কামরুল-মেননের বিচার শুরু প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ড

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

  • জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিচার
  • মানবতাবিরোধী অপরাধ

জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য কামরুল ইসলাম ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিচারকার্য শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্য পেশ এবং মামলার প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী রেকর্ডের মধ্য দিয়ে এই জুডিশিয়াল প্রক্রিয়া শুরু হয়।

বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে মঙ্গলবার এই সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। তবে উভয়পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সাক্ষ্যগ্রহণ অসমাপ্ত রেখেই আদালত আগামী ২৯ জুন পর্যন্ত মামলার কার্যক্রম মুলতবি ঘোষণা করেছেন।

মঙ্গলবার সকালে কারাগার থেকে কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে অভিযুক্ত কামরুল ও মেননকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। এর আগে গত ৩০ এপ্রিল তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন আদালত। মঙ্গলবার শুনানির শুরুতে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ মামলার আনুষ্ঠানিক সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো পড়ে শোনান। এ সময় তিনি রাশেদ খান মেননকে জাসদ নেতা হিসাবে সম্বোধন করেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ। তিনি বলেন, রাশেদ খান মেনন কি জাসদ নেতা? জবাবে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ বলেন, এটা প্রিন্টিং মিসটেক। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে আরো উপস্থিত ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এম এইচ তামীম, মঈনুল করিম ও আবদুস সাত্তার পালোয়ানসহ অন্য প্রসিকিউটররা।

সূচনা বক্তব্য শেষে ট্রাইব্যুনালে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দেন চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে বাড্ডা এলাকায় সরাসরি অংশ নেয়া ২৬ বছর বয়সী এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। সুরক্ষার স্বার্থে আদালতে তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। জবানবন্দীতে সেই ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী বলেন, ‘১৬ জুলাই পুলিশের গুলিতে রংপুরের আবু সাঈদ ও চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরাম শহীদ হওয়ার পর দেশজুড়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮ জুলাই আমি বাড্ডা পোস্ট অফিস রোড ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে অংশ নিই। আমাদের আন্দোলন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও আমরা ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হই এবং পুলিশ আমাদের ওপর টিয়ার শেল ও ছররা গুলি ছোড়ে। পুলিশের ছররা গুলিতে ওই দিন অনেকেই আহত হন এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এক ছাত্রকে গুলি করে হত্যা করা হয়।’

আবেগঘন কণ্ঠে সাক্ষী ১৯ জুলাইয়ের ঘটনার বিবরণ দিয়ে বলেন, ‘জুমার নামাজের পর আমি, আমার বন্ধু মারুফ, তার মামা ফয়সাল ও রাজিব মিছিল নিয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে রামপুরা ব্রিজের দিকে এগোচ্ছিলাম। তখন রামপুরা ব্রিজের সামনে ব্যারিকেড দেয়া ছিল এবং সেদিকে যারা যাচ্ছিলেন, তাদেরই পুলিশ ও বিজিবিকে গুলি করতে দেখি। চোখের সামনে পাঁচজনকে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেছি। মাগরিবের ঠিক আগে রামপুরা ব্রিজের দিক থেকে আসা একটি গুলির বিকট শব্দে মারুফ রাস্তার পাশে ফুটপাথের ওপর পড়ে যায়। প্রথমে ভেবেছিলাম ধাক্কাধাক্কিতে পড়েছে, কিন্তু সামনে গিয়ে দেখি তার তলপেটের ডান পাশে গুলি লেগেছে। মারুফ তখন আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল ‘মামা আমার গুলি লেগেছে, আমাকে বাঁচাও’। এর পরপরই সে অচেতন হয়ে পড়ে।

সাক্ষী আরো বলেন, তার ক্ষতস্থান দিয়ে এত রক্ত বের হচ্ছিল যে আমি হাত দিয়ে চেপে ধরেও থামাতে পারছিলাম না। রক্তে আমার বাঁ হাতে থাকা ঘড়ি ও হাত সম্পূর্ণ ভিজে যায়, এমনকি ক্ষতস্থানের ভেতরে আমার ৩টি আঙুল ঢুকে গিয়েছিল। আমরা অনেক কষ্টে একটি অ্যাম্বুলেন্স ঠিক করে তাকে এ এম জেড হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে রক্তক্ষরণ বন্ধ না হওয়ায় চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। আমি, ফয়সালসহ কয়েকজন মিলি মারুফকে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যাই।

সাক্ষী এই কথা বলার পর আসামি পক্ষের আইনজীবী মুনমুন আপত্তি তোলে বলেন, মাননীয় আদালত সাক্ষী যেভাবে বলছেন। সেভাবে লিখা হচ্ছে না। বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ তখন বলেন, কি সঠিকভাবে লেখা হচ্ছে না সেটা বলেন। মুনমুন তখন বলেন, কোনো কিছুই সঠিকভাবে লিখা হচ্ছে না। বিচারক তখন বলেন, আপনি নির্দিষ্ট করে বলেন, যে এটা এইভাবে বলেছিল। কিন্তু লিখা হয়েছে ভিন্নভাবে? তখন মুনমুন বলেন, ওই যে শেষ লাইনটা। যেখানে সাক্ষী বলেছিল নিয়ে যাওয়ার পথে। কিন্তু আপনার ‘পথে’ শব্দটি বাদ দিয়েছেন। বিচারক তখন রাগান্বিত কণ্ঠে বলেন, চিফ আগে শিখবেন। তারপর অবজেকশন দেবেন। আপনি কত দিন আইনপেশায় প্র্যাকটিস করেন? জবাবে মুনমুন বলেন, ১৫ বছর। প্রথম তিন বছর নিম্ন আদালতে প্র্যাকটিস করেছি। তারপর ১২ বছর ধরে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করছি।

এর কিছুকক্ষণ পর আবার জবানবন্দী শুরু হয়। সাক্ষী বলেন, ঢাকা মেডিক্যালে যাওয়ার পথে রামপুরা ব্রিজের কাছে পুলিশ ও বিজিবির বাধার মুখে আমাদের প্রায় আধা ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়। একপর্যায়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ছেড়ে দেয়া হলেও আবুল হোটেল অতিক্রম করে শান্তিনগর ব্রিজে ওঠার আগেই মারুফ আমার বাম হাতের ওপর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।

ঢামেক হাসপাতালের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে জবানবন্দীতে বলা হয়, জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখি গুলিবিদ্ধ অনেক লাশ পড়ে রয়েছে এবং বহু আহত ব্যক্তি আসছেন। চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ইসিজি করার পর মারুফের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশ মর্গে নিয়ে যান। আমরা ময়নাতদন্ত করে লাশ নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ‘উপরের নির্দেশ’ রয়েছে জানিয়ে কর্তৃপক্ষ আমাদের লাশ বের করতে দেয়নি। পরে মারুফের বাবাকে হাসপাতালে রেখে আমরা বাসার উদ্দেশে রওনা দেই।

জবানবন্দীতে সেই শিক্ষার্থী রাত ১২টার দিকের একটি ভয়ঙ্কর ও আতঙ্কজনক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, তখন দেশজুড়ে কারফিউ জারি হয়ে গেছে। আমরা শিল্পকলা একাডেমির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় রমনা থানার সামনে পুলিশ ও বিজিবি আমাদের রিকশা আটকে দেয়। রিকশা থামিয়েই একজন পুলিশ সদস্য আমাদের দেখিয়ে তার অফিসারকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠেন ‘স্যার এদের গুলি করে দিই?’। এ কথা শুনে আমরা চরম আতঙ্কে শিউরে উঠি। তখন অন্য একজন সদস্য বলেন ‘না স্যার, এদের ছেড়ে দেই’। এরপর মালিবাগ রেল ক্রসিংয়ে থাকা অবস্থায় রামপুরার দিক থেকে আবারও গুলির শব্দ শুনতে পাই। প্রাণভয়ে আমরা খিলগাঁও হয়ে বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালের সামনে যাই এবং সেখান থেকে একটি ব্রিজ পার হয়ে আফতাবনগর দিয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে বাসায় ফিরি ।

প্রসিকিউশনের দায়েরকৃত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোটের শীর্ষ পদে থেকে শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কামরুল ইসলাম ও রাশেদ খান মেনন বিভিন্ন উসকানি দিয়েছিলেন। তারা নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর মারণাস্ত্র ব্যবহার ও সান্ধ্যআইন (কারফিউ) জারির প্ররোচনা দেন। তাদের ধারাবাহিক নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ষড়যন্ত্রের ফলেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, যার পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর বাড্ডা ও আশপাশ এলাকায় অন্তত ২৩ জন নিহত এবং অসংখ্য মানুষ আহত হন।