শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ মুখ খুলতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা

ফুটপাথ থেকে শুরু করে ডিশ (ক্যাবল টিভি) ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ট্রাক টার্মিনাল, বাজার ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি, অবৈধ জমি দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা। যা ভয়ে মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কয়েকজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বের হওয়ার পর তাদের পুরনো সহযোগী ও ক্যাডারদের মাধ্যমে রাজধানীর অপরাধচক্র পুনর্গঠনের অভিযোগও উঠেছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নামে ব্যবহার করে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ফুটপাথ থেকে শুরু করে ডিশ (ক্যাবল টিভি) ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ, ট্রাক টার্মিনাল, বাজার ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি, অবৈধ জমি দখল এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঘটছে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা। যা ভয়ে মুখ ফুটে প্রকাশ করতে পারছেন না ভুক্তভোগীরা। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কয়েকজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বের হওয়ার পর তাদের পুরনো সহযোগী ও ক্যাডারদের মাধ্যমে রাজধানীর অপরাধচক্র পুনর্গঠনের অভিযোগও উঠেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশের সূচনা হলেও অপরাধ জগতের বাস্তব চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর রাজধানীবাসী সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজিমুক্ত নগরীর প্রত্যাশা করলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী আবারো তাদের পুরনো নেটওয়ার্ক সক্রিয় করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, আশির দশকের রাজধানীর অন্যতম আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে ‘সুইডেন আসলাম’-এর নাম আবারো আলোচনায় এসেছে। তার বিরুদ্ধে থাকা ২২টি মামলার মধ্যে ৯টিই হত্যার। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা না দিলেও, তার দীর্ঘদিনের অপরাধী নেটওয়ার্ক আবারো সক্রিয় হয়েছে। বিশেষ করে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, ফার্মগেট ও তেজগাঁও এলাকার বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর সুইডেন আসলামের নামে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কারাবন্দী অবস্থায় তিনি যেভাবে পিচ্চি হান্নানের মাধ্যমে নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, এখন সেই দায়িত্ব পালন করছেন তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা।

অভিযোগ রয়েছে, সুইডেন আসলামের অন্যতম সহযোগী দুলাল হোসেন, গালিব, চন্দন, মিলন, বাদশা ও গোপাল এখনো তার নির্দেশনায় বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। এর মধ্যে শীর্ষ সন্ত্রাসী বাদশাকে পূর্ব রাজাবাজার এলাকার অন্যতম প্রভাবশালী হিসেবে উল্লেখ করছেন স্থানীয়রা। বাদশার হয়ে মাঠপর্যায়ে কাজ করেন আহাদ, সিদ্দিক, রাকিব, মাসুদসহ আরো কয়েকজন ক্যাডার। স্থানীয়দের অভিযোগ, এই গ্রুপের সদস্যরা কাওরান বাজার, ফার্মগেট এবং আশপাশের এলাকায় নিয়মিত চাঁদাবাজি করে। শুধু ছোট ব্যবসায়ী নয়, বড় ব্যবসায়ী ও ঠিকাদারদের কাছ থেকেও সুইডেন আসলামের নাম ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এই নতুন চাঁদাবাজি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেয়া প্রথম দিকের ব্যক্তিদের একজন ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা আজিজুর রহমান মুছাব্বির। কাওরান বাজার ও ফার্মগেট এলাকায় প্রকাশ্য চাঁদাবাজির প্রতিবাদে তিনি মানববন্ধন ও প্রতিরোধ কর্মসূচি আয়োজন করেছিলেন। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকেই তিনি বিভিন্ন ধরনের হুমকির মুখে পড়েন। চলতি বছরের শুরুতে পশ্চিম তেজতুরী বাজারের হোটেল সুপারস্টারের সামনে ওঁৎ পেতে থাকা ভাড়াটে শুটাররা তাকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন তিনি এবং পরে মারা যান।

স্থানীয় অনেকের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডে আসলাম বাহিনীর পরোক্ষ প্রভাব ছিল। এলাকার ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় আরো অনেক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্য দিবালোকে মারধরের শিকার হতে হয়েছে। ফলে পুরো এলাকায় এখন এক ধরনের অঘোষিত নীরবতা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।

শুধু কাওরান বাজার-ফার্মগেট নয়, রাজধানীর পূর্বাঞ্চলেও নতুন করে শুরু হয়েছে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে রক্তক্ষয়ী গ্যাং ওয়ার। দীর্ঘ প্রায় ১৮ থেকে ২০ বছর কারাভোগের পর সম্প্রতি জামিনে মুক্তি পান হাতিরঝিল ও রামপুরা এলাকার তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’। জামিনে মুক্তির মাত্র এক মাসের মাথায়, গত ১২ জুন রামপুরা এলাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন, পরে তার মৃত্যু হয়। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ডিশ ব্যবসা, স্থানীয় আধিপত্য এবং আবাসন প্রকল্পগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জের ধরেই এই হামলার ঘটনা ঘটে।

পুলিশের ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে রয়েছে। জামিনে মুক্ত তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের ওপর নিবিড় নজরদারি রয়েছে বলেই তারা প্রকাশ্যে আসতে পারছে না। তবে তাদের নাম ব্যবহার করে চাঁদাবাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।