নতুন গ্রামীণ অর্থনীতি গড়ছে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ

এক দশকে বড় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি এই রেমিট্যান্স

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

সোলায়মান হোসেন, ছিলেন মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে। প্রথম দিকে কম বেতন পেতেন। ধীরে ধীরে ওই দেশের ভাষা রপ্ত করে ফেলেন। এরপর থেকেই ভালো বেতন পেতেন। দীর্ঘ ১৫ বছরের জমানো অর্থ দিয়ে গ্রামের বাড়িতে একটি গরুর খামার গড়েছেন। প্রথমে সাতটি গরু দিয়ে শুরু করেন এ খামার। বর্তমানে তার খামারে গরুর সংখ্যা ৫০টিতে পৌঁচেছে। ফি বছর কোরবানির হাটে তোলেন গোটা ত্রিশেক গরু। গড়ে বছরে ৫০ লাখ টাকা গরু বিক্রি করেন। এভাবেই প্রবাসী আয়ের পুঁজি দিয়ে সোলায়মান এখন বড় খামারি হয়েছেন। ছেলেমেয়েরা উচ্চ শিক্ষার জন্য বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দে গড়ে উঠা সোলায়মানের খামারের মতো দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসীদের আয়ে গড়ে উঠেছে গরু-মুরগী-মাছের খামার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কেউবা মাটির ঘর থেকে ইট পাথরের ঘেরা পাকা দালান গড়েছেন। পাল্টে গেছে গ্রামীণ চিত্র।

বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গত এক দশকে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে এই রেমিট্যান্স। একসময় গ্রামের অর্থনীতি মূলত কৃষিনির্ভর ছিল। কিন্তু এখন মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, মালয়েশিয়া কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক কাঠামোকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। শুধু পরিবারের আয় বাড়ানো নয়, রেমিট্যান্স এখন স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন ভোক্তা শ্রেণী তৈরি করছে, বাড়াচ্ছে বিনিয়োগ এবং গ্রামীণ বাজারকে করে তুলছে আরো সচল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে এক ধরনের “অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ” তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গত দুই বছর ধরে প্রতি মাসেই গড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের ওপরে রেমিট্যান্স আসছে। যার বেশির ভাগেরই অবদান গ্রামে বেড়ে উঠা প্রবাসী শ্রমিকরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রবাসীরা যে অর্থ দেশে পাঠান, তার বড় অংশই গ্রামে বসবাসকারী পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছায়। ফলে গ্রামের বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়ছে। আগে যেখানে কৃষিকাজের মৌসুমভিত্তিক আয় ছিল গ্রামের মানুষের প্রধান ভরসা, এখন সেখানে প্রবাসী আয়ের কারণে বছরজুড়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সক্রিয় থাকছে।

রেমিট্যান্সের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাচ্ছে আবাসন খাতে। দেশের বিভিন্ন গ্রামে এখন বহুতল ভবন, আধুনিক বাড়ি কিংবা নতুন আবাসিক স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। অনেক পরিবার টিনের ঘর থেকে পাকা বাড়িতে উঠেছে। গ্রামীণ জনপদে জমির দামও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিদেশফেরত শ্রমিকের সংখ্যা বেশি, সেখানে নির্মাণসামগ্রীর দোকান, হার্ডওয়্যার ব্যবসা, আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের বাজারও সম্প্রসারিত হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদ কিংবা উৎসবের সময় প্রবাসী পরিবারের কেনাকাটার চাপ গ্রামীণ বাজারকে নতুন মাত্রা দেয়।

রেমিট্যান্স গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার মানেও বড় পরিবর্তন এনেছে। আগে যেখানে দরিদ্র পরিবারগুলো সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে হিমশিম খেত, এখন অনেক পরিবার সন্তানদের শহরের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয়ও বেড়েছে। গ্রামে এখন অনেক পরিবার চিকিৎসার জন্য জেলা শহর বা রাজধানীতে যেতে পারছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, মানবসম্পদ উন্নয়নে রেমিট্যান্সের এই ভূমিকা দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ব্যবসার সম্প্রসারণেও রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেকে বিদেশ থেকে ফিরে মুদি দোকান, কৃষি খামার, মাছ চাষ, পরিবহন ব্যবসা বা ছোট কারখানায় বিনিয়োগ করছেন। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামে যে নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণী তৈরি হচ্ছে, তার পেছনে বড় অবদান প্রবাসী আয়ের। অনেক এলাকায় এখন কৃষিকাজের পাশাপাশি সেবা খাতও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রেমিট্যান্সের ইতিবাচক প্রভাব শুধু অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সামাজিক কাঠামোকেও বদলে দিচ্ছে। গ্রামে নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ছে। কারণ অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্য বিদেশে থাকায় অর্থব্যবস্থাপনা ও পারিবারিক সিদ্ধান্তের দায়িত্ব নারীদের ওপর আসছে। একই সাথে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহারের প্রবণতাও বেড়েছে। বিকাশ, নগদ বা ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে এখন গ্রামের মানুষ সহজে টাকা গ্রহণ ও লেনদেন করতে পারছেন।

তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্সের বড় অংশ এখনো ভোগব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ বাড়ি নির্মাণ, জমি কেনা কিংবা ভোগ্যপণ্যে খরচ বেশি হলেও উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ তুলনামূলক কম। ফলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে উঠছে না। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশফেরত শ্রমিকরা সঠিক পরিকল্পনার অভাবে সঞ্চিত অর্থ হারিয়ে ফেলছেন।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, রেমিট্যান্স যদি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, ক্ষুদ্র শিল্প বা প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে আরো বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বর্তমানে অনেক গ্রামে শুধু ভোগনির্ভর প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু উৎপাদন ও শিল্পভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানো গেলে স্থানীয় অর্থনীতি আরো শক্তিশালী হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরো বলছেন, রেমিট্যান্সনির্ভর অর্থনীতির কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি বা বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যেতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সঙ্কটের সময় রেমিট্যান্সে ধীরগতি দেখা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন আলোচনায়ও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্য দিকে, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা বাড়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব আরো স্পষ্ট হচ্ছে। সরকার নগদ প্রণোদনা দেয়ায় ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠানো বেড়েছে। ফলে গ্রামের মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার সাথে আরো বেশি যুক্ত হচ্ছে। এতে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিও বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

গ্রামীণ সমাজে জীবনযাত্রার ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এখন গ্রামের অনেক পরিবার শহুরে জীবনধারার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। মোটরসাইকেল, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, আধুনিক গৃহস্থালি পণ্যের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। গ্রামে নতুন নতুন রেস্টুরেন্ট, কোচিং সেন্টার, ক্লিনিক ও সুপারশপ গড়ে উঠছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব পরিবর্তনের বড় চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়।

তবে সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, এর কিছু নেতিবাচক সামাজিক প্রভাবও আছে। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে কর্মরত সদস্যের দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে পারিবারিক সম্পর্ক দুর্বল হচ্ছে। আবার কিছু এলাকায় কৃষিকাজে আগ্রহ কমে যাচ্ছে, কারণ অনেক পরিবার এখন বিদেশে যাওয়াকেই উন্নতির প্রধান পথ হিসেবে দেখছে। ফলে স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থায়ও প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্সকে শুধু পারিবারিক আয় হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে স্থানীয় উন্নয়নের একটি কৌশলগত সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি রফতানি, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনর্বাসন, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এবং গ্রামীণ শিল্পায়নের সুযোগ সৃষ্টি। তাহলেই রেমিট্যান্সনির্ভর প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে।

অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির বর্তমান রূপান্তরের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো রেমিট্যান্স। এটি শুধু অর্থ পাঠানোর বিষয় নয়; বরং সামাজিক পরিবর্তন, জীবনমান উন্নয়ন এবং স্থানীয় অর্থনীতির গতিশীলতার একটি বড় উপাদান। সঠিক পরিকল্পনা ও নীতিগত সহায়তা থাকলে প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ আগামী দিনে গ্রামবাংলার অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে।