তারেক রহমানের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ

স্থিতিশীলতার চাবিকাঠি অর্থনীতির পুনরুদ্ধার

টাইমের বিশ্লেষণ

২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর প্রথম নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ হাসিনার দল অংশ নিতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এ দিকে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবতন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আবারো শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোতে। ফলে বিএনপির সামনে কেবল ক্ষমতা ধরে রাখাই নয়, জনঅসন্তোষ সামলানোও বড় চ্যালেঞ্জ।

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

বাংলাদেশে বসন্তের প্রথম দিন পয়লা ফাল্গুন এ বছর এসেছিল এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে। জাতীয় নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন জিতে ক্ষমতায় এসেছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ ভবনে শপথ নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

তবে এই জয়ের পাশে একটি বাস্তবতার তারকা চিহ্ন রয়ে গেছে। ২০২৪ সালের ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনে স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর প্রথম নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে শেখ হাসিনার দল অংশ নিতে পারেনি। ফলে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই গেছে। এ দিকে আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবতন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আবারো শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে, বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের পিছিয়ে থাকা জেলাগুলোতে। ফলে বিএনপির সামনে কেবল ক্ষমতা ধরে রাখাই নয়, জনঅসন্তোষ সামলানোও বড় চ্যালেঞ্জ।

অর্থনীতিই আসল পরীক্ষা

রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে এখন একটাই প্রশ্ন- অর্থনীতি। বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে প্রায় দ্বিগুণ করে এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। কিন্তু বর্তমানে প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের কাছাকাছি। এই অবস্থায় ৯ শতাংশ হারে টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন সহজ নয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি প্রশংসনীয় হলেও, রাজস্ব বাড়ানোর বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। বেসরকারি বিনিয়োগ ২৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে না তুললে লক্ষ্য অর্জন অসম্ভব।

কৃষি ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্কট

বাংলাদেশের ৪৪ শতাংশ শ্রমশক্তি কৃষিনির্ভর। কিন্তু উৎপাদকের হাতে ন্যায্য দাম পৌঁছায় না। খামার থেকে শহর পর্যন্ত অসংখ্য মধ্যস্বত্বভোগী দামের বোঝা বাড়ায়।

এই জটিল সরবরাহ চক্র ভাঙা, পোস্ট-হারভেস্ট লজিস্টিকস উন্নত করা এবং বাজারব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণে আনা- এগুলোই হতে পারে তারেক রহমান সরকারের দ্রুত ফলদায়ক পদক্ষেপ। খাদ্যমূল্য কমলে শহর ও গ্রাম- দুই অর্থনীতিই স্বস্তি পাবে।

প্রবাসী আয় : অর্থনীতির লাইফলাইন

দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় ভরসা প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স। প্রায় এক কোটি কর্মী বিদেশে কাজ করেন। তাদের পাঠানো অর্থ অনেক সময় আইএমএফের সহায়তার চেয়েও কার্যকর।

অবৈধ হুন্ডি বন্ধ করে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থপ্রবাহ ধরে রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের কঠোর নজরদারি জরুরি। শ্রম রফতানি খাতে দুর্নীতি কমানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আঞ্চলিক কূটনীতি : নতুন দিগন্ত না পুরনো কাঠামো?

নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপি আসিয়ান-এ যোগদানের আগ্রহ দেখিয়েছে। এটি বাস্তবসম্মত, কারণ আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত হলে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়তে পারে। অন্য দিকে সার্ক দীর্ঘদিন ধরেই অকার্যকর। দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত বাণিজ্যও নগণ্য। ফলে বাস্তব লাভের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দিকে ঝোঁকই বেশি কার্যকর হতে পারে। মিয়ানমার সীমান্তে রোহিঙ্গা সঙ্কটও সমাধানের দাবি রাখে- এখানেও আসিয়ান প্ল্যাটফর্ম কাজে আসতে পারে।

ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র : ভারসাম্যের কূটনীতি

বাংলাদেশের দীর্ঘতম সীমান্ত ভারতের সাথে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পর্কে টানাপড়েন বেড়েছে। জ্বালানি চুক্তি ও আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

অন্য দিকে চীন অবকাঠামো বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে শীর্ষ অংশীদার। বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগে বড় অঙ্কের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ দিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রফতানির সবচেয়ে বড় বাজার এবং জ্বালানি খাতে শেভরন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই তিন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন সরকারের কৌশলগত সাফল্যের চাবিকাঠি। তারেক রহমানের সামনে সুযোগ যেমন বড়, ঝুঁকিও তেমনি গভীর। সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। কিন্তু অর্থনীতিতে দৃশ্যমান উন্নতি না এলে জনঅসন্তোষ দ্রুত বাড়বে- আর তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

অতএব, বড় স্বপ্ন নয়- ছোট কিন্তু কার্যকর সংস্কার, কৃষি ও রেমিট্যান্স ব্যবস্থায় দ্রুত ফল, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই পারে বাংলাদেশকে নতুন পথ দেখাতে।

রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে অর্থনীতি- আর সেই পরীক্ষায়ই এখন তারেক রহমান সরকারের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে।