গতির ঝড় বনাম রক্ষণ দেয়ালের লড়াই

ফ্রান্স-প্যারাগুয়ে

Printed Edition
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কিছুটা নির্ভার তারকাখচিত ফ্রান্স  /  ষোলোতে ওঠার লড়াইয়ে কঠোর অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা  : ইন্টারনেট
প্যারাগুয়ের বিপক্ষে কিছুটা নির্ভার তারকাখচিত ফ্রান্স / ষোলোতে ওঠার লড়াইয়ে কঠোর অনুশীলনে ঘাম ঝরাচ্ছেন প্যারাগুয়ের ফুটবলাররা : ইন্টারনেট

ক্রীড়া প্রতিবেদক

বিশ্বকাপের এবারের আসরে সবচেয়ে ধারাবাহিক দল ফ্রান্স। শেষ ৩২-এর লড়াইয়ে সুইডেনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে শেষ ষোলোতে জায়গা করে আবারো প্রমাণ দিয়েছে ২০১৮ আসরের চ্যাম্পিয়নরা। অপরদিকে নিজেদের রক্ষণের দৃঢ়তায় পাওয়ার ফুটবলের দেশ জার্মানিকে টাইব্রেকারে হারিয়ে সেরা ১৬-তে জায়গা পেয়েছে প্যারাগুয়ে। কোয়ার্টার ফাইনালে উঠার লড়াইয়ে এবার মুখোমুখি হবে ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশ। ফ্রান্সের সামনে প্যারাগুয়ে। ফুটবল বিশ্ব দেখবে ইউরোপের শক্তিধর ফ্রান্স ও দক্ষিণ আমেরিকার ঐতিহ্যবাহী দল প্যারাগুয়ের লড়াই। এক দিকে রয়েছে তারকায় ঠাসা ফরাসি দল, অন্যদিকে কঠোর রক্ষণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল ও অদম্য লড়াইয়ের মানসিকতায় ভর করে এগিয়ে আসা প্যারাগুয়ে। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ৩টায় যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ার মাঠের লড়াইয়ে নামবে দুই দল।

রাউন্ড অব ৩২-এ দুই দলের পথচলা ছিল ভিন্ন ধরনের। সুইডেনকে ৩-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে ফ্রান্স। পুরো ম্যাচে বলের দখল, আক্রমণের ধার এবং রক্ষণে দৃঢ়তা- সব ক্ষেত্রেই প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিল তারা। অন্যদিকে প্যারাগুয়েকে শেষ ষোলো নিশ্চিত করতে লড়তে হয়েছে অনেক বেশি। জার্মানির বিপক্ষে ১-১ সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচে টাইব্রেকারে স্নায়ুর পরীক্ষা উতরে তারা জায়গা করে নিয়েছে শেষ ১৬-তে। ফলে আত্মবিশ্বাসে দুই দলই উজ্জীবিত হলেও তাদের ম্যাচ জয়ের ধরন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের স্কোয়াডের গভীরতা। মাঠের প্রতিটি বিভাগেই বিশ্বমানের খেলোয়াড় রয়েছে। আক্রমণে কিলিয়ান এমবাপ্পে এখনো প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। তার গতি, ড্রিবলিং এবং গোল করার ক্ষমতা যেকোনো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই বিধ্বংসী আক্রমণভাগে এমবাপ্পের সাথে আছেন উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে ও ব্র্যাডলি বারকোলার মতো তারকা। মাঝমাঠেও ফরাসিদের শক্তি কম নয়। অরেলিয়েন চুয়ামেনি, এন’গোলো কন্তে, ওয়ারেন জায়ের-এমেরি কিংবা আদ্রিয়েন রাবিওর মতো ফুটবলাররা বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি দ্রুত আক্রমণে রূপান্তর ঘটাতে পারেন। রক্ষণে উইলিয়াম সালিবা ও দায়ো উপামেকানোর অভিজ্ঞতা ফ্রান্সকে আরো আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে।

দিদিয়ে দেশমের দল সাধারণত ম্যাচের শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার চেষ্টা করে। দ্রুত বল আদান-প্রদান, দুই উইং ব্যবহার এবং হঠাৎ গতির পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙাই তাদের মূল পরিকল্পনা। বড় টুর্নামেন্টে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকায় নকআউট ম্যাচের চাপও তারা ভালোভাবেই সামলাতে পারে।

প্যারাগুয়ের শক্তি ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত সংগঠনে। তারা খুব বেশি ঝুঁকি নিয়ে আক্রমণে যায় না। বরং রক্ষণকে সুসংগঠিত রেখে সুযোগ পেলেই পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চমকে দেয়ার চেষ্টা করে। জার্মানির বিপক্ষে এই কৌশলই সফল হয়েছে ল্যাটিন আমেরিকার দেশটি।

প্যারাগুয়ের অন্যতম বড় অস্ত্র মিগেল আলমিরনের গতি এবং সৃজনশীলতা। মাঝমাঠে দিয়েগো গোমেজের পরিশ্রম এবং বল পাসিংয়ের দক্ষতা দলের ভারসাম্য বজায় রাখে। রক্ষণভাগে গুস্তাভো গোমেজের নেতৃত্ব পুরো দলকে আত্মবিশ্বাস জোগায়। ফ্রান্সের মতো আক্রমণাত্মক দলের বিপক্ষে তার অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। সান্ডারল্যান্ডের সেন্টার-ব্যাক ওমর আলদেরেতে হাঁটুর চোট থেকে এখনো পুরোপুরি সেরে ওঠেননি। তাই হোসে কানালে ৯৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা গুস্তাভো গোমেজের সাথে সেন্টার-ব্যাকে তার শুরুর একাদশের জায়গা ধরে রাখতে পারেন। ফুল-ব্যাক হুয়ান হোসে কাসেরেস ও জুনিয়র আলোনসো চারজনের রক্ষণভাগ পূর্ণ করবেন। এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে ফেরার জন্য প্রস্তুত ব্রাইটনের দিয়েগো গোমেজ। সেন্ট্রাল মিডফিল্ডে তার সাথে যোগ দিতে পারেন আন্দ্রেস কুবাস, দামিয়ান বোবাদিয়া অথবা মাতিয়াস গালারজা। দলে আছেন জার্মানির বিপক্ষে গোল করা স্ট্রাসবার্গের হুলিও এনসিসো। তার সাথে খেলা চালিয়ে যাবেন মিগেল আলমিরন উইংয়ে। সেন্ট্রাল স্ট্রাইকার হিসেবে আছেন গ্যাব্রিয়েল আভালোস।

২০২৪ সালের আগস্টে আলফারো দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ১২টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে তারা মাত্র একটিতে হেরেছে। সব প্রতিযোগিতা মিলে তাদের শেষ ২৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে পরাজিত হয়েছে (১০ জয়, ৮ ড্র)। তবে ফ্রান্সের বিপক্ষে আগের পাঁচটি ম্যাচে কোনোটিতে জয় পায়নি প্যারাগুয়ে (২টি ড্র, ৩টি হার)। আর বিশ্বকাপে ১৯৯৮ সালে শেষ ষোলোর ম্যাচে ১১৪ মিনিটে লরেন্ট ব্লাঙ্কের করা গোল্ডেন গোলের সুবাদে ১-০ গোলে পরাজিত হয়েছিল ল্যাটিন দেশটি। এবার তাদের সামনে লেস ব্লুজদের হারিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার।

তবে একটি বিষয়ের দিকে নজর রাখতে হবে, আর তা হলো গরম। তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট) পর্যন্ত পৌঁছানোর পূর্বাভাস থাকায়, এই পরিস্থিতি প্যারাগুয়ের অনুকূলে কাজ করতে পারে।