা হলেও অভ্যন্তরীণ চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে আপাতত রফতানির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে যেতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা। তবে, পরবর্তীতে এ বিষয়ে আরো বড় পরিসরে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে বলে জানা যায়।

বৈঠকে মাহমুদুর রহমান জানান, বাংলাদেশ থেকে খৈল (ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান) আমদানির লক্ষ্যে চীনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি খসড়া প্রটোকল বেইজিংয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। খসড়া প্রটোকলটি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পক্ষের সাথে পর্যালোচনার পর কৃষি মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত করে তা গত বছরের জুন মাসে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে চীন কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠায়। পরবর্তীতে চীন সরকার খসড়া প্রটোকলটিতে বেশ কিছু সংযোজন/বিয়োজন প্রস্তাব করে পুনরায় কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। প্রাপ্ত খসড়া প্রটোকলটির উপর স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়/বিভাগ/ দফতর/সংস্থার মতামত চাওয়া হলে খাদ্য মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, ব্রি, বারি, বারটান হতে লিখিত মতামত পাওয়া যায়। সেই আলোকেই গত মাসের শেষ সপ্তাহে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।

বৈঠকের কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, খৈল বা ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান নিরাপদে রফতানির জন্য বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি প্রটোকলে সম্মত হয়েছে মর্মে একটি খসড়া প্রটোকল চূড়ান্ত করা হয়। এতে বলা হয়, ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান (খৈল) বলতে ধানের তুষ থেকে তেল নিষ্কাশনের মাধ্যসে প্রক্রিয়াজাত এমন একটি উপজাত, যা অবশ্যই বাংলাদেশের ভেতরে উৎপাদিত ধান থেকেই তৈরি হতে হবে। এতে পোকামাকড়, ক্ষতিকর জীবাণু, উদ্ভিদ বা আগাছার বীজ, প্রাণীর বিষ্ঠা বা মৃতদেহ, পালক, মাটি কিংবা চীনের অনুমোদনবিহীন জেনেটিক্যালি মডিফায়েড উপাদান (জিওএম) থাকতে পারবে না। চীনের এই খসড়া প্রটোকলের বিপরীতে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ কিছুটা সংযোজন/বিয়োজন করেছে। উভয় দেশ সম্মত হলে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি হবে। তবে, উভয় পক্ষ চাইলে পরবর্তীতে আরো পাঁচ বছর চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যাবে।

তবে, প্রটোকলের খসড়া প্রস্তুত হলেও বাংলাদেশ থেকে ধানের কুঁড়া থেকে উৎপন্ন খৈল (বায়োপ্রডাক্ট) বা রাইস ব্রান কেক রফতানির ক্ষেত্রে

ভিন্ন মত আসে বৈঠকে। ব্রি’র প্রতিনিধি ড. হাবিবুল বারি সজিব বলেন, বাংলাদেশ থেকে চীনে ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান রফতানির ক্ষেত্রে উভয় দেশের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তা চূড়ান্ত করা প্রয়োজন। তিনি আরো বলেন, এই ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান বাংলাদেশে পশুখাদ্য ও অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে খৈল-এর মূল্য বৃদ্ধি/সঙ্কট হবে কি না- তা বিবেচনায় নিয়ে রফতানির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন। তিনি স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট পক্ষের অংশগ্রহণে একটি সভা আয়োজনের প্রস্তাব দেন। এ বিষয়ে সভার সভাপতি অতিরিক্ত সচিব ড. মাহমুদুর রহমান খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বিএসটিআই, রফতানিকারক এসোসিয়েশন, বাংলাদেশ পোলট্রি ফিড এসোসিয়েশনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে একটি সভা আয়োজনের প্রস্তাব করলে উপস্থিত সবাই এতে সহমত পোষণ করেন। এর দুই দিন পর আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সূত্র জানায়, বৈঠকে ফিড এসোসিয়েশনের নেতারা বাংলাদেশ থেকে ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান রফতানির বিরোধিতা করেন। তারা বৈঠকে জানান, ফিড তৈরিতে ব্যবহৃত ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান বাংলাদেশে চাহিদা প্রায় ৬০ হাজার টন। উৎপন্ন হয় ৪০ হাজার টন। বাকি ২০ হাজার টন ভারত থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু, এটিও এখন বন্ধ আছে। সব মিলিয়ে ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান-এর ঘাটতি আছে। এ অবস্থায় কোনোভাবেই যেন চীনে ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান রফতানির অনুমোদন না দিতে জোরালো বিরোধিতা করেন সংশ্লিষ্টরা।

বৈঠকে উপস্থিত ব্রি’র প্রতিনিধি মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এবং শস্যমান ও পুষ্টি বিভাগের প্রধান ড. শরিফা সুলতানা দীপ্তি বলেন, সামগ্রিক বিবেচনায় চীনে ডি-ওয়েল্ড রাইস ব্রান রফতানির বিষয়ে আপাতত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না।