শেষ ঘণ্টার বিক্রয়চাপই পতন ঘটাল পুঁজিবাজারের

পতনের দিনেও মূল্যবৃদ্ধিতে এগিয়ে বীমা খাত

Printed Edition
শেষ ঘণ্টার বিক্রয়চাপই পতন ঘটাল পুঁজিবাজারের
শেষ ঘণ্টার বিক্রয়চাপই পতন ঘটাল পুঁজিবাজারের

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পতন দিয়েই নতুন সপ্তাহ শুরু করেছে পুঁজিবাজার। লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে সূচক হারানো এবং পরবর্তী সময়ে ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়ানো পুঁজিবাজারগুলো গতকাল লেনদেনের বেশির ভাগ সময় সূচকের উন্নতি ধরে রাখলেও শেষ মুহূর্তে এসে নতুন করে ব্যাপক বিক্রয়চাপের মুখে সূচক হারায়। দিনের শুরুতে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ বাজারগুলো যত দ্রুত সামলে নেয় শেষদিকে এসে তা পারেনি। এক ঘণ্টার বিক্রয়চাপ দ্রুত পতন ঘটায় বাজারের। আর এভাবে দুই বাজারেই লেনদেন হওয়া কোম্পানির বেশির ভাগ দরপতনের শিকার হয়।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৭ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট পতনের শিকার হয়। সকালে পাঁচ হাজার ৯৯ দশমিক ৬১ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি রোববার দিনশেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ৭২ দশমিক ১৪ পয়েন্টে। একই সময় ডিএসইর বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ১৫ দশমিক ০৬ ও ৭ দশমিক ৭৬ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৬ দশমিক ১৮ পয়েন্ট হ্রাস পায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪৩ দশমিক ৪৪ ও ১০ দশমিক ৪৩ পয়েন্ট।

ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনের শুরুতে বিক্রয়য়চাপের মুখে সূচকটি প্রায় ১৫ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। কিন্তু পরক্ষণেই এ চাপ নেয় বাজারটি। পরবর্তী ১০ মিনিটের মধ্যেই এ চাপ সামলে নেয় বাজারটি। এ সময় সূচকটি পৌঁছে যায় পাঁচ হাজার ১০৩ পয়েন্টে। পরে আরো একবার বিক্রয়চাপের মুখে পড়লেও বাজারটি তা সামলে নিতে সক্ষম হয়। লেনদেনের পরবর্তী দুই ঘণ্টা ডিএসই সূচক উন্নতি ধরে রাখে। কিন্তু বেলা ১টার পর নতুন করে বিক্রয়চাপ হয় যা পরে আরো তীব্র আকার ধারণ করে। শেষদিকে সৃষ্টি হওয়া এ চাপ আর সামলে উঠতে পারেনি বাজারটি।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা দিনের বাজার আচরণ বিশ্লেষণ করে বলেন, গত সপ্তাহের প্রথমদিকে বাজারে মূল্যস্তর যেভাবে বেড়েিেছল সে তুলনায় সংশোধন ঘটেনি। এখন হয়তো বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নেয়াই ভালো মনে করেছেন। সে কারণে গতকাল বিক্রয়চাপ শেষদিকে এসে তীব্র হয়েছে। তারা এটাকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট হিসেবেই দেখছেন। কারণ গত সপ্তাহের শুরুতে বাজার যে গতি ধরে রেখেছিল পরে তা আর পারেনি। তাই তারা বিনিয়োগের মুনাফা তুলে নেয়াকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। তা ছাড়া নির্বাচনের ডামাডোলের মধ্যে পারস্পকির কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে, যা বাজারকে প্রভাবিত করতে পারে। হয়তো এ চিন্তা থেকেই বিক্রয়চাপ বেড়ে গেছে। তবে তারা মনে করেন, এটা সাময়িক।

এ দিকে সূচকের পতনের দিনেও কিছু কিছু খাতের মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা দেখা গেছে। এদের মধ্যে ছিল চামড়া ও বীমা খাত। গতকাল বীমা খাতের ৫৮টি কোম্পানির মধ্যে ৫০টির বেশি কোম্পানি উঠে আসে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। গত বৃহস্পতিবারের মতো গতকালও ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দুই কোম্পানি ছিল বীমা খাতের। এ নিয়ে গত চার কর্মদিবসের বেশি সময় ধরে বীমা খাতই এগিয়ে থাকছে মূল্যবদ্ধিতে। হঠাৎ বীমা খাতে বিেিনয়াগকারীদের এ আগ্রহের বিষয় জানতে চাইলে একটি বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নয়া দিগন্তকে বলেন, বীমা খাতে এতদিন ধরে যে কমিশন বাণিজ্য ছিল তা এখন আর থাকবে না। তাই এতদিন কোম্পানিগুলোর মুনাফার একটি বড় অংশই কমিশনে চলে যেত। এতে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফার সঠিক চিত্র থাকত না। এখন আর এটার সুযোগ নেই। তাই কোম্পানিগুলো ভাল লভ্যাংশ দিতে পারবে। এ জন্য এ খাতে নতুন করে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গতকাল বীমা ছাড়া বাজারের বড় খাতগুলোতে ব্যাপক দরপতন ঘটেছে। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, টেক্সটাইলস, ওষুধ ও রসায়ন এবং বিবিধ খাতে ব্যাপক দরপতন ঘটে গতকাল। বড় খাতগুলোর মধ্যে কিছুটা ভালো অবস্থানে ছিল মিউচুয়াল ফান্ড। আর এ দরপতনের দিক থেকে দুই বাজারের মৌল ভিত্তিতে এগিয়ে থাকা সূচকটিই বেশি দরপতনের শিকার ছিল। কারণ মৌল ভিত্তির দিক থেকে এগিয়ে থাকা কোম্পানিগুলোই বেশি দর হারিয়েছে গতকাল

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ছিল এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ। ১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ২৪ লাখ ৬৮ হাাজর শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৩ কোটি ৫১ লাখ টাকায় পাঁচ লাখ ৭২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে আনোয়ার গ্যালভেনাইজিং, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি, প্রগতি ইন্স্যুরেন্স, সিটি ব্যাংক ও এপেক্স স্পিনিং।

ডিএসইতে দিনের মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল বেসরকারি খাতের সাধারণ বীমা কোম্পানি এশিয়া ইন্স্যুরেন্স। গতকাল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ট্রাস্ট ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, পুরবী জেনারেল ইন্স্যুরেন্স, সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ইস্টল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স, ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্স, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স ও কনফিডেন্স সিমেন্ট।

দিনের দরপতনের শীর্ষে ছিল টেক্সটাইল খাতের ফ্যামিলিটেক্স। ৮ দশমিক ৩৩ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৬ দশমিক ৩৮ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল একই খাতের ম্যাকসন্স স্পিনিং। দরপতনে ডিএসইর শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে নিউলাইন ক্ল¬দিং, তাল্লু স্পিনিং, ইসলামিক ফিন্যান্স, সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস, আনলিমা ইয়ার্ন, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড ও মালেক স্পিনিং।