- বিধির কারণে ৬ হাজার মেরিন শিক্ষার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত
- ২০১১ সাল থেকেই ল্যাবের যন্ত্রপাতি কেনা হয়নি
- শিক্ষক প্রশিক্ষণের বাজেট নেই, রয়েছে কর্মকর্তাদের দ্বন্দ্বও
সরকার জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর ওপর জোর দিলেও বাস্তবে দেশের প্রতিটি জেলায় থাকা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, বিআইএমটি ও আইএমটিতে দক্ষ আধুনিক যন্ত্রপাতির মারাত্মক অভাব রয়েছে। শুধু যে যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে তাই নয়, এসব কেন্দ্রে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার প্রয়োজনীয় বাজেট ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব রয়েছে। অধিকাংশ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নানা সমস্যায় জর্জরিত হওয়ার কারণে অধিক সংখ্যক দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে না। যার দরুন বিদেশে দক্ষ জনশক্তির বাজারে প্রবেশ করতে বাংলাদেশকে বেগ পেতে হচ্ছে। এমনটি মনে করছেন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট ও অভিবাসন বিশ্লেষকরা।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর কর্মকর্তারা বলছেন, ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে যেসব সমস্যা দীর্ঘদিন থেকে বিরাজমান সেগুলোর সমাধান করা গেলে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী বিদেশে বিগত দিনের চেয়েও বেশি দক্ষ জনশক্তি তৈরি করে পাঠানো সম্ভব।
প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, একাধিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নয়া দিগন্তকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, সারা দেশে মোট ১১০টি বিআইএমটি, আইএমটি ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিসিসি) রয়েছে। এসব কেন্দ্রে এখনো ৫০.৬১% জনবল শূন্য আছে। একই সাথে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেয়ারও কোনো বাজেট নাই।
খোঁজ নিয়ে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, ২০১১ সালের পর থেকে টিটিসি ও আইএমটিতে ল্যাবের কোনো যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়নি। দুই সপ্তাহ আগে জাপানিজ, কোরিয়ান, ইংরেজি, আরবি ও জার্মান ভাষা প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মোট ৫২ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদেরকে ঘণ্টায় ৮০০ টাকা হারে খণ্ডকালীন অতিথি ভাষা প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
এসব প্রতিষ্ঠানে ৫০ শতাংশেরও বেশি জনবল না থাকার কারণ কী- তা জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একাধিক কর্মকর্তা নাম না বলার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, সুপ্রিম কোর্টে এ নিয়ে একটি রিভিউ মামলা আছে। ১৯৯৬ সাল থেকে নিয়োগবিধি নিয়ে মামলা চলমান জানিয়ে তারা বলেন, যা বর্তমানে সিভিল রিভিউ পিটিশন আকারে সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন। টিটিসিগুলোর সমস্যার বিষয়ে তারা আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের এখানে ৫০% টিচারই (শিক্ষক) নেই। পরিচালন ব্যয় খুব কম, যার কারণে কাক্সিক্ষত মাত্রায় শিক্ষক প্রশিক্ষণ দেয়া যায় না। বিএমইটির ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট কোন দেশে কেমন কী? এ নিয়ে আমাদের বিএমইটির কোনো রিসার্চ কোড নেই। বিএমইটি কোনো ধরনের প্রজেক্ট নেবে তার ফিজিবিলিটি স্টাডি করার জন্য কোনো অর্থনীতি কোড নেই। ফলে আমাদের আবার মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করতে হয়। সমস্যার কথা জানিয়ে তারা বলেন, বিএমইটির একটা সফটওয়্যার আছে। নাম রেইমস। প্রশ্ন হলো ডাটা মেনেজমেন্ট, এ কোডটা আমাদের নেই। তারা বলেন, বিএমইটির যে ১০৪টি টিটিসি ও ছয়টি আইএমটিসহ মোট ১১০টি প্রতিষ্ঠান আছে। গত ১৫ বছরেই এখানে নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়নি। পুরনো যন্ত্রপাতি মেরামত করা হয়নি। উন্নত দেশে জনশক্তি প্রেরণ করার জন্য যে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় করা দরকার সেটাও করা হয়নি।
এক প্রশ্নের উত্তরে তারা বলেন, ১৯৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি। সেখানে মেকানিক্যালের ব্যতিক্রমী যন্ত্রপাতি আছে। মেরামতের অভাবে সেগুলো পড়ে আছে। ১৯৫৮ থেকে ২০০৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত শিপ বিল্ডিং এবং মেরিন টেকনোলজিতে চার বছরের ডিপ্লোমা কোর্স করাতো। তাদের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে কন্টিউনিয়াস ডিসচার্জ সার্টিফিকেট (সিডিসি) দেয়া হতো; কিন্তু ২০০৯ সালে এক পত্রের মাধ্যমে নৌপরিবহন অধিদফতর স্থগিত করা হয় এবং ২০১১ সালে সরকার নতুন বিধিমালা প্রণয়ন করে। সেখানে ফিলিপিন, শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীন প্রভৃতি দেশে সিডিসি-সংক্রান্ত রুল আছে। তার চেয়ে অতিরঞ্জিত মাত্রায় (বাড়তি) শর্ত আরোপ করা হয়। যার কারণে আমাদের ইনস্টিটিউট অব মেরিন টেকনোলজি থেকে পাস করা প্রায় পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার শিক্ষার্থী জাহাজে চাকরিতে সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শুধু বিধির কারণে।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, একটি বিশেষ মহল আন্তর্জাতিক আইন এবং যেসব দেশ সমুদ্রপথে বেশি কর্মী প্রেরণ করে, তাদের থেকে অধিক মাত্রায় শর্ত আরোপ করার কারণেই আমাদের দেশের ছেলেরা জাহাজের চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য ২০১১ সালের সিডিসি-সংক্রান্ত বিধিমালাটি সংশোধন করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দাবি উঠেছে। উল্লেখ্য, শিক্ষার্থীরা সিডিসি থেকে বঞ্চিত হয়ে হাইকোর্ট ডিভিশনে এ-সংক্রান্তে তিনটি মামলা দায়ের করেন; যা বিচারাধীন রয়েছে বলে ভুক্তভোগী সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে ওই কর্মকর্তা জানান, ১৯৪২ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত স্থাপিত ১১টি টিটিসি নির্মাণ এবং সংস্কারের অভাবে এখনো জরাজীর্ণ পরিবশে বিরাজ করছে। এসব টিটিসি রি-মডেলিং এবং ডি কনস্ট্রাকশন করা প্রয়োজন। তা ছাড়া ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মোট ২৯টি টিটিসি সংস্কার ও মেরামত করাই হয়নি। এসব মেরামত ও সংস্কার করা দরকার। অপর দিকে ঢাকার বাইরে কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, রংপুর, লালমনিরহাট, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন টিটিসির অভ্যন্তরে কর্মকর্তাদের মধ্যে চেয়ার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। তাদের একে অপরের মধ্যে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যন্ত গড়িয়ে সেটি দুদক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গতকাল শুক্রবার রাত ৮টায় টিটিসিগুলোর বিভিন্ন সমস্যার বিষয়ে জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সদ্য যোগ দেয়া মহাপরিচালক মো: আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাকে পাওয়া যায়নি। তবে ডিজি মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবের দিকনির্দেশনায় তার দফতরে শৃঙ্খলা ফেরাতে কাজ করে যাচ্ছেন বলে রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকরা জানিয়েছেন।



