ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) প্রাণকেন্দ্র টিএসসি। বরাবরের মতো শিক্ষার্থীদের আড্ডা, গান আর নিরাপদ বিচরণের মুক্ত প্রাঙ্গণ। তবে সেই মুক্ত প্রাঙ্গণে যানজট , বহিরাগত, ভবঘুরেদের ও ছিন্নমূল মানুষের আনাগোনা খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর টিএসসি এবং এর আশপাশের এলাকাগুলো যেন রূপ নেয় এক ভিন্ন জগতে। মেট্রোরেল স্টেশনের সুবিশাল কাঠামোর নিচে সৃষ্ট স্থায়ী যানজট, অপর্যাপ্ত আলোর পাশাপাশি বহিরাগত, ভবঘুরে, হকারদের অবাধ বিচরণের কারণে নিজ ক্যাম্পাসেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন শিক্ষার্থীরা। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষার্থীরা।
আতঙ্কের ১.৩ কিলোমিটার পথ
টিএসসির ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে শুরু করে কবি সুফিয়া কামাল হল পর্যন্ত বিস্তৃত প্রায় ১.৩ কিলোমিটারের, এই পথটি এখন ছাত্রীদের কাছে রীতিমতো নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রমনা কালী মন্দির রোড, শহীদ শফিকুর রহমান রোড এবং কলেজ রোড- এই তিনটি রাস্তার সমন্বয়ে গঠিত এই রুটে স্বাভাবিক সময়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে মাত্র ১৫ মিনিট, আর রিকশায় ৬-৭ মিনিট। কিন্তু বাস্তব চিত্র এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন। টিএসসি মেট্রো স্টেশনের নির্মাণকাঠামো, রাস্তার ওপর যত্রতত্র অবৈধ পার্কিংয়ের কারণে এখানে সারাক্ষণই লেগে থাকে তীব্র যানজট। দিনের বেলায় মেট্রো স্টেশনের বিশাল কাঠামোর কারণে এলাকাটি ছায়াচ্ছন্ন থাকে, আর সন্ধ্যার পর নষ্ট ল্যাম্পপোস্টের কারণে তা ডুবে যায় ঘুটঘুটে অন্ধকারে।
যানজটের কারণে রিকশা বা বাসে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা বাধ্য হন এই অরক্ষিত অন্ধকার পথে দীর্ঘক্ষণ আটকে থাকতে। আর এই সুযোগটিই নিচ্ছে সেখানে ঘাঁটি গড়া মাদকাসক্ত, ভবঘুরে ও ছিনতাইকারীরা। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যানজটে গাড়ি থেমে থাকলেই অন্ধকার থেকে মাদকসেবীরা তাদের খুব কাছাকাছি চলে আসে। টিএসসি মেট্রো স্টেশনের আন্ডারপাস, রমনা কালী মন্দিরের গেট, তিন নেতার মাজার সংলগ্ন এলাকা এবং ঢাকা গেট এলাকাটি রীতিমতো মাদক ব্যবসা ও অসামাজিক কার্যকলাপের অলিখিত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সরেজমিন দেখা যায়, ফুটপাথ এবং রোড ডিভাইডারগুলো দখল করে রেখেছে ভাসমান মানুষরা। অনেকেই সেখানে রীতিমতো মশারি টানিয়ে সংসার পেতেছে। রিকশা ও ভ্যান চালকরা এলোমেলোভাবে তাদের গাড়ি রেখে তার ওপর ঘুমাচ্ছে। রাস্তায় যত্রতত্র ছড়িয়ে আছে গাঁজার উচ্ছিষ্ট, ফেনসিডিলের বোতল এবং প্লাস্টিকের চায়ের কাপ। বাতাসে ভাসে মাদক আর মলমূত্রের উৎকট গন্ধ। দোয়েল চত্বরের হস্তশিল্প বাজারের পাশে গড়ে ওঠা একটি অবৈধ মাজার রাতের বেলা গাঁজা বিক্রির একটি নিরাপদ স্পট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
যা বলছেন শিক্ষার্থীরা : কবি সুফিয়া কামাল হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) সানজানা চৌধুরী রাত্রি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘মাদকাসক্ত এবং ভবঘুরেদের কারণে সুফিয়া কামাল হলের ছাত্রীরা এই রুটটি ব্যবহার করতে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়। সন্ধ্যার পর রাস্তাটি এত বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়ে যে, আমরা আতঙ্কে থাকি কখন কী ঘটে যায়! যানজট পরিস্থিতিকে আরো ভয়াবহ করে তোলে। যখন গাড়িগুলো একটার সাথে আরেকটা লেগে থাকে, তখন চাইলেও দ্রুত হেঁটে পার হওয়ার উপায় থাকে না। বিপদের সামনে রীতিমতো অসহায় হয়ে বসে থাকতে হয়।’
হল প্রশাসন ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বারবার জানানোর পরও কোনো ফল আসেনি বলে আক্ষেপ করেন তিনি। হলের ছাত্রীদের জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র একটি বাস বরাদ্দ, আর ক্যাম্পাসের বৈদ্যুতিক শাটল গাড়িটি যায় কেবল শহীদুল্লাহ হলের পুকুরপাড় পর্যন্ত। ফলে বাকি অন্ধকার পথটুকু ছাত্রীদের হেঁটেই পাড়ি দিতে হয় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।
নিরাপত্তাহীনতার এই চিত্র শুধু টিএসসিতেই সীমাবদ্ধ নয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী নাবিলা ঐশী খোদ ভিসির বাসভবনের কাছে এক ভীতিকর পরিস্থিতির শিকার হন। অন্ধকারে এক অজ্ঞাত ব্যক্তি একটি খাম হাতে তার দিকে তেড়ে এলে তিনি আতঙ্কিত হয়ে দৌড়ে পালান।
কী বলছেন ছাত্রনেতারা?
ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘বাজারের মতো বিশৃঙ্খল’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আগে আমরা এসব এলাকায় বহিরাগতদের প্রবেশ ঠেকাতে সক্রিয় ছিলাম। কিন্তু গত বইমেলার পর থেকে সেই নিয়ন্ত্রণ আর নেই। এখন যে তীব্র যানজট, তাতে শুধু ছাত্রীরা নয়, যেকোনো শিক্ষার্থী বা সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হতে পারে। এই শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব এখন পুরোপুরি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের।’
প্রশাসনের চরম অবহেলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের। তিনি বলেন, ‘একজন ছাত্রী তার নিজের ক্যাম্পাসে নিরাপদে হাঁটতে পারবে না, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে? এই রুটটি এখন অপরাধীদের অভয়ারণ্য। প্রশাসন নিশ্চুপ, আর যানজট সেই বিপদকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।’
প্রশাসনের উদাসীনতা ও দায়সারা বক্তব্য
শিক্ষার্থীদের এত অভিযোগের পরও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা একেবারেই দায়সারা। ছাত্রী নাবিলা ঐশীর ঘটনার বিষয়ে আইসিটি সেলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোসাদ্দেক হোসেন কামাল উল্টো সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, ‘ওই নির্দিষ্ট সময়ে সিসিটিভিতে আমরা এমন কিছু দেখতে পাইনি। হয়তো সময়ের হিসাবে ভুল আছে, আমরা আবার যাচাই করে দেখব।’
অন্য দিকে, শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জানিয়েছেন, ‘টিএসসি মেট্রো স্টেশনে শিগগিরই কয়েকজন ট্রাফিক পুলিশ মোতায়েন করা হবে।’
তবে শিক্ষার্থীরা মনে করেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ট্রাফিক পুলিশ শুধু গাড়ির জট সামলাবে; কিন্তু অন্ধকার রাস্তায় মাদকসেবীদের উৎপাত, নষ্ট বাতি এবং সিসিটিভি ক্যামেরার অভাব- এসব সমস্যার সমাধান ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে হবে না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশাল ক্যাম্পাসের তুলনায় প্রক্টরিয়াল বডির জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট একেবারেই অপ্রতুল। মাত্র একটি গাড়ি দিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে নামমাত্র টহল দেয়া হয়। উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সায়মা হক বিদিশা, প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ বা রেজিস্ট্রার মুন্সী শামসউদ্দীন আহমদের দফতর থেকে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়ার মতো কোনো ‘কুইক রেসপন্স টিম’ ক্যাম্পাসে নেই। কোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটলে প্রশাসন নিজে থেকে তৎপর হওয়ার বদলে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে।
শিক্ষার্থীদের দাবি : এই ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের নিকট শিক্ষার্থীরা একগুচ্ছ জরুরি দাবি তুলে ধরেছেন: টিএসসি থেকে সুফিয়া কামাল হল পর্যন্ত পুরো রুটে পর্যাপ্ত ও উজ্জ্বল সড়কবাতি স্থাপন। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ মোড়ে সচল সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো। দোয়েল চত্বরের অবৈধ মাজারসহ ফুটপাথ দখল করে থাকা ভাসমান স্থাপনা অবিলম্বে উচ্ছেদ। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিয়মিত পুলিশ ও প্রক্টরিয়াল টিমের জোরালো টহল। ক্যাম্পাসের ভেতরে বহিরাগত যান চলাচল ও অবৈধ পার্কিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ।



