আরাকচি-গালিবাফকে হত্যার ইসরাইলি ছক উন্মোচন

Printed Edition
আরাকচি-গালিবাফকে হত্যার ইসরাইলি ছক উন্মোচন
আরাকচি-গালিবাফকে হত্যার ইসরাইলি ছক উন্মোচন

নিউ ইয়র্ক টাইমস

চলতি বছরের বসন্তকালে তেহরানের সাথে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে ওয়াশিংটন যখন নিবিড় আলোচনায় ব্যস্ত, ঠিক তখন ইরানের শীর্ষ আলোচকদের হত্যার চক্রান্ত করেছিল ইসরাইল। বর্তমান ও সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

সঙ্ঘাতের শুরু থেকেই ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা ইসরাইলের যুদ্ধকৌশলের অংশ ছিল। তবে গত এপ্রিলে সংবেদনশীল যুদ্ধবিরতি আলোচনা শুরুর পর, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফকে ইসরাইল হত্যা করতে পারে-এমন আশঙ্কা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে। কয়েকজন কর্মকর্তার মতে, এই দুই শীর্ষ নেতাকে হত্যা করা হলে শান্তি প্রক্রিয়া পুরোপুরি ভেঙে পড়বে-এই আশঙ্কায় অঞ্চলের অন্য দেশগুলোকে ইরানের এই দুই কর্মকর্তার নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক করার অনুরোধও জানিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।

মার্কিন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, যুদ্ধের তীব্রতম সময়ে সরকারের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব হিসেবে আরাকচি ও গালিবাফ ইসরাইলের জন্য ‘বৈধ’ লক্ষ্যবস্তু হতে পারতেন। কারণ, ইসরাইলের মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে উৎখাত করা। তবে এপ্রিলের সংবেদনশীল মুহূর্তে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভয় ছিল, ইরানি নেতাদের ওপর যেকোনো হামলা চলমান আলোচনা নস্যাৎ করে যুদ্ধকে আরো উসকে দেবে। আংশিকভাবে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভর করে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর ইসরাইলি আগ্রাসনের মাধ্যমে এই সঙ্ঘাতের সূত্রপাত ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। মার্কিন বাহিনী ইরানের নৌবাহিনী ও ক্ষেপণাস্ত্রভাণ্ডারকে লক্ষ্যবস্তু করলেও, ইসরাইল যুদ্ধের প্রাথমিক ধাপে তেহরানের নেতৃত্বকে খতম করার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেয়। তাদের লক্ষ্য ছিল যত বেশি সম্ভব উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে হত্যা করা। এর আওতায় এমন কিছু বাস্তববাদী নেতাও ছিলেন, যাদের সাথে ট্রাম্প প্রশাসন আলোচনার আশা করেছিল। যেমন ইরানের শীর্ষ জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলী লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি। ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত হওয়ার সময় এই দু’জনই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সংলাপে সম্পৃক্ত ছিলেন।

ইরানের শীর্ষ দুই আলোচককে হত্যার এই সম্ভাব্য ইসরাইলি চক্রান্ত থেকে স্পষ্ট হয়, যুদ্ধ শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের লক্ষ্য কাছাকাছি থাকলেও তা কত দ্রুত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। এপ্রিলের শুরুতে ওয়াশিংটন যখন শান্তিচুক্তি চাইছিল, ইসরাইল তখন প্রাথমিক যুদ্ধবিরতির শুরু থেকেই সন্দিহান ছিল। এপ্রিলের প্রথম দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ইসরাইলি কর্মকর্তাদের অনিচ্ছাকৃত সমর্থন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে তীব্র উদ্বেগের জন্ম দেয় যে, যুক্তরাষ্ট্র বড্ড দ্রুত যুদ্ধ শেষ করে ফেলছে। তবে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরিবর্তে ইরানের সরকার আরো কঠোর রূপ নেয় এবং ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করে। আরাকচি ও গালিবাফই হলেন সেই দুই গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, যারা যুদ্ধবিরতি অর্জন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্থায়ী শান্তির জন্য আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে আলোচনা চালাচ্ছিলেন। গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি রূপরেখা চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়, যা হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়ার পথ সুগম করার পাশাপাশি তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার সুযোগ তৈরি করে।

তবে ইসরাইলের কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকেরা এই প্রাথমিক চুক্তিকে চরম বিপর্যয় হিসেবে দেখছেন। কারণ, এটি শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন করা, ইরানের প্রক্সি বাহিনীকে ধ্বংস করা কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মারাত্মক ক্ষতি করার মতো ইসরাইলের কোনো যুদ্ধলক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি। ইসরাইলি কর্মকর্তাদের আরো ভয় ছিল, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরান শত শত কোটি ডলার পেয়ে যাবে, যা তাদের পারমাণবিক আকাক্সক্ষাকে উল্লেখযোগ্যভাবে নিয়ন্ত্রণ না করেই যুদ্ধের পর দ্রুত পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে। ওয়াশিংটনে ইসরাইলি দূতাবাসের একজন মুখপাত্র এই বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। অন্যদিকে, ইসরাইলের চক্রান্ত ও ইরানকে সতর্ক করার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার কাতারে ফলপ্রসূ বৈঠক করেছেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান শান্তি প্রক্রিয়াটি ‘চলুক’।

এর আগে গত মার্চে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল খবর প্রকাশ করেছিল যে, ইসরাইলের হত্যার তালিকায় আরাকচি ও গালিবাফের নাম ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের আলোচনা শুরুর পর সাময়িকভাবে তাদের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দু’জন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্প প্রশাসন জানতে পেরেছিল যে অন্তত গালিবাফ ইসরাইলের হত্যা তালিকায় ছিলেন এবং তারা ইসরাইলকে এ থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছিল।