হারুন ইসলাম
অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা মতে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা তরুণদের রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ভোটের মাঠে নামার প্রস্তুতি শুরু করেছে। দলটি এখন পর্যন্ত ৪৭টি আসনে প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে এবং চলতি মাসের মধ্যেই আরো অন্তত ১০০ আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করবে। বিএনপি ও জামায়াতের সাথে নির্বাচনী জোট নিয়ে আলোচনা চললেও এনসিপির অধিকাংশ নেতা এখন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার দিকেই ঝুঁঁকছেন। তাদের মতে, নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করতে হলে একক অংশগ্রহণই কৌশলগতভাবে শ্রেয়।
দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হবে। যেসব এলাকায় আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নেতারা আছেন, তাদের সম্মানে সেখানে প্রার্থী দেয়া হবে না, তবে বাকি আসনগুলোতে এনসিপি প্রস্তুত। তিনি আরো বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের সাথে জোট হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। এরই মধ্যে প্রার্থী নির্ধারণে ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির প্রধান নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আর সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব ডা: তাসনিম জারা। এ কমিটি প্রার্থী বাছাই, প্রচারণা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম তদারকির দায়িত্বে থাকবে।
‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীরা কে কোন আসনে : মনোনয়ন বিতরণ ফরম বিক্রির আগে থেকে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতা নিজ নিজ এলাকায় প্রচারণা শুরু করেছেন। দলটির একাধিক সূত্র জানা গেছে, আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম লড়বেন ঢাকা-১১ (বাড্ডা, ভাটারা, রামপুরা) আসনে, সদস্যসচিব আখতার হোসেন থাকছেন রংপুর-৪ এ, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যাচ্ছেন ঢাকা-১৮ (উত্তরা), উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন পঞ্চগড়-১ আসনে এবং দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ থাকছেন কুমিল্লা-৪ এ। এ ছাড়া জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব লড়বেন ঢাকা-১৪ আসনে এবং ডা: তাসনিম জারা প্রার্থী হচ্ছেন ঢাকা-৯।
জানা গেছে, সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের দুই সদস্য, মাহফুজ আলম (লক্ষ্মীপুর-১) ও আসিফ মাহমুদ (ঢাকা-১০) পদত্যাগ করে এনসিপির প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। ইতোমধ্যে এ আসনে আসিফ মাহমুদ ভোটার হওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। এ আসন থেকে তিনি স্বতন্ত্র নির্বাচন করতে পারেন।
‘শাপলা কলি’ প্রতীকে নিবন্ধন, ফরম বিক্রি শুরু : নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি এনসিপিকে ‘শাপলা কলি’ প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর নিবন্ধনও প্রায় সম্পন্ন। দলটির আইনবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট তরিকুল ইসলাম বলেন, এনসিপি এমন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবে যিনি এলাকায় প্রভাবশালী, গ্রহণযোগ্য এবং যার বিরুদ্ধে বড় কোনো অভিযোগ নেই। দলের দফতর সম্পাদক খালেদ সাইফুল্লাহ জানান, মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হওয়ার দুই দিনেই শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। তিনি বলেন, মনোনয়ন বাণিজ্যের সংস্কৃতি ভাঙতেই ফরম সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
জোট নয়; একক অংশগ্রহণে মত অধিকাংশ নেতার : সম্প্রতি রাজধানীর বাংলামোটরে অনুষ্ঠিত নির্বাহী কাউন্সিল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ৩০ জনের বেশি সদস্য। অধিকাংশ নেতা মত দেন, এবার জোট নয়; একক অংশগ্রহণই দলের জন্য উপযুক্ত পথ। জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন বলেন, ‘জোট বা আসন সমঝোতা নয়; এখন আমাদের সময় নিজস্ব শক্তিতে লড়ার।’ আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, ‘দলের স্বতন্ত্র রাজনীতি দাঁড় করাতে হলে বিএনপি-জামায়াত বৃত্তের বাইরে চিন্তা করতে হবে।’ বৈঠকে অনেকেই মত দেন, বিএনপি বা জামায়াতের সাথে জোটে গেলে এনসিপির রাজনৈতিক স্বকীয়তা ঝুঁঁকিতে পড়বে। এক নেতা বলেন, ‘কোনো বড় দলের ছায়ায় কয়েকটি আসনে জয় পাওয়া সম্ভব হলেও তাতে আমাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’
গত সপ্তাহে রাজনৈতিক অঙ্গনে গুঞ্জন ছিল, বিএনপির সাথে এনসিপির ২০ আসনভিত্তিক জোট হতে পারে। তবে দলটি দ্রুতই এ খবর অস্বীকার করে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বিএনপির সাথে জোট হলেও তাদের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন কি না, সেটি অনিশ্চিত। তিনি আরো বলেন, জামায়াতের সাথে জোটের ঐতিহাসিক দায় রয়েছে, তাই বিকল্প হিসেবে এবি পার্টি বা গণ অধিকার পরিষদের সাথে তৃতীয় জোটের সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, এবি পার্টির সাথে প্রাথমিক আলোচনা শুরু হয়েছে, তবে গণতন্ত্র মঞ্চের দলগুলোর সাথে এখনো দূরত্ব রয়েছে।
সংস্কার ও নতুন নেতৃত্বের লক্ষ্য এনসিপির : জুলাই অভ্যুত্থানে সক্রিয় তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বেই গঠিত এনসিপি। তাদের রাজনৈতিক লক্ষ্য ‘সংস্কার, স্বচ্ছতা ও নতুন নেতৃত্ব’ প্রতিষ্ঠা। দফতর সচিব সালেহ উদ্দীন সিফাত বলেন, ‘আমরা প্রথাগত রাজনীতির ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। সংসদে দলীয় এমপি নয়; জনতার প্রতিনিধি পাঠানোই আমাদের লক্ষ্য।’ বর্তমানে ৬১ জেলায় সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে দলটি এবং সম্প্রতি ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ নামে বড় কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে।
দলীয় সূত্র জানায়, মাত্র দুই দিনেই শতাধিক মনোনয়ন আবেদন জমা পড়েছে। তরুণ রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও সামাজিক সংগঠনের নেতাদের মধ্য থেকে অনেকেই ফরম সংগ্রহ করেছেন। সামান্তা শারমিন বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিনিধিত্ব করতে হলে নতুন মুখ দরকার। এনসিপির প্রার্থী তালিকায় থাকবে একাধিক চমক।’
৩০০ আসন লক্ষ্য; খালেদা জিয়ার আসনে না দেয়ার ঘোষণা : জুলাই অভ্যুত্থানের পর দ্রুত উত্থান ঘটে এনসিপির। সংবিধান সংস্কার, জুলাই গণহত্যার বিচার ও অর্থনৈতিক সংস্কার বাস্তবায়নই তাদের প্রধান কর্মসূচি। আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা ৩০০ আসন ধরে এগোচ্ছি। তবে যারা দেশের গঠনমূলক রাজনীতিতে অবদান রেখেছেন, তাদের সম্মানে কিছু আসনে প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’ তিনি আরো জানান, দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার তিনটি আসনে প্রার্থী না দেয়ার সিদ্ধান্তও দলের পক্ষ থেকে সম্মানসূচক পদক্ষেপ।
নির্বাচনী প্রস্তুতি চালিয়ে গেলেও জুলাই সনদ নিয়ে ছাড় দিবে না এনসিপি : জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ছাড়া আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে কি না- এ নিয়ে পর্যালোচনায় বসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি মনে করে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী যে পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়েছিল, তা এখনো পূর্ণ বাস্তবায়নের পথে যায়নি। তাই জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে কতটা রূপ পাচ্ছে, সরকার তার কতটা অগ্রগতি দেখাতে পারছে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এনসিপি।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ নিয়ে এনসিপির মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অনেক নেতা মনে করেন, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের কিছু অগ্রগতি হলেও জুলাই সনদের মূল আত্মা, জনগণের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা, এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি।
তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে নির্বাচন দিলে পুনরায় দেশে সঙ্কটের সৃষ্টি হতে পারে।
এ দিকে গত শুক্রবার রাতে এনসিপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সভায় এ বিষয়টি প্রধান আলোচ্য ছিল। সভায় উপস্থিত নেতারা জানান, মূলত দু’টি ইস্যু নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়; প্রথমত, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ছাড়া নির্বাচনে যাওয়া কতটা যুক্তিযুক্ত; দ্বিতীয়ত, নির্বাচনে গেলে এনসিপি এককভাবে যাবে নাকি জোটবদ্ধ হয়ে অংশ নেবে। যদিও শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা অনুপস্থিত থাকায় কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি, তবে পরবর্তী সভায় বিষয়টি নির্ধারিত হবে বলে জানা গেছে।
সভায় অংশ নেয়া অধিকাংশ কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়নই দেশের রাজনৈতিক স্থিতি ও গণতন্ত্র পুনর্গঠনের একমাত্র ভিত্তি। তাদের মতে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশন জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে যে সুপারিশ দিয়েছে, তা হুবহু কার্যকর করতে হবে, কোনো রকম পরিবর্তন ছাড়া। দলটির নেতারা মনে করেন, সরকার যদি দ্রুত এ আদেশ জারি না করে, তবে নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হবে না এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক ও মিডিয়া সেলের সদস্য খান মুহাম্মদ মুরসালীন বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ দীর্ঘ প্রতীক্ষার ফসল। এ উত্তরণ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন জুলাই সনদের প্রতিটি ধারা বাস্তবায়িত হবে। তাই আমরা বারবার বলেছি, সব রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধেŸ ওঠে সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে।’
দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আগে নির্বাচন হলে তা দেশের স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর হবে। আমরা চাই, সরকার ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী সনদ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দ্রুত জানাক। এর পরই আমরা আমাদের নির্বাচনী অবস্থান স্পষ্ট করব।’
সব মিলিয়ে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের আগে এনসিপি এখন নির্বাচনী ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে। জোট গঠন না হলেও নিজেদের শক্তিতে লড়াইয়ের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। দলের ভেতর এখন মূল লক্ষ্য সংগঠন ও ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র উপস্থিতি তৈরি করা।



