পথ কিছুটা বদলেছে, কিন্তু গতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাস নিয়ে এমন মূল্যায়ন বিশ্লেষকদের। তারা বলছেন, সরকারের পথচলার প্রথম ছয় মাস তাদের দূরদর্শিতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি রূপরেখা দেয়। এই সময়কালের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার ও জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতিগুলো মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে এবং মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তবতার সাথে তার ব্যবধান কতটুকু, মানুষ যে পরিবর্তনের প্রত্যাশায় ভোট দিয়েছিল, তার কতটা বাস্তবে দৃশ্যমান হয়েছে? এমন জিজ্ঞাসা সবার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসের পথচলা ছিল আংশিক সাফল্য ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের এক মিশ্রণ। আজ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন হবে। সেখানে সরকারের প্রথম ছয় মাসের সফলতা ব্যর্থতার দিকগুলো তুলে ধরা হবে।
সূত্র মতে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের পর দেশ আবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে ফিরে আসে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয় বিএনপি। যদিও এই নির্বাচন নিয়ে অভিযোগ তুলেছিল বিরোধীরা। তাদের মতে, এই নির্বাচনে জামায়াত এনসিপির নেতৃত্বাধীন জোটকে ষড়যন্ত্র করে হারানো হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিএনপি সরকারের প্রায় ছয় মাসকে সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলা যেমন অন্যায়, তেমনি অসাধারণ সাফল্যের গল্প হিসেবে তুলে ধরাও বাস্তবসম্মত নয়। নির্বাচিত সরকারের শাসন ফিরে এসেছে, অর্থনীতিতে কিছু স্থিতির আভাস দেখা যাচ্ছে, রিজার্ভ বেড়েছে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ভাষা সরকারি নীতিতে জায়গা পেয়েছে এগুলো ইতিবাচক। অন্য দিকে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট, কর্মসংস্থান সৃষ্টির ধীরগতি, বিনিয়োগের দুর্বলতা, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা, দলীয় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা এবং গণমাধ্যমের সীমাবদ্ধতা সরকারের অর্জনের ওপর ছায়া ফেলছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে কিছু ক্ষেত্রে স্বস্তি ও আশার আভাস পাওয়া গেছে। আবার মূল্যস্ফীতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কট, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক দুর্বলতা মানুষের প্রত্যাশাকে বারবার হতাশ করেছে। সরকার প্রধান তারেক রহমান দিক পরিবর্তনের বার্তা দিতে পেরেছে কিন্তু সেই পরিবর্তনের সুফল এখনো সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায়নি।
অর্থনীতির কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেছে। বৈদেশিক মুদ্রার নিট রিজার্ভ জুলাই মাসে প্রায় ২৭ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ, রফতানি আয়, বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা রিজার্ভ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে। তবে এই সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব বর্তমান সরকারের একার নয়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী বাজেট দিয়েছে। এতে উন্নয়ন ব্যয়, বিনিয়োগ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়েছে। কিন্তু সরকারের লক্ষ্যের সাথে বাস্তব অর্থনীতির ব্যবধান যথেষ্ট বড়। উচ্চ সুদের হার, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং জ্বালানি সঙ্কট প্রবৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে আছে। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মাছ, গোশত, সবজি, ওষুধ, বাসাভাড়া ও যাতায়াত ব্যয় এখনো সাধারণ পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। অর্থনীতির কাগজে কিছু স্বস্তি এলেও রান্নাঘরে তার প্রতিফলন নেই।
বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে মানুষের অসন্তোষ সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পেয়েছে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে। রাজধানী থেকে জেলা শহর, শিল্পাঞ্চল থেকে গ্রাম ভয়াবহ লোডশেডিং, গ্যাসের নিম্নচাপ এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা জনজীবন ও অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করেছে। দেশের কোনো কোনো এলাকায় দৈনিক বিদ্যুৎ বিভ্রাট ১২ ঘণ্টার বেশি হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য দোকান, বাজার ও বিপণিবিতান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশই বলে দেয় সঙ্কট কতটা গভীর। বাসাবাড়িতে রান্নার গ্যাস নেই, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, ক্ষুদ্র ব্যবসার ব্যয় বাড়ছে এবং শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে বিএনপি ১৮ মাসের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সরকারের প্রায় ছয় মাস পার হলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুস্পষ্ট ও যাচাইযোগ্য রূপরেখা এখনো সাধারণ মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। সরকার বিভিন্ন প্রকল্প, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনার কথা বলছে। কিন্তু কোন খাতে, কত সময়ে, কত মানুষের জন্য এবং কী ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে তার বিস্তারিত হিসাব প্রকাশ করা দরকার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকার আইনশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, দলীয় কোন্দল ও সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এসব সহিংসতা চলছেই। পররাষ্ট্রনীতিতে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্তে বাংলাদেশী নাগরিক হত্যা, বাণিজ্যবৈষম্য, অশুল্ক বাধা এবং অভিন্ন নদীর ন্যায্য হিস্যা এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি।
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বেসরকারি ব্যাংকিং আর্থিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট সহিদুল আলম স্বপন বলেন, ছয় মাসের প্রাথমিক হিসাব সরকারের জন্য একই সাথে আশা ও সতর্কবার্তা। পথ কিছুটা বদলেছে, কিন্তু গতি এখনো প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। জনগণ সরকারকে সময় দিতে প্রস্তুত তবে সেই সময় সীমাহীন নয়।
বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বলছে, সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম বড় ফোকাস ছিল সামাজিক নিরাপত্তা ও জনকল্যাণ। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’। পরীক্ষামূলকভাবে এর আওতায় এসেছে ৭১ হাজারের বেশি পরিবার। সরকারের দাবি, প্রথম ছয় মাসে ২০ হাজারের বেশি কৃষক পরিবার এর আওতায় এসেছে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য নিয়েছে বিএনপি। সরকারের হিসাবে প্রথম ছয় মাসেই ৬২টি জেলায় প্রায় এক হাজার কিলোমিটার খাল খনন সম্পন্ন হয়েছে। পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের প্রতিশ্রুতির মধ্যে প্রথম ১৮০ দিনে আড়াই কোটির বেশি গাছ লাগানোর দাবি করেছে বিএনপি সরকার।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা বলা হলেও প্রথম অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ শতাংশ। ধর্মীয় প্রধানদের পাইলট প্রকল্পে সাড়ে চার হাজার ইমাম, সাড়ে চার হাজার মুয়াজ্জিন, চার হাজার খাদেম ও ৬০০ পুরোহিতসহ প্রায় ১৪ হাজার ব্যক্তি নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন। হজযাত্রা সহজ করতে চালু করা হয়েছে মোবাইল অ্যাপ এবং ঘোষণা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক হজ প্যাকেজ। ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-এর আওতায় সারা দেশে খেলাধুলার আয়োজন করা হয়েছে। নারীদের ক্ষমতায়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর কাজ এগোচ্ছে, যার মাধ্যমে তারা ১০ ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইস্যুতে সরকারের মূল্যায়ন, অস্থিতিশীল নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আইনসম্মত ও দৃঢ় আইন প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধ কমানো এবং জননিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সরকারের নিজস্ব মূল্যায়ন অনুযায়ী প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, জনকল্যাণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানে বেশ কিছু উদ্যোগ নেয়া এবং অর্জনের কথা আছে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নয়া দিগন্তকে বলেন, ছয় মাসে বিএনপি সরকারের বেশির ভাগ নির্বাচনী অঙ্গীকার ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, কোথাও ১০০ শতাংশ, আবার কোথাও ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পরবর্তী ছয় মাসে সরকারের কর্মসূচি আরো জোরালো ও দ্রুতগতিতে বাস্তবায়ন হবে।
১১ দলের অন্যতম শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন বলেন, ভিন্নমতের ওপর চরম নির্যাতন আর গুমের পথ বেছে নেয়নি সরকার। শুধু এতটুকুই ভালো দিক বলা যায়। এর বাইরে ছয় মাসে সরকারের কোনো সফলতা নেই।
সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়ন প্রশ্নে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্যাস-বিদ্যুতের এত সঙ্কট দেখিনি কখনো। শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শ্রমিক বেকার হয়ে পড়ছেন। অথচ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম দাবি ছিল নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। চাঁদাবাজি কয়েকগুণ বেড়েছে। একে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ করে ফেলেছে বিএনপি। তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে জাতির সাথে বেঈমানি ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।



