‘হিজরত’ সিনেমায় দেশান্তরের নতুন বয়ান

সাকিবুল হাসান
Printed Edition
‘হিজরত’ সিনেমায় দেশান্তরের নতুন বয়ান
‘হিজরত’ সিনেমায় দেশান্তরের নতুন বয়ান

সৌদি আরবের উদীয়মান নির্মাতা শাহদ আমিনের নতুন চলচ্চিত্র ‘হিজরত’ বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হওয়ার পর এখন মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাগৃহে ঝড় তুলছে। ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সেরা এশীয় চলচ্চিত্র’ হিসেবে পুরস্কৃত এই সিনেমাটি কেবল একটি ভ্রমণের গল্প নয়; বরং এটি সৌদি আরবের বদলে যাওয়া সমাজব্যবস্থা এবং সেখানে বসবাসরত মানুষের আত্মপরিচয় সঙ্কটের এক গভীর ব্যবচ্ছেদ।

সিনেমাটির গল্প শুরু হয় ২০০১ সালের তায়েফে। একজন বৃদ্ধা দাদি তার দুই নাতনীকে নিয়ে হজের উদ্দেশে বের হন। কিন্তু যাত্রার শুরুতেই বড় নাতনী পালিয়ে গেলে পবিত্র এই ধর্মীয় সফরটি রূপ নেয় এক নিরুদ্দেশ মানুষের সন্ধানে। ‘কাদাদ’ বা ভাড়াটে গাড়িচালক আহমেদের গাড়িতে চড়ে দাদী ও ছোট নাতনী যখন রহস্যময় সেই পথের যাত্রী হন, তখনই উন্মোচিত হতে থাকে সৌদি সমাজের ভেতরকার নানা জটিল স্তর। পরিচালক শাহদ আমিন এই সিনেমার মাধ্যমে তিনটি ভিন্ন প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইকে তুলে ধরেছেন। একদিকে দাদী, যার স্মৃতিতে রয়েছে অতীতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি। অন্যদিকে দ্বিতীয় প্রজন্ম, যারা কট্টর রক্ষণশীলতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে। আর সবশেষে বর্তমানের তরুণ প্রজন্ম, যারা ইন্টারনেটের মুক্ত বাতাসের টানে শেকড় ছিঁড়ে পালিয়ে যেতে চায়। বড় নাতনী সারার পালিয়ে যাওয়া মূলত সেই অবদমিত আকাক্সক্ষারই বহিঃপ্রকাশ।

চলচ্চিত্রটির দৃশ্যশৈলী বা সিনেমাটোগ্রাফি গল্পের সাথে অদ্ভুতভাবে মিশে গেছে। তায়েফের শীতল নীল আভা থেকে মক্কার তপ্ত হলুদ মরুভূমির দিকে যাত্রার মাধ্যমে পরিচালক চরিত্রগুলোর মানসিক যন্ত্রণার তীব্রতা ফুটিয়ে তুলেছেন। তাদের পরণের সাদা পোশাক আর মরুভূমির রুক্ষতা এক আধ্যাত্মিক আবহ তৈরি করে, যা দর্শককে ভাবিয়ে তোলে।

সিনেমার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো- এর ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয় সঙ্কট। বড় নাতনী সারা সৌদি পাসপোর্টধারী হওয়া সত্ত্বেও দেশ ছাড়তে মরিয়া। অন্যদিকে, গাড়ির চালক আহমেদ, যার কোনো আইনি বৈধতা নেই, সে এই মাটিকে ভালোবেসে এখানেই থেকে যেতে চায়।

সিনেমার শেষে দেখা যায় এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা, যে দেশ ছাড়তে চেয়েছিল সে ফিরতে বাধ্য হয়, আর যে দেশটিকে নিজের ঘর ভেবেছিল তাকে অবৈধ ঘোষণা করে তাড়িয়ে দেয়া হয়। এই বৈপরিত্য আমাদের সামনে এক তিক্ত প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় : পরিচয় কি সরকারি কাগজ বা পাসপোর্টে থাকে, নাকি মাটির প্রতি গভীর টানে?

সিনেমাটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে মনে করছেন, পরিচালক শাহদ আমিন তার দার্শনিক বার্তা ও গূঢ় তত্ত্বগুলো প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে মূল গল্পের গতি কিছুটা ধীর করে ফেলেছেন। সরাসরি সংলাপের আধিক্য চরিত্রগুলোর সাথে দর্শকের আবেগীয় সংযোগে মাঝেমধ্যে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তবে সব ছাপিয়ে ‘হিজরত’ বর্তমান সময়ের অন্যতম সাহসী একটি কাজ, যা সৌদি সিনেমার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।