শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ অনুসন্ধানে মাউশি ও বোর্ড

এসএসসির পর কলেজে ভর্তি হলেও পরীক্ষা দেয় না ৩৬ শতাংশ

শাহেদ মতিউর রহমান
Printed Edition

এসএসসির পর শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে পড়ছে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী। সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে রেজিষ্ট্রেশন করার পরেও পরীক্ষায় অংশ নেয় না ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে শিক্ষামন্ত্রণালয়ে ব্যাপক অনুসন্ধানও শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, দেশের বিভিন্ন জেলা উপজেলায় দৈব চয়নের মাধ্যমে ২৬০টি প্রতিষ্ঠানে এ বিষয়ে অনুসন্ধান চালানো হবে। সেখানে গিয়ে শিক্ষক শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সাথেও আলাপ আলোচনা করে শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ অনুসন্ধান করা হবে। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর প্রধানদের সাথে অনলাইনে সভা করেছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। খুব শিগগিরই মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের নেতৃত্বে এই অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু হবে।

সূত্র জানায়, এসএসসির পাসের পর অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে রেজিষ্ট্রেশন করলেও পরবর্তী সময়ে তারা আর ফরম ফিলাপ কিংবা পরীক্ষায়ও অংশ নেন না। এরই প্রেক্ষিতে শিক্ষাবোর্ডগুলোর মাধ্যমে পাবলিক পরীক্ষা থেকে বিপুল শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার কারণ অনুসন্ধানের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নির্দেশে গত রোববার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. কে এম এ এম সোহেলের সভাপতিত্বে সব শিক্ষাবোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সাথে সরাসরি ও জুমে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত হয়। এ বিষয়ে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. কে এম এ এম সোহেলের সভাপতিত্বে গত রোববার অধিদফতরে সব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকদের সাথে আলোচনা হয়েছে। ৯টি সাধারণসহ মোট ১১টি শিক্ষাবোর্ডের শহর ও গ্রামাঞ্চল মিলিয়ে দৈব চয়নের ভিত্তিতে সারা দেশের মোট ২৬০টি প্রতিষ্ঠান এই গবেষণার আওতাভুক্ত হবে। আগামী সপ্তাহে এই গবেষণা শুরু হতে পারে।

মাউশির ডিজি এ প্রসঙ্গে বলেন, ঝরে পড়া পরীক্ষার্থী, তাদের অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান প্রধানদের সাথে সরাসরি কথা বলা হবে। শিক্ষাবোর্ড কর্মকর্তা এবং জেলা ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসারও গবেষণায় অংশ নেবেন। সার্বিক তত্ত্বাবধানে থাকবে বাংলাদেশ পরীক্ষা উন্নয়ন ইউনিট (বেডু)।

অন্য দিকে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, ঝরে পড়ার বিষয়ে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও প্রথমবারের মতো শিক্ষাবোর্ডগুলোর উদ্যোগে এইচএসসি ও সমমানের বিপুল পরীক্ষার্থীর অংশ না নেয়া বা ঝরে পড়ার প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই শুরু হওয়া এবারের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট পরীক্ষায় (এইচএসসি ও সমমান) নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩৬ শতাংশই অংশ নিচ্ছেন না। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষায় অনেক শিক্ষার্থী নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেন না। তবে এ বছর পরীক্ষায় অংশ না নেয়ার এই হার অস্বাভাবিক বেশি বলে মনে করছেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দুই বছর আগে (২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ) এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাস করে একাদশ শ্রেণীতে নিবন্ধন করেছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে এবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করেছেন প্রায় সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ নিয়মিত শিক্ষার্থীদের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে হারটি প্রায় ৭ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে। গত বছর নিবন্ধিত সোয়া চার লাখের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষা দেননি।

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চিত্র আরো উদ্বেগজনক। এ বছর এই বোর্ডে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ শতাংশের বেশি পরীক্ষার জন্য ফরমই পূরণ করেননি। চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষাতেও দেখা গেছে, দুই বছর আগে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধন করেও তাদের মধ্যে ২৩ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। ইদানীং পাবলিক পরীক্ষায় ফরম পূরণ করার পরও পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থী বাড়ছে। যেমন গত বছরের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার প্রথম দিনে মোট ১৯ হাজার ৭৫৯ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিলেন। এর আগের বছর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ১৫ হাজার ২০৩ পরীক্ষার্থী।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ পেরিয়ে উপরের শ্রেণীতে ওঠার সাথে সাথে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। বাল্যবিবাহ, দারিদ্র্য এবং এসএসসি পাসের পর অনেক শিক্ষার্থীর কর্মক্ষেত্রে যুক্ত হওয়া এ প্রবণতার উল্লেখযোগ্য কারণ। সম্প্রতি সচিবালয়ে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, এই দুর্বলতাগুলো বের করা হচ্ছে এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী দিনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তার আশা, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঘটবে না।