শেখ হাসিনাকে কটূক্তির অভিযোগে চাকরিচ্যুত

আদালতের নির্দেশে ১২ বছর পর চাকরি ফিরে পেলেও অনিশ্চয়তায় প্রফেসর ড. ইকবাল

Printed Edition

গাজীপুর জেলা প্রতিনিধি

আদালতের নির্দেশে ১২ বছর পর চাকরি ফিরে পেলেও শিক্ষকতায় ফেরা এখনো অনিশ্চিত গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (তৎকালীন-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যাপক ড. এস এম ইকবাল হোসেনের। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তির অভিযোগে প্রশাসনের অন্যায় আদেশে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে চাকরি হারান তিনি। এর বিরুদ্ধে ২০১৭ সালে হাইকোর্টে তিনি একটি রিট পিটিশন করেছিলেন। তবে ওই সময় মামলা খুব একটা আগায়নি। ২০২৪ এর গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের পতনের পর মামলার চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০২৫ এর ১১ ডিসেম্বর মহামান্য হাইকোর্ট আগামী দুই মাসের মধ্যে তার সমুদয় বকেয়া বেতন ও সুবিধা পরিশোধসহ চাকরি ফিরিয়ে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করায় ড. ইকবালের চাকরিতে যোগদানের বিষয়টি আবারো ঝুলে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতা শেষে আবার কবে নতুন সিদ্ধান্ত আসবে সেটাও অনিশ্চিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসন তার চাকরি ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়াকে আরো প্রলম্বিত ও জটিল করে তুলছে বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী প্রফেসর ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের রাহু দেশের সব নাগরিকের ওপর থেকে সরে গেলেও আমার ওপর থেকে কাটেনি। শেখ হাসিনার পতনের পরও নানা অজুহাতে নানা প্রক্রিয়ায় স্বৈরাচার সরকারের সিদ্ধান্তের পুনরাবৃত্তিই ঘটেছে। ফলে আমার চাকরি জীবনের শেষ দিকে এসেও অনিশ্চয়তা কাটাতে আদালত ও প্রশাসনের বারান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছি।

প্রফেসর ইকবাল হোসেন জানান, বিগত স্বৈরাচার সরকারের সময় একটি তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদ্বেষমূলক সিদ্ধান্তে তৎকালীন দলীয় সিন্ডিকেটের এক সভার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক পদের চাকরি থেকে তাকে অপসারণ করা হয়। তৎকালীন প্রশাসনের কাছে নানা অনুনয় বিনয় করেও কোনো লাভ হয়নি। পারিবারিকভাবে এবং ছাত্রজীবন থেকে আদর্শগতভাবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনুসারী দাবি করে তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণ চুরি বিষয়কে কেন্দ্র করে তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কটূক্তি একটি ইস্যু মাত্র। আমার বিষয়ে সে সময় যে অভিযোগ করা হয়েছে তা সত্য নয়। এ বিষয়ে আমি অকাট্য প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করেছি। কিন্তু সেগুলো আমলে না নিয়ে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে শুধু রাজনৈতিক কারণেই আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। উক্ত অপসারণের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে ২০১৭ সালে মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করি যাহার নম্বর রিট পটিশন নং-১৬৭৪৮/২০১৭। হাইকোর্ট উক্ত রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে রুলনিশি জারি করেন।

তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতন হলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ফিরে পাওয়ার বিষয়ে প্রচণ্ড আশাবাদের সৃষ্টি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবর্তিত প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে হাইকোর্টের বিচারাধীন বিষয়টি মীমাংসা করে আসতে বলা হয়। অবশেষে ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ মহামান্য হাইকোর্ট প্রফেসর ইকবাল হোসেনের চাকরি ফিরে পাওয়ার পক্ষে রায় প্রদান করেন। তাতে রায় প্রদানের তারিখ থেকে দুই মাসের মধ্যে তাকে পূর্ব পদে পুনর্বহাল এবং একই সাথে তার সকল বকেয়া বেতন-ভাতা ও অন্যান্য পাওনাদি পরিশোধের নির্দেশ প্রদান করেন।

কিন্তু হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগে লিভ টু আপিল দায়ের করেন। গত ৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত প্রার্থনা করলে চেম্বার জজ আদালত স্থগিতাদেশ প্রদান না করে মামলাটি শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করেন। ড. ইকবাল দাবি করেন বিষয়টি তার যোগদান প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত ও সময়ক্ষেপণের জন্য করা হয়েছে। এটি হয়রানিমূলক। এটি তার পেশাগত জীবনে ফিরে যাওয়াকে বিলম্বিত করছে। তিনি বলেন, যেহেতু চেম্বার জজ কোনো স্টে অর্ডার প্রদান করেন নাই, সঙ্গতকারণেই হাইকোর্ট প্রদত্ত রায়ে আমাকে চাকরিতে পুনর্বহালের প্রদানের যে নির্দেশ প্রদান করেছেন তা কার্যকর রয়েছে। তিনি বলেন, আমি আমার পূর্বতন কর্মস্থলকে সম্মান করি ও কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মহামান্য হাইকোর্টে প্রদত্ত ন্যায়সঙ্গত রায় ও নির্দেশনা যথাযথ বাস্তবায়নপূর্বক আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে সচেষ্ট হবেন।

বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার আব্দুল্লাহ মৃধা বলেন, প্রফেসর ইকবাল হোসেন ভালো মানুষ, তৎকালীন স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তার প্রতি ন্যায় আচরণ করেনি। যদি ধরে নেয়া হয়, তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কটূক্তি করেছেন, তাতেও একজন প্রফেসরের চাকরিচ্যুতির মতো শাস্তি হতে পারে না। তবে আপিলের বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয়েছে। এতে চাকরি পুনর্বহালের বিষয়টি আবারো ঝুলে গেল কি না? এ বিষয়ে তিনি বলেন, মহামান্য হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী তাকে আংশিক দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের জন্য দু’টি ইনক্রিমেন্ট বাতিলের সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আমরা চাই এই আপিলের মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণ অভিযোগমুক্ত হয়ে আসুক। এ ছাড়াও প্রফেসর ইকবাল হোসেনকে বকেয়া বেতন ও পাওনাদিসহ চাকরিতে পুনর্বহালের ক্ষেত্রে একটি অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত আছে, সে বিষয়েও হাইকোর্টের নির্দেশনা লাগবে।