মৃত্তিকা ও অলিম্পাস : আল মুজাহিদীর কাব্যজগৎ

Printed Edition
মৃত্তিকা ও অলিম্পাস : আল মুজাহিদীর কাব্যজগৎ
মৃত্তিকা ও অলিম্পাস : আল মুজাহিদীর কাব্যজগৎ

গাউসুর রহমান

বাংলা সাহিত্যের আধুনিকতার ইতিহাসে ষাটের দশককে এক সৃজনশীল বিস্ফোরণের কাল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই সময়ে কবিতার ভাষা, বিষয়বস্তু ও প্রকরণে এসেছিল এক আমূল পরিবর্তন, যা পূর্ববর্তী দশকের ঐতিহ্যকে নতুন এক মাত্রায় উন্নীত করেছিল। এই দশকের অন্যতম প্রধান প্রতিনিধি ছিলেন কবি আল মুজাহিদী, যিনি ১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এমন এক সন্ধিক্ষণে তার কাব্যযাত্রা শুরু করেন যখন পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা আন্দোলন, সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নতুন প্রজন্মের লেখকদের মননে গভীরভাবে প্রভাব ফেলছিল। তার প্রারম্ভিক জীবন, শিক্ষা ও তৎকালীন উত্তাল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ছিল এক অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। টাঙ্গাইলের গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এবং পরবর্তীকালে ঢাকামুখী জীবন তার কবিতায় এনেছিল মাটি ও মানুষের এক নিবিড় সংযোগ, যা তাকে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র করে তোলে। এই সময়কালে যখন পূর্ব বাংলার মানুষের স্বকীয়তা ও আত্মপরিচয়ের সঙ্কট প্রকট হচ্ছিল, আল মুজাহিদী তার লেখনীর মাধ্যমে সেই সময়ের আশা, আকাক্সক্ষা ও দ্রোহকে মূর্ত করে তোলেন। তিনি শুধু একজন কবি নন, বরং তার সময়ের সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক জীবন্ত দলিল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন, যার প্রতিটি শব্দে ধ্বনিত হয়েছে মুক্তি ও আত্মমর্যাদার অদম্য স্পৃহা।

আল মুজাহিদীর কাব্যদর্শনকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রাচীন গ্রিক জীবন-দর্শন ও মৃত্তিকা চেতনার এক অদ্ভুত অথচ নিবিড় সমন্বয় তার কবিতার মূল বৈশিষ্ট্য। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘হেমলকের পেয়ালা’র নামকরণের মধ্যেই তিনি এই দর্শনের এক সুগভীর ইঙ্গিত দেন। সক্রেটিসের হেমলক পানের ঘটনার প্রতীকী ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কবি যেন জীবন, মৃত্যু, ত্যাগ ও সত্যের অন্বেষণে এক ধ্রুপদী জিজ্ঞাসার জন্ম দেন। এই নাম কেবল একটি সাহিত্যিক অনুষঙ্গ নয়, বরং কবির জীবন ও জগতের প্রতি এক দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। গ্রিক সাগরের নীলিমা ও অলিম্পাসের উচ্চতার প্রতি তার এক সুপ্ত আকর্ষণ থাকলেও, তার আত্মিক প্রত্যাবর্তন বারবার হয়েছে এই উপমহাদেশের মৃত্তিকায়, বাংলাদেশের উর্বর ভূমিতে। কবি সৈয়দ আলী আহসানের বিশ্লেষণে এ বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, মুজাহিদী নক্ষত্র বা নীহারিকা পুঞ্জকে স্পর্শ করার এক অনন্ত আকাক্সক্ষা প্রকাশ করলেও তিনি অনিবার্যভাবে ফিরে এসেছেন মৃত্তিকার কাছেই। তার এই ‘মৃত্তিকা বোধ’ কেবল শস্য-শ্যামল মাটির প্রতি এক সরল প্রেম নয়, বরং এটি মানুষের অস্তিত্বের গভীরে প্রোথিত শেকড়ের সন্ধান, নিজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও জাতিসত্তার প্রতি এক গভীর আত্মসমর্পণের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত। তার কবিতায় এই মৃত্তিকাই হয়ে ওঠে প্রেম, দ্রোহ, সৌন্দর্য ও জীবনের উৎস। এই মৃত্তিকা থেকেই জন্ম নেয় তার সব সৃষ্টি, সব জিজ্ঞাসা। তিনি লিখেছেন, ‘আমার সকল তৃষ্ণা ভূমিকে ঘিরে, এই মাটির গভীরে, যেখানে আমার শেকড় প্রোথিত অনন্ত অধীরা।’

এই পঙ্ক্তিমালায় কবির মৃত্তিকা লগ্নতা যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনই এক সর্বজনীন আকাক্সক্ষার ইঙ্গিত মেলে, যা কেবল ভৌগোলিক মাটিকে ভেদ করে মানব অস্তিত্বের গভীরে প্রবেশ করে। তার কবিতা যেন মাটি ও আকাশের মধ্যে এক সেতুবন্ধন, যেখানে গ্রিক ধ্রুপদী চেতনার সুদূরপ্রসারী ভাবনা মৃত্তিকার স্নিগ্ধ পরশে এক নতুন সজীবতা লাভ করে।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আল মুজাহিদীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং তার লেখনীতে বিদ্রোহের সুর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। তার কবিতা কেবল সৌন্দর্য ও দর্শনের অন্বেষণ ছিল না, বরং তা ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, স্বাধীনতার জন্য এক তীব্র আকুতি। ১৯৬৮ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় লেখা তার ‘কারাবন্দী’ কবিতাটি তৎকালীন পরাধীন ভূখণ্ডের জন্য এক শৈল্পিক হাহাকার রূপে প্রতিভাত হয়। এ কবিতাটি শুধু কবির ব্যক্তিগত কারাবন্দী জীবনের অভিজ্ঞতা নয়, বরং তা ছিল একটি জাতির সম্মিলিত মুক্তির আকাক্সক্ষার প্রতিচ্ছবি। তার কবিতায় আগুনের চিত্রকল্প বারবার ফিরে এসেছে- কখনো তা দ্রোহের আগুন, কখনো যুদ্ধের দহন, কখনো আবার আত্মপ্রতিষ্ঠার শিখা। এই আগুন প্রতীকী অর্থে অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক, যা বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল। যুদ্ধের ভয়াবহতা, মানুষের আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার জন্য অদম্য সংগ্রাম তার কবিতায় এক জীবন্ত দলিল হিসেবে ধরা পড়ে। তিনি যেন প্রতিটি শব্দে যুদ্ধের বিভীষিকা এবং প্রতিরোধের শক্তিকে ধারণ করেছেন, যেখানে মানুষের স্বাধীনতার আকুতি এক মর্মস্পর্শী আর্তনাদ রূপে প্রকাশিত হয়। তার কবিতায় ফুটে ওঠে সেই সময়ের প্রতিটি বাঙালির হৃদয়স্পন্দন, তাদের মুক্তির স্বপ্ন এবং তাদের অদম্য সাহস। তিনি রচনা করেন, ‘কারাগার শুধু দেয়াল নয়, এও এক স্বাধীনতা, যেখানে আত্মার মুক্তি খোঁজে, অগ্নিময় প্রাণ বারতা।’

এই কবিতার পঙ্ক্তিগুলো কারাবাসকে নিছক একটি সীমাবদ্ধতা না দেখে, তাকে আত্মিক মুক্তির এক নতুন ক্ষেত্র হিসেবে উপস্থাপন করে, যেখানে দ্রোহ ও স্বাধীনতার স্পৃহা আরো তীব্র হয়। আল মুজাহিদী তার কাব্যে কেবল একজন দ্রোহী কবি নন, তিনি একজন দূরদর্শী শিল্পী যিনি তার লেখনীর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিলেন। তার কলম ছিল শাণিত তলোয়ারের মতো, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছে এবং মুক্তির পথ প্রশস্ত করেছে।

আল মুজাহিদীর সাহিত্যিক সত্তার সমান্তরালে তার সাংবাদিক সত্তা গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রভাবশালী ছিল। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার দূরদর্শী নেতৃত্ব এবং সাহিত্যিক বিচক্ষণতা ইত্তেফাকের সাহিত্য পাতাকে তৎকালীন পূর্ব বাংলা এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের সাহিত্য আন্দোলনের এক প্রাণকেন্দ্রে পরিণত করেছিল। গবেষক আহমদ ছফার মতে, আল মুজাহিদী গত তিনটি প্রজন্মের মধ্যে একটি উত্তরাধিকারের সূত্র হিসেবে কাজ করেছেন।

কবি হিসেবে সুখ্যাত হলেও আল মুজাহিদী একাধারে কথাশিল্পী ও অনুবাদক হিসেবেও তার বহুমাত্রিক সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়েছেন। তার কাব্যিক প্রতিভার আড়ালে চাপা পড়ে যায়নি তার গদ্য-প্রতিভা। ‘বাতাবরণ’ ও ‘প্রপঞ্চের পাখি’র মতো গল্পগ্রন্থগুলো তার গভীর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা এবং জীবনবোধের পরিচয় বহন করে। এসব গল্পে তিনি গ্রামীণ জীবন, শহুরে জটিলতা এবং মানুষের মনস্তত্ত্বের এক নিপুণ চিত্র তুলে ধরেছেন। তার গল্পগুলো কেবল ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং তাতে ছিল দার্শনিক জিজ্ঞাসা ও সামাজিক সমালোচনার সূক্ষ্ম বুনন। একইভাবে ‘চাঁদ ও চিরকুট’-এর মতো উপন্যাস তার বৈচিত্র্যময় সৃজনী শক্তির প্রকৃষ্ট প্রমাণ। তার উপন্যাসে তিনি কাহিনীর আবরণে মানব মনের গভীরে প্রবেশ করেছেন, সম্পর্কের জটিলতা ও জীবনের রহস্য উন্মোচন করেছেন। এসব গদ্যরচনাতে তার কাব্যিক ছোঁয়াও সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়, যা তার ভাষাকে এক বিশেষ লালিত্য প্রদান করেছে। এ ছাড়া তার অনুবাদ কর্মগুলো বাংলা সাহিত্যের দিগন্তকে প্রসারিত করেছে। তিনি হাইনরীশ হাইনে বা কাইফ আজমীর মতো বিশ্ববরেণ্য কবিদের অনূদিত করে বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে আন্তর্জাতিক সাহিত্যের স্বাদ এনে দিয়েছেন। এসব অনুবাদ কেবল ভাষান্তর ছিল না, বরং তাতে ছিল মূল কবিতার প্রাণ ও আত্মার প্রতিচ্ছবি। তিনি বিশ্ব সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রতœগুলোকে বাংলায় এনে যেমন বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনই বাংলা পাঠকদের আন্তর্জাতিক সাহিত্যের প্রতি কৌতূহল বাড়িয়েছেন। তার এই বহুমাত্রিক সৃজনশীলতা প্রমাণ করে যে তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ শিল্পী ছিলেন, যিনি সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় অনায়াসে বিচরণ করেছেন এবং নিজের মেধা ও মননের স্বাক্ষর রেখেছেন।

আল মুজাহিদী আধুনিক বাংলা কবিতায় এক অবিস্মরণীয় স্থান দখল করে আছেন, তিনি কেবল একজন কবি নন, বরং একজন বিশ্বজনীন মানবতাবাদী হিসেবে তার পরিচয় সুপ্রতিষ্ঠিত। তার কাব্যে যেমন গ্রিক ধ্রুপদী চেতনার সুদূরপ্রসারী ভাবনা রয়েছে, তেমনি মৃত্তিকা লগ্নতার গভীর অনুরাগও লক্ষণীয়। তিনি এক দিকে যেমন পারমাণবিক ধ্বংসলীলার বিরুদ্ধে ‘কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি’র মতো কালজয়ী কবিতা লিখে মানবজাতির প্রতি তার সংবেদনশীলতা প্রকাশ করেছেন, তেমনি আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সত্যের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছেন তার লেখনীতে। তার এই মানবতাবাদী দৃষ্টিকোণ তাকে নিছক একজন ভূখণ্ডকেন্দ্রিক কবি থেকে এক বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের শিল্পী হিসেবে তুলে ধরেছে। তার কবিতায় মানুষ, প্রকৃতি, প্রেম, দ্রোহ, স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অনুষঙ্গের এক সুনিপুণ বুনন রয়েছে, যা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। তার শতাধিক গ্রন্থ এবং তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে তার দীর্ঘ ও সফল সম্পাদকীয় জীবন তাকে বাংলা সাহিত্যের এক অবিনশ্বর নক্ষত্রে পরিণত করেছে। তিনি কেবল সাহিত্য সৃষ্টি করেননি, বরং সাহিত্যচর্চার একটি নতুন পথ তৈরি করেছেন, অসংখ্য তরুণ লেখককে অনুপ্রাণিত করেছেন এবং বাংলা সাহিত্যকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করেছেন। তার কর্ম ও জীবন এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও সৃজনশীলতার প্রতীক। তিনি লিখেছেন, ‘মানুষেরা চলে যায়, কেবল সত্য থাকে, সৃষ্টির আলোকের নিচে, ধ্বংসের আঁধারে, ইতিহাসে বাঁকে।’

এসব পঙ্ক্তি তার চিরন্তন দর্শনের এক সারসংক্ষেপ, যা মানব অস্তিত্বের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং সত্যের চিরন্তনতাকে তুলে ধরে। আল মুজাহিদী তার সমগ্র জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন, সাহিত্য কেবল সময়ের আয়না নয়, বরং তা সময়কে অতিক্রম করে যাওয়ার এক অনবদ্য শক্তি। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে তার স্বকীয়তা ও গভীরতার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।