বৃক্ষ কবি আর কবিতা

Printed Edition
অলঙ্করণ : জাহিদ হাসান বেনু
অলঙ্করণ : জাহিদ হাসান বেনু

দিল আফরোজ রিমা

সবুজে সবুজে হয় কবিতার সৃষ্টি/অঝোরে ঝরে যায় সুধাময় বৃষ্টি/বেঁচে থাকে মন/ বেঁচে যায় জীবন। কবির কাছে সবুজ গাছপালা, বন-বনানী সব প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে। কেবল অকারণ আনন্দে মন উদাস হয়। গাছ সমস্ত কর্ম চাঞ্চল্যের অবসান ঘটিয়ে, জগৎ সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন করে কবিকে নতুন করে কবিতা লিখতে উদ্বুদ্ধ করে। উপলব্ধি করায় তার কাব্যিক সত্তাকে।

আমাদের অস্তিত্বে অনুভবে মিশে আছে গাছ। সে পবিত্র পরিবেশ সৃষ্টি করে শুভ্রতার চাদর গায়ে দিয়ে সজাগ জীবনবোধে হৃদয়ের গভীরে নাড়া দিয়ে যায়।

গাছ আমাদের বন্ধু, সে সবুজের সজীবতা এনে দেয়। এনে দেয় ফুলের রাজ্য, ডেকে আনে পিক পাপিয়া। সুধামাখা বাতাস। ফুলের সুবাসে মাতোয়ারা হয় মেঠোপথ।

নারকেল বাগান, জারুলের বন কবির কবিতার ছন্দ হতে চায়।

বিশাল বিপুল পৃথিবীর সর্বত্রই প্রাণ সঞ্চার করে সবুজ বৃক্ষ।

সবুজ পাতারা কখনো বাতাসে দোলে কখনো নিশ্চুপ নিমঘœ থাকে। কখনো সূর্যালোকে চিকচিক করে, কখনো বৃষ্টিস্নাত হয়। আহা কি মধুর মনোরম সে দৃশ্যপট।

গাছ জীবনের মহার্ঘ্য সম্পদ। গাছ প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে। সম্প্রীতিকে মূর্ত করে এবং বিশ্বে আমাদের নিজস্ব স্থানের কথা মনে করিয়ে দেয়।

প্রকৃতির এই নিসর্গ না থাকলে সৃষ্টি হবে না কবিতা, মরে যাবে কবি। গাছে গাছে আর জাগবে না আনন্দ উল্লাস, গাছই যদি না থাকে। পাখির কণ্ঠে কণ্ঠে নতুন দিনের সুর আর থাকবে না।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি এই বাংলাদেশ। অপরূপা এদেশের সবুজ বন-বনানী, সুবিশাল ম্যানগ্রোভ বনরাজি, শ্যামল পাহাড় যুগ যুগ ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ভ্রমণপিপাসু উৎসাহী মানুষকে আকৃষ্ট করে আসছে। তাই রূপমুগ্ধ কবি তার আবেগ স্নিগ্ধ উচ্চারণে বাংলাকে বলেছেন রূপসী বাংলা। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের দেশটি যেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মিউজিয়াম। সবুজ শ্যামল প্রকৃতির জন্যই এ দেশের প্রশংসা যুগ যুগ ধরে কবির কলমে অঙ্কিত হয়েছে।

গাছপালার জন্যই আমাদের বাংলাদেশ ষড়ঋতুর দেশ।

গ্রীষ্মে প্রচণ্ড রোদ, ছাতিমের স্নিগ্ধ ছায়া, নদীর নীলাভ গহ্বর থেকে জেগে উঠে বালুচর।

গ্রীষ্মকালের শেষার্ধ্বে সন্ধ্যা সমাগত সময়ে ধেয়ে আসে কালবৈশাখী ঝড়। এ সময় বাংলার আগল ভরে বিভিন্ন মৌসুমি ফলে।

বর্ষা আসে থৈ থৈ জল, অবিরাম বৃষ্টি মেয়ের কান্না, আর কদম, কামিনী, কেয়ার স্নিগ্ধ হাসি নিয়ে।

রিমঝিম গান গেয়ে বৃষ্টি নামের মিষ্টি মেয়েটি সুরে সুরে ভরিয়ে তোলে প্রকৃতি। আবার ঝুমঝুম নূপুর বাজিয়ে মুগ্ধ করে দেয় আমাদের মন।

খাল-বিল-পুকুর-নদী-ডোবা পানিতে থইথই করে। সবুজ সজীবতায় গাছপালা, বন-বনানী প্রাণ ফিরে পায়।

শরত আসে সাদা মেঘের ভেলা ভাসিয়ে, কাশফুল দোলানো শান্ত বাতাসে, নীল আকাশে উরে যাওয়া বলাকার ঝাকে, দূর্বাঘাসের ওপর সঞ্চিত শিশির বিন্দুর সাথে, সকালে শিশিরভেজা ধানে, শিউলি ফুলে, কোমল রোদের পুকুরে ভাসমান শুভ্র শাপলার হাসিতে। শরৎ আসে অবারিত সবুজ মাঠে।

হেমন্তে পাকে ধান,আসে নবান্নের উৎসব, ঘাসের উপর জমে উঠে ছোট ছোট শিশির বিন্দু।

রূপসী হেমন্ত ধূসর কুয়াশায় নয়ন ঢেকে ফসল ফলাবার নিঃসঙ্গ সাধনায় থাকে নিমগ্ন। সে আমাদের ঘর সোনার ধানে ভরিয়ে দিয়ে শিশিরের মতো নিঃশব্দ চরণে বিদায় গ্রহণ করে।

গাছের ঝড়া পাতার নূপুর বাজিয়ে শীত আসে। বসন্তের নতুন পাতা জাগিয়ে তার বিদায় হয়।

সে আসে কুয়াশার চাদর পরে। তখন অসংখ্য শিশির কণায় ঝল মল করে উঠে বাংলার মুখ। সকালের মিষ্টি রোদে ভরিয়ে দেয় উঠান।

উত্তরী বাতাসের দীর্ঘশ্বাসে শিরশির করে গাছের পাতারা।

শীতের কুয়াশার চাদর ছিঁড়ে আবির্ভাব হয় বসন্তের। সবুজ কিশলয়ে ভরে উঠে চারিদিক। দক্ষিণের মিষ্টি হাওয়া আনমনে বয়ে যায় সবুজ ধানক্ষেতে। সবুজ ধানের চারা আনন্দে আন্দোলিত হয়। নীল আকাশে বলাকার ঝাক উড়ে যায়। ফুলে ওঠে নৌকার পাল। বৃক্ষের বাকল চিরে বেরিয়ে আসে নতুন পাতা।

গাছ আছে বলেই আছে সবকিছু, আছে সৌন্দর্য। ভোরের আবছা আঁধারি, মিষ্টি বাতাস আর পাখির কূজন থাকবে কি করে গাছ না থাকলে। কি করে সৃষ্টি হবে স্নীগ্ধ, মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সবুজের সমারোহে যে কবি তার কাব্য লেখার ভাঁজ খুলে, পাণ্ডুুলিপি হাতে দু-চার পৃষ্ঠা লিখতে চায়। কেমন করে হবে তার সাহিত্য সৃষ্টি। থাকবে না তার বারান্দায় সবুজের আনাগোনা। দলমেলে হাসবে না সাদা-গোলাপি নয়ন তারা। নীল ডেইজি, বেগুনি রঙের বোতাম ফুল, মিষ্টি রানী গোলাপি মর্নিং গ্লোরি। নানা রঙের পর্তুলিকা, লাল কাটামুকুট। এরা তাকে আর ডেকে বলবে না- কোথায় তোমার কাব্য লিখার খাতা।

সবুজ সুন্দর পুই শাকের ডগায় বাতাস আর খেলা করবে না। নানা রঙের পাতাবাহার ভোরের বাতাসে আর দোলবে না।

গাছ না থাকলে রুক্ষ শহরের ইট পাথরের মাঝে মাথা ঠুকে মরবে কবিতারা। আর কবি মরবে অক্সিজেনের অভাবে, খাদ্যের অভাবে। দূষিত পরিবেশে বাঁচবে না কোনো কবি, থাকবে না কোনো কবিতা।

বাংলাদেশ গ্রাম প্রধান। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের জন্ম গ্রামে। তারা প্রকৃতির সাথে, গাছপালা, ফুল পাখিদের সাথে বড় হয়েছে। মাটিতে বীজ ফেলা, ছোট চারা গাছের বেড়ে উঠা এসব দেখে তারা অভ্যস্ত। গ্রামের সবুজ শ্যামল প্রান্তরে কেটেছে তাদের শৈশব। প্রকৃতির মধ্যেই বড় হয়েছে তারা ।

বৃক্ষ আমাদের অনেক কিছু দিয়ে জীবন রক্ষা করে। পৃথিবীর পরিবেশকে শীতল রাখে। গৃহনির্মাণ ও আসবাবপত্র, ওষুধসহ আরো অনেক কিছুই আমরা সৃষ্টিকর্তার মহান দান বৃক্ষ থেকে পাই। কোনো দেশের ভূখণ্ডের ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার হলেও আমাদের দেশে তা নেই। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গাছ কেটে সবুজ বনভূমি উজাড় করছি আমরা।

অনিয়মভাবে চলছে বিভিন্ন কারখানা, যানবাহন আরো অনেক কিছু। পরিবেশ দূষিত হচ্ছে প্রচণ্ডভাবে প্রতিনিয়ত। আমরা আমাদের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গাছের উপর নির্ভরশীল।

পরিবেশদূষণ প্রতিরোধ, খাবারের প্রয়োজনে এককথায় আমাদের জীবন রক্ষার দায়ে অবশ্যই বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম আরো জোরদার করতে হবে। পৃথিবীর সবুজায়ন নিশ্চিত করতে বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই। বৃক্ষরোপণকে একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করতে হবে। বৃক্ষের কাছে আমরা সর্বদাই নির্ভরশীল। বৃক্ষবিহীন পৃথিবীকে এক মুহূর্তও মানুষ এবং জীববৈচিত্র্যের পৃথিবী হিসেবে কল্পনা করা যায় না। বৃক্ষবিহীন পৃথিবী হলো উত্তপ্ত মরুময় প্রাণহীন এক স্থান। আমরা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করে বেঁচে থাকি, এর জোগানদাতা হলো বৃক্ষ। একেকটি গাছ হলো অক্সিজেনের ভাণ্ডার, একটি অক্সিজেন ট্যাংক।

বৃক্ষ কত সুন্দর ফুল দেয়। ফুলের সৌন্দর্য আমাদের মুগ্ধ করে, নয়ন জুড়ায় এবং ফুলের সুবাস আমাদের মোহিত করে। সুস্বাদু ফল আমাদের পরম তৃপ্তি দেয়। বৃক্ষে পাখি বসে গান গায়। পাখির গান আমাদের প্রাণে দোল দিয়ে যায়। যে ঘরে অন্তত একটি সবুজ বৃক্ষ রয়েছে, সে ঘর প্রশান্তিতে ভরে ওঠে। আমাদের প্রতি বছর পরিকল্পনা করে বৃক্ষরোপণ অভিযানকে সফল করতে হবে। একটি বৃক্ষ রোপণ করলে পরবর্তী সময়ে তার যতœ নিতে হবে, যাতে একটি চারা থেকে পরবর্তী সময়ে আমরা ফুল, ফল ও কাঠের জোগান পাই। আমাদের মনে রাখতে হবে, বৃক্ষ পৃথিবীর হৃৎস্পন্দন, বৃক্ষরোপণে বাঁচবে সবার জীবন। পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষা করা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা, ঝড়ঝঞ্ঝা, জলোচ্ছ্বাস থেকে নিজেদের রক্ষা করার ক্ষেত্রে বৃক্ষরোপণ বিরাট অবদান রাখতে পারে। বৃক্ষরোপণের অর্থনৈতিক মূল্যও অনেক। ফুলের চারা রোপণের মাধ্যমে যেমন সৌন্দর্যপিপাসুদের চাহিদা মেটানো যায়; আবার বাণিজ্যিকভাবে ফুলের চাষ অনেককে স্বাবলম্বী করে তুলতে পারে। ফলদবৃক্ষ যেমন অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ, আবার ফল থেকে আমাদের খাদ্য চাহিদা ও শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ভিটামিনের চাহিদাও অনেকটা পূরণ করতে পারি।

লাখো বছর আগে পৃথিবীর প্রায় ৬০ শতাংশই অরণ্যাবৃত ছিল। জলবায়ুর পরিবর্তন, হিমশৈলের চলন এবং মানুষের কার্যকলাপের জন্য বিপুল অরণ্য ভূমি নষ্ট হয়েছে। বর্তমানে মানুষের নির্দয়ভাবে গাছ কাটার জন্য বনাঞ্চল ধ্বংসের পথে। বর্তমানে পৃথিবীর বনভূমি পুড়ছে, যা পৃথিবী ধ্বংসের ইঙ্গিত দেয়। তারপরও আমরা বৃক্ষরোপণের পরিবর্তে নির্বিচারে বৃক্ষ কেটে ধ্বংস করছি। এ কারণে পরিবেশ আজ হুমকির সম্মুখীন। এ সঙ্কট থেকে রক্ষা পেতে হলে অধিক হারে বৃক্ষরোপণ করতে হবে। গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-বন্দরে সর্বত্র বৃক্ষরোপণ করতে হবে। গাছপালা কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন উৎপন্ন করে। পর্যাপ্ত গাছপালা, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ঘটায় এবং খরা রোধ করে। রাস্তার পাশের গাছপালা ভূমিক্ষয় আর উপকূলবর্তী গাছপালা জলোচ্ছ্বাস প্রতিরোধ করে। তালগাছ আমাদের বজ্রপাত থেকে রক্ষা করে। তাই বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন বর্তমান পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গাছ আমাদের বেঁচে থাকার জন্য যা যা প্রয়োজন সব করে থাকে।

পরিবেশ সংরক্ষণ, গ্রিনহাউজ প্রতিক্রিয়া অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠে কার্বন-ডাই-অক্সাইড আটকে পড়া থেকে রক্ষা পাওয়া, নগর সভ্যতায় বৃক্ষের শীতল স্নিগ্ধতা ফিরিয়ে আনায় বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন। বৃক্ষ মানুষ ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু। সুস্থ, সুন্দর, সুবিন্যস্ত পরিবেশের ক্ষেত্রে রয়েছে এর বিরাট সহায়ক ভূমিকা। জনজীবনে গাছের ভূমিকা আশীর্বাদস্বরূপ। বিপন্ন পরিবেশকে বাঁচাতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। জীবনের জন্য, বেঁচে থাকার জন্য বৃক্ষ অনিবার্য। বৃক্ষ মানবজীবনের এমন এক বন্ধু, যার কোনো বিকল্প নেই। আসুন, আমরা প্রত্যেকে বেশি বেশি করে গাছ লাগাই ও গাছের যতœ নেই।

একটি গাছ মানুষের কি কি উপকার করে সেকথা বুঝানোর জন্য আমি নিমগাছের উপকারিতা তুলে ধরছি। একটি পরিপূর্ণ নিমগাছ প্রায় ১০ টন এসির সমপরিমাণ ঠাণ্ডা রাখে তার চারপাশের বাতাসকে।

নিমগাছ পরিবেশগতভাবে খুবই উপকারী। এটি খুব বেশি মাত্রার দূষণ সহ্য করতে পারে এবং শুষ্ক মৌসুমে পাতা পড়ে গেলেও সেগুলোতে তাড়াতাড়ি নতুন পাতা চলে আসে। নিমগাছের পাতা তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে সিসা শোষণ করে। ধূলিকণা, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, সালফার অক্সাইড এবং নাইট্রোজেনের মতো দূষক শোষণ করার ক্ষমতা নিমগাছের রয়েছে। ১৯৯৬ সালে আন্তর্জাতিকভাবে একটি সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে নিম গাছ শিল্প এলাকায় ও শহুরে দূষণ দূর করার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত প্রজাতিগুলোর মধ্যে একটি এবং এটি পরিচিত হট স্পটগুলোতে সবুজ বেল্টের মতো কাজ করে।

নিমগাছ অন্যান্য গাছের চেয়ে বেশি অর্থকরি এবং পরিচর্যায় তেমন খরচ নেই। নিম বাড়ির আঙিনা, রাস্তাঘাট, হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সর্বত্র লাগানো যায়। নিমগাছের গন্ধে আশপাশের ফসলেও কীট-পতঙ্গ আসে না! তাই ফসলের মাঠেও নিমগাছ লাগানো উপকারী। তুলনামূলকভাবে নিমের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অন্যান্য কাঠ, ফল ও ঔষধি গাছ থেকে অনেক বেশি। নিমের পাতা হাম, বসন্ত, ঘা, খুজলি, পাঁচড়া ও চুলকানিতে ব্যবহার হয়। নিম গাছে রোগ-ব্যাধি হয় না এবং এই গাছ গরু-ছাগলে খায় না। এই গাছ জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে, পাখিরা এই গাছের ফল খায়। নিম জন্মনিয়ন্ত্রণ, মশকনিধন, কৃমিনাশক, অজীর্ণ ও ডায়াবেটিস রোগে ব্যবহার হয়। নিমের শুকনো পাতা মূল্যবান কাপড়-চোপড়, বীজ ও ফসল সংরক্ষণে এবং পোকা দমনে ব্যবহার করা হয়। নিমের কসমেটিকস স্বাস্থ্য উপযোগী এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। নিমের শিকড়, ছাল ডাল-পালা পাতা, ফুল, ফল এবং বীজসহ সব কিছুই ব্যবহার উপযোগী এমনকি নিমের ছাইও।

দাঁত ও দাঁতের মাড়ি সুস্থ রাখার জন্য, দাঁতের মাজন ও পেস্ট তৈরিতে নিম ব্যবহার হয়। নিমের তেল মাথা ঠাণ্ডা রাখে, টাক মাথায় চুল গজায় এবং চুল পড়া বন্ধ করে। নিম সার ও কীটনাশক, মানুষ ও অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং উপকারী কীটপতঙ্গের জন্যে ক্ষতিকর নয়। নিম কুষ্ঠ ও অজীর্ণ রোগে উপকারী, ইহা এন্টিসেপটিক এবং যৌন রোগ নিরামক। নিম একটি ধনন্তরী মহৌষধ এবং সর্বোপরি যে বাড়িতে নিম গাছ থাকে সে বাড়ি সব প্রকার রোগ-ব্যাধিমুক্ত থাকে। নিমগাছকে বিজ্ঞানীরা আগামী শতকের মহামূল্যবান বৃক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং নিম গাছের তৈরি ওষুধ রাসায়নিক ওষুধের চেয়ে বেশি উপকারে আসবে বলে উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের মতো দরিদ্র দেশে নিম অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গাছের সাথে জীব শ্রেণীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। প্রাণীর অস্তিত্ব বজায় রাখতে গাছ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই স্থান-পরিক্রমায় জীবকুলের উপকারার্থে স্রষ্টা উদ্ভিদকুলকে বৈচিত্র্যময় করে সাজিয়েছেন। তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় পরস্পর নির্ভরশীল। অথচ প্রতিনিয়ত গাছ কর্তন করে শুধু মানুষরাই নিজেদের এবং সব প্রাণীকুলের সর্বনাশ ডেকে আনছে। গাছ কাটা প্রতিরোধ করে মানুষের বসবাসে পরিবেশবান্ধব গাছ লাগানোর বিষয়ে শিক্ষা দানের ব্যবস্থা করা খুব প্রয়োজন।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গাছের ভূমিকা অপরিহার্য। গাছই আমাদের দেশটিকে এমন মায়াবি রূপ দিয়েছে। নানা প্রজাতির গাছ আমাদের দেশে বিদ্যমান। পরিবেশ রক্ষায় গাছের তুলনা হয় না। গাছ হলো প্রাকৃতিক বায়ু ফিল্টার, যা কার্বন-ডাই অক্সাইড এবং অন্যান্য দূষক শোষণ করে এবং বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেন ত্যাগ করে। পর্যাপ্ত পরিমাণ বৃষ্টিপাতে গাছের অবদান রয়েছে। গাছ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রভাবকে কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া, গাছ শহুরে হিট আইল্যান্ড প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। ‘শহুরে হিট আইল্যান্ড’ বলতে বোঝায়, শহরের ভবন এবং ফুটপাথের অতিরিক্ত তাপ শোষণের ফলে শহরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি অনুভব হওয়া। তাই শহরে গাছ রোপণের গুরুত্ব একটু বেশি। আমাদের উচিত খালি জায়গা পেলে গাছ রোপণের উদ্যোগ নেয়া। কেননা, একমাত্র আমাদের এই পরম উপকারী বন্ধুটি পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করতে সক্ষম।

আমরা নির্বিচারে বৃক্ষনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করতে সামান্যতম কুণ্ঠাবোধ করি না। প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে এ প্রক্রিয়া চলমান রেখেছি। নির্বিচারে বৃক্ষনিধনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধিসহ নানা দুর্যোগের মুখোমুখি হই আমরা।

গাছ আমাদের পরম বন্ধু। গাছ না লাগালে সেটি উপলব্ধি করা যায় না। গাছ যে আমাদের বাড়ির একজন সদস্যের মতোই, সেটি গাছ লাগালেই টের পাওয়া যায়। বেঁচে থাকার জন্যে আমরা প্রতি মুহূর্তে অক্সিজেন গ্রহণ করি। নিঃশ্বাস ছাড়ার সময় ত্যাগ করি কার্বন-ডাই অক্সাইড। এক হেক্টর আয়তনের ঘন অরণ্য বছরে প্রায় চার টন ওজনের কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্যাস শুষে নেয় ও প্রায় দুই টন বিশুদ্ধ অক্সিজেন বায়ুমণ্ডলে সরবরাহ করে। এতেই বোঝা যায়, জীবজগতে পরিবেশ রক্ষায় গাছ কতখানি প্রয়োজনীয়। এই গাছ আমাদের জীবন দেয়। গাছ না থাকলে এই পৃথিবীতে আমাদের বেঁচে থাকা সম্ভব হতো না। একমাত্র পরিবেশে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে গাছ। তাই এ সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে বন সৃজন প্রকল্প। নির্বিচারে গাছ কাটা নয়, গাছ লাগিয়ে যাওয়া আমাদের কর্তব্য।

গাছ আমাদের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি ফুল, ফল, কাঠ, ছায়া ইত্যাদি দিয়ে সহযোগিতা করে। গাছ না থাকলে কি খেতাম আমরা। শস্যদানা তো গাছ থেকেই হয়। আমরা কি বুঝতে পারছি। গাছ আমাদের খাবার, নিশ্বাসের ব্যবস্থা এবং পরিবেশের ভারসাম্য,পরিবেশ দূষণমুক্ত এবং পরিবেশ সুন্দর রাখা ছাড়াও আরো অনেক উপকার করে থাকে। কিন্তু আমরা গাছ কেটে ধ্বংস করছি আমাদের বনভূমিকে। ২৫ শতাংশ বনভূমির মধ্যে আমাদের আছে মাত্র ১৭ শতাংশ বনভূমি। আর এটিও এখন বিলুপ্তির পথে। ফলে পরিবেশে কার্বন-ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সারা বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তন হয়ে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে। গাছের অভাবে পরিবেশের এই কান্না কেউ শোনে না। তাই এখনই সময় গাছ লাগানোর। এখনই সময় পরিবেশকে রক্ষা করার।

একেকটি বৃক্ষ একেকটি কবিতার মতো। কবিতা যেমন মানুষের আত্মাকে জাগ্রত করে, বৃক্ষ তেমনি মানুষের ফুসফুসকে জাগিয়ে রাখে। বৃক্ষ ফুল ফল তাই কবিদের কবিতায় ঠাঁই পেয়েছে প্রবলভাবে। কবিতায় বৃক্ষের আনন্দ আছে। পাতার দোলানি আছে। ফুলের সৌন্দর্য আছে। সুতরাং একজন কবির কাছে একটি বৃক্ষ মানে একটি জীবন্ত কবিতা।