- দুর্বল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ সমীক্ষা এবং জবাবদিহির অভাব-সরকারি টাস্কফোর্স
- ব্যয় বৃদ্ধিতে লাভবান প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সবাই- আবু আহমেদ
- সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি কাঠামোগত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে-সিপিডি
বাংলাদেশে গত দুই দশকে বাস্তবায়িত বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর দিকে তাকালে একটি প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি যেন এখন ব্যতিক্রম নয়; বরং নিয়মে পরিণত হয়েছে। পদ্মা সেতু, পদ্মা রেল সংযোগ, দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন, যমুনা রেলসেতু, মাতারবাড়ী প্রকল্প, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ অধিকাংশ মেগা প্রকল্পই একাধিকবার সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (আরডিপিপি) অনুমোদনের মধ্য দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ পেয়েছে।
বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং সরকারি বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ বড় প্রকল্পের বাস্তবায়ন মেয়াদ এক থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বেড়েছে। একই সাথে কয়েক হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই অতিরিক্ত অর্থের সুবিধাভোগী কারা?
শুরুতেই কম দেখানো হয় প্রকল্পের ব্যয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিস্তারিত নকশা সম্পন্ন হওয়ার আগেই রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। ফলে প্রাথমিক ব্যয় ইচ্ছাকৃতভাবে কম দেখানো হয়। পরে জমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, নতুন অবকাঠামো সংযোজন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং অন্যান্য কারণ দেখিয়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকল্প সংশোধন করা হয়।
সরকারি হোয়াইট পেপার ও টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল পরিকল্পনা, ত্রুটিপূর্ণ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, দুর্নীতি এবং জবাবদিহির অভাবের কারণে অনেক বড় প্রকল্পের ব্যয় গড়ে ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।
ব্যয় বাড়লে লাভবান কারা?
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায় নির্মাণ ঠিকাদার ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। কারণ সময় বাড়ার সাথে সাথে নতুন রেট শিডিউল অনুযায়ী নির্মাণ ব্যয় পুনর্নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে ঠিকাদাররা অতিরিক্ত বিল দাবি করতে পারেন।
এ ছাড়া প্রকল্পে নতুন কাজ যুক্ত হলে নতুন অর্থপ্রবাহ সৃষ্টি হয়। বিদেশী ও দেশীয় পরামর্শকদের চুক্তির মেয়াদও বাড়ে, ফলে অতিরিক্ত পরামর্শক ফি দিতে হয়। পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, যথাযথ তদারকি না থাকলে এই অতিরিক্ত ব্যয় অনিয়ম ও অপচয়ের ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়।
কয়েকটি বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির চিত্র
পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প : ২০০৭ সালে অনুমোদনের সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০ হাজার ১৬১ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে একাধিক সংশোধনের মাধ্যমে ব্যয় বেড়ে প্রায় ৩২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায় পৌঁছায়। অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে প্রায় ১৯৭ শতাংশ।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন : ২০১০ সালে প্রকল্পটির ব্যয় ছিল এক হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে রেললাইন ব্রডগেজে রূপান্তর, জমি অধিগ্রহণ, নতুন স্টেশন ও সেতু নির্মাণসহ বিভিন্ন কারণে ব্যয় বেড়ে ১৮ হাজার কোটি টাকারও বেশি হয়। পরবর্তী সময়ে কিছু অংশ বাদ দেয়ায় ব্যয় কমানো হলেও এটি দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যয়বৃদ্ধির উদাহরণগুলোর একটি।
মেট্রোরেল (এমআরটি-৬) : উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রকল্পটির অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা। পরে কমলাপুর পর্যন্ত সম্প্রসারণ, ভূমি অধিগ্রহণ, নতুন স্টেশন নির্মাণ এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যয় বেড়ে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়।
যমুনা রেলসেতু : ২০১৬ সালে অনুমোদিত এই প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা। কাজ শুরুতে বিলম্ব, আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে ব্যয় বেড়ে ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকায় পৌঁছায়।
মাতারবাড়ী প্রকল্প : গভীর সমুদ্রবন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫১ হাজার ৮৫৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। নতুন অবকাঠামো সংযোজন ও লজিস্টিক ব্যয় বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প : ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে অনুমোদিত ব্যয় ছিল প্রায় ৩৪ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। নকশা পরিবর্তন, ভায়াডাক্টের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি এবং ইউটিলিটি স্থানান্তরের কারণে ব্যয় প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে।
পরিকল্পনা কমিশনের সাবেক কর্মকর্তাদের মত
পরিকল্পনা কমিশন ও আইএমইডির সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রকল্প দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রাথমিক ব্যয় ইচ্ছাকৃতভাবে কম নির্ধারণ করা হয়। পরে সংশোধিত ডিপিপির মাধ্যমে প্রকৃত ব্যয় যুক্ত করা হয়। এতে প্রকল্পের প্রশাসনিক ব্যয়, পরামর্শক ব্যয় এবং নির্মাণ ব্যয় সবই বেড়ে যায়। তাদের মতে, প্রকল্প যত দীর্ঘায়িত হয়, ঠিকাদার ও পরামর্শকদের আর্থিক সুবিধাও তত বাড়ে।
সিপিডির পর্যবেক্ষণ
চলতি অর্থবছরের এডিপি পর্যালোচনায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এখন কাঠামোগত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বাস্তবায়ন বিলম্বিত হলে শুধু উন্নয়নের সুফল পেতেই দেরি হয় না; বরং প্রকল্প ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পায়।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, প্রতিবন্ধকতাগুলো শুরুতেই সমাধান না করলে অর্থ ব্যয়ের অদক্ষতা ও প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ে। সংস্থাটির মতে, সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি (ওভাররান) এখন প্রায় সব বড় প্রকল্পের সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।
জনগণের ওপর বাড়ছে চাপ
অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকল্পের অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ শেষ পর্যন্ত জনগণের করের টাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা। একই সাথে বিদেশী ঋণের বোঝাও বাড়ছে। একটি প্রকল্পে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগের সুযোগ সঙ্কুচিত হয়।
তাদের মতে, স্বাধীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বাধ্যতামূলক করা, প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, সংশোধিত ডিপিপির সংখ্যা সীমিত রাখা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সংসদীয় ও জন-নজরদারি জোরদার না হলে এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।
ব্যয় বৃদ্ধিতে লাভবান প্রকল্পসংশ্লিষ্টরাই -আবু আহমেদ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, প্রকল্পের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি আন্তর্জাতিকভাবে ‘কস্ট ওভাররান’ নামে পরিচিত। যথাযথ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া প্রকল্প গ্রহণ করলে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়াই স্বাভাবিক।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পুরনো ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার কারণেই এসব হচ্ছে। বিশ্বের অনেক দেশে একই ধরনের প্রকল্প কম খরচে সম্পন্ন হয়; কিন্তু বাংলাদেশে উল্টো চিত্র দেখা যায়।’ তার মতে, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধিতে ঠিকাদার, পরামর্শক, তদারকি কর্মকর্তা, প্রকল্প পরিচালক এবং প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ আর্থিকভাবে লাভবান হন। প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে পরামর্শকদের চুক্তির মেয়াদও বাড়ে, ফলে তাদের সম্মানী ও অন্যান্য সুবিধাও বৃদ্ধি পায়।
অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, ‘স্বচ্ছতা ও কার্যকর তদারকির অভাবই ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। স্বাধীন সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকল্প পরিচালকদের জবাবদিহি এবং সংশোধিত ডিপিপির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা না গেলে মেগা প্রকল্পে ব্যয় ও সময় বৃদ্ধির এই প্রবণতা বন্ধ করা সম্ভব হবে না।’



