গুমসংক্রান্ত কমিশনের কর্মশালা

প্রজাতন্ত্র হবে গণতান্ত্রিক যেখানে মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে : -বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারি-এর সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ন্যায়বিচারের সর্বোত্তম নিশ্চয়তা নির্ভর করে বিচারকদের ব্যক্তিত্ব, দক্ষতা, সক্ষমতা, নিরপেক্ষতা এবং সাহসিকতার উপর। প্রজাতন্ত্র হবে এমন এক গণতন্ত্র যেখানে সব মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে।

গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানের হোটেল আমারিতে অনুষ্ঠিত ‘ঊহংঁৎরহম ঔঁংঃরপব: ঞযব জড়ষব ড়ভ ঃযব ঔঁফরপরধৎু রহ অফফৎবংংরহম ঊহভড়ৎপবফ উরংধঢ়ঢ়বধৎধহপবং’ শীর্ষক চতুর্থ কর্মশালার উদ্বোধনী পর্বে এসব কথা বলেন। দিনব্যাপী কর্মশালাটি গুম সংক্রান্ত কমিশন অফ ইনকোয়ারি-এর উদ্যোগে এবং ঢাকাস্থ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।

মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, একজন বিচারককে প্রতিটি মামলা সমান উদ্যম, কঠোরতা এবং নিষ্ঠার সাথে বিচার করতে হবে। প্রতিদিন সকালে যখন বিচারকরা তাদের পোশাক পরিধান করবেন তখন তাদের সংবিধানের কথাগুলো স্মরণ করা উচিত। তিনি বলেন, প্রজাতন্ত্র হবে এমন এক গণতান্ত্রিক যেখানে সব মৌলিক মানবাধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। বিচারকদের উদ্দেশে সভাপতি আরো বলেন, আসুন আমরা এমন একটি বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলি যেখানে ঢাকার একজন ফেরিওয়ালা বা খুলনার একজন পোশাক শ্রমিক বা সিলেটের একজন রিকশাচালকও বলতে পারেন আমরা আদালতের প্রতি আস্থা রাখি, আমরা বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখি।

ঢাকাস্থ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের চিফ অফ মিশন হুমা খান বলেন, বিচারকদের নিরপেক্ষতা, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্বশীলতা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। গুমের ভিক্টিমদের করুণ পরিণতি এবং তাদের পরিবারের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা সমাজকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে। তিনি বলেন, আমি যেসব ভিক্টিম পরিবারের সাথে কথা বলেছি, তাদের অধিকাংশই সামাজিক চাপ ও মানসিক কষ্টে ভুগছে। মামলা পরিচালনায় ভয়ভীতি, তদন্ত জটিলতা এবং প্রভাবশালী মহলের চাপ ন্যায়বিচারের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করেছে। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে কাজ পরিচালনার জন্য কমিশনের সার্বিক কার্যক্রমের প্রশংসা করে তিনি কমিশনের সভাপতি ও সদস্যসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।

কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো: ফরিদ আহমেদ শিবলী বলেন, গুম সংক্রান্ত মামলাগুলোর কার্যকর তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এখন সময়ের দাবি। তিনি জানান, কমিশন ইতোমধ্যে বিদ্যমান আইনি কাঠামো পর্যালোচনা করে গুম সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, সাক্ষী সুরক্ষা ও ভুক্তভোগী পরিবারের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের প্রস্তাব প্রস্তুত করছে।

কর্মশালায় কমিশনের সদস্য মো: নূর খান বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে ভিক্টিমদের অধিকার নিশ্চিতকরণ ও ভিক্টমদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে সেশন পরিচালনা করেন। এ ছাড়া বক্তব্য রাখেন আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা। ওয়ার্কিং সেশন পরিচালনা করেন কমিশনের সদস্য মো: সাজ্জাদ হোসেন।

আলোচনায় গুম প্রতিরোধে শক্তিশালী আইন প্রণয়ন,বিচার বিভাগের আওতায় স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা, গুম সংক্রান্ত মামলার জটিলতা নিরসনে মনিটরিং সেল গঠন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, বিচারকদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ আয়োজন, ভিক্টিমদের সাইকোলজিক্যাল ও লিগ্যাল সহযোগিতা নিশ্চিতকরণ, ভিক্টিমদের আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, সন্ত্রাসবিরোধী আইনসহ অস্ত্র ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধন, অনলাইন জিডি সহজীকরণ, চিহ্নিত মামলাসমূহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পন্ন করা, বিচারক ও ম্যাজিস্ট্রেটদের কাছে ভিক্টিমদের সহজে পৌঁছানোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ম্যাজিস্ট্রেটদের মিথ্যা মামলা নিরসন সংক্রান্ত ক্ষমতা প্রদান এবং বিচার বিভাগ ও কমিশনের মধ্যে তথ্য বিনিময়ের কাঠামো উন্নয়ন-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ উঠে আসে।

কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রিস। দেশের বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে কর্মরত বিচারকসহ প্রায় ৯০ জন প্রশিক্ষণার্থী অংশগ্রহণ করেন। কমিশন কর্তৃক আয়োজিত চারটি কর্মশালার এটি ছিল শেষ পর্ব।