কৌশলগত অংশীদারত্ব আর বহুমাত্রিক সহযোগিতা জোরদারে সম্মত দুই দেশ

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ বিবৃতি

Printed Edition
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার পেরদানা পুত্রা ভবনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন : পিআইডি
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার পেরদানা পুত্রা ভবনে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেন : পিআইডি

ইকবাল মজুমদার তৌহিদ কুয়ালালামপুর থেকে

ঢাকা ও কুয়ালালামপুরের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ় করতে এবং বিভিন্ন উদীয়মান খাতে কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ব্যবসা-বাণিজ্য, শ্রমবাজার, উন্নত প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

শ্রমবাজার : নতুন রূপরেখা ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া

দুই নেতার আলোচনায় মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশী শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়। নতুন কর্মী নিয়োগ প্রশ্নে মালয়েশিয়া স্পষ্ট করেছে যে, তাদের বিদ্যমান কোটা নীতিমালার আলোকে প্রতিটি আবেদন আলাদাভাবে বিবেচনা করে নতুন কর্মী নিয়োগের অনুমোদন দেয়া হবে।

হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রশ্নে বর্তমান বাস্তবতা ও চাহিদার ওপর ভিত্তি করে বিদ্যমান শ্রমশক্তি অভিবাসন সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা ও একটি নতুন, আধুনিক কাঠামো তৈরির জন্য দুই দেশ একটি যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছে।

স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ ইস্যুতে নির্ভরযোগ্য এজেন্সির মাধ্যমে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই প্রধানমন্ত্রী।

২. প্রযুক্তি খাতে অংশীদারিত্ব : ডিজিটাল অর্থনীতি, এআই ও সেমিকন্ডাক্টর

ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় দুই দেশ অগ্রসরমান প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতা বাড়াতে উভয় দেশ একমত হয়েছে :

প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রশ্নে বলা হয়েছে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অর্থনীতি, ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল গভর্ন্যান্সের উন্নয়নে দুই দেশের সরকারি সংস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগকে উৎসাহিত করা হবে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি প্রশ্নে বাংলাদেশের হাইটেক পার্ক, ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে মালয়েশিয়ার বৃহত্তর বিনিয়োগকে স্বাগত জানানো হয়েছে।

সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ও টেস্টিং খাতে মালয়েশিয়ার বৈশ্বিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশী প্রকৌশল স্নাতকদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও জ্ঞান আদান-প্রদানের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

৩. হালাল শিল্পে যৌথ উদ্যোগ

বৈশ্বিক ইসলামী অর্থনীতির ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে বাংলাদেশের হালাল খাতের উন্নয়নে যৌথভাবে কাজ করবে দুই দেশ। মালয়েশিয়ার ইসলামী উন্নয়ন বিভাগ এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর চলমান সমন্বয়কে আরো জোরদার করা হবে। বিশেষ করে হালাল সনদ প্রদান, নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি, যৌথ গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে।

৪. উচ্চশিক্ষা, কারিগরি দক্ষতা ও পর্যটন

শিক্ষা ও দক্ষতা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে উচ্চশিক্ষা, যৌথ গবেষণা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা হবে। সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি ও শ্রমবাজারের চাহিদার আলোকে শিক্ষাক্রম পরিমার্জনে দুই দেশ কাজ করবে।

পর্যটন প্রশ্নে ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিক্যাল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির আলোকেই দ্বিপক্ষীয় পর্যটন প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে দুই নেতা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

৫. জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের আহ্বান

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ও পেট্রোলিয়াম পণ্যবিষয়ক বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সর্বোচ্চ ব্যবহারের ওপর জোর দেয়া হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা ও চুনাপাথরসহ অনাবিষ্কৃত খনিজ সম্পদ উত্তোলন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলোকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে বাংলাদেশ।

৬. প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার

দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পর্কের প্রশংসা করে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সমঝোতা স্মারকটি পুরোপুরি কার্যকর করার অঙ্গীকার করা হয়েছে।

ভবিষ্যৎ সহযোগিতার রূপরেখা তৈরিতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ কমিটির বৈঠক আয়োজনের তাগিদ দেয়া হয়। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয় জাতিসঙ্ঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে যৌথ প্রশিক্ষণ, সামরিক বিজ্ঞান, সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ দমন, মানবপাচার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবেলায় একসাথে কাজ করবে ঢাকা-কুয়ালালামপুর।

৭. রোহিঙ্গা সঙ্কট ও বৈশ্বিক ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থান

জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ সময় ধরে আশ্রয় দেয়ার জন্য বাংলাদেশের মানবিক উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেছে মালয়েশিয়া। নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের মাধ্যমে এই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধানে কুয়ালালামপুর তার দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্য দিকে আসিয়ান, ওআইসি এবং জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন ফোরামে মালয়েশিয়ার ধারাবাহিক ভূমিকার জন্য ধন্যবাদ জানায় বাংলাদেশ।

ফিলিস্তিন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নে দুই নেতা মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি জনগণের জন্য ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে অবস্থান পুনরুল্লেখ করেন। এ ছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় জাতিসঙ্ঘ ও ওআইসির অভ্যন্তরে আরো ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের বিষয়ে একমত হন।

সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার এবং বাংলাদেশী প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ আতিথেয়তা প্রদর্শনের জন্য মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং সে দেশের সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই সফর দুই দেশের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুন এক কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।