হাসিনাকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়া হবে : চিফ প্রসিকিউটর

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

  • শামীম ওসমানকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ
  • রামপুরা মামলার রায়ের ধার্য দিনে সময় প্রার্থনা, প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা
  • জয়-পলকের মামলায় প্রথম সাক্ষ্য শেষ

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একটি মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে গতকাল বুধবার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, ‘নতুন সরকার এলো। আপনি নতুন দায়িত্ব নিলেন। শেখ হাসিনাকে ফেরানোর ব্যাপারে আপনার দিক থেকে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কি না।’ এর জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা উদ্যোগ নেবো। তাকে আনার জন্য আমরা যথাযথ উদ্যোগ নেবো।’

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনা ভারতে আছেন বলে তারা জানেন। তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। তাকে ফেরত আনাটা আইনগত ব্যাপার। নিশ্চয়ই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ তারা নেবেন। আরেকজন সাংবাদিক বলেন, প্রসিকিউশন তো আগে উদ্যোগ নিয়েছে। সেটার অগ্রগতি কত দূর? এর জবাবে আমিনুল ইসলাম বলেন, সেটা তিনি এখনো জানেন না।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। তার পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা হয়। গত বছরের ১৭ নভেম্বর সেই মামলার রায়ে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। আর এ মামলার ‘অ্যাপ্রুভার’ (রাজসাক্ষী) পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে গুম-খুনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা ট্রাইব্যুনালে চলমান।

মামলার রায়ের ধার্য দিনে সময় প্রার্থনা, প্রসিকিউশনের ব্যাখ্যা

এ দিকে গতকাল বুধবার জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরা এলাকায় দুইজনকে গুলি করে হত্যা এবং দুইজনকে গুরুতর আহত করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার দিন ধার্য ছিল। তবে বুধবার প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) নতুন ডিজিটাল প্রমাণ দাখিলের জন্য চার সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করেছে। বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-১ তা মঞ্জুর করে ৯ এপ্রিল পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ এবং মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

পরে সাংবাদিকদের কাছে রায় ঘোষণা পেছানোর কারণ ব্যাখ্যা করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, মামলার যেকোনো পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বাদ পড়ে গেলে তা অ্যাডিশনাল এভিডেন্স হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ রয়েছে প্রসিকিউশনের। ট্রাইব্যুনাল আইনই এ সুযোগ দিয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে যোগদানের পর আমি প্রত্যেকটি মামলা আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। যেসব মামলার তদন্ত সঠিকভাবে হয়েছে বলে মনে হচ্ছে, সেগুলো নিজ নিজ প্রসিকিউটরদের সেভাবে চালানোর নির্দেশ দিচ্ছি। যেগুলোর তদন্ত মনে হচ্ছে আবারও হওয়া উচিত, সেগুলো সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিচ্ছি। তিনি বলেন, মামলাটি আমার যোগদানের আগেই রায়ের জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মামলাটি পর্যালোচনা করতে গিয়ে দেখি আসামি চঞ্চল চন্দ্র সরকারের একটি ভিডিও রেকর্ডিং রয়েছে, যেখানে তিনি কীভাবে গুলি করেছেন, কার নির্দেশে করেছেন- সে সব বিষয়ে সরাসরি স্বীকার করছেন। অত্যন্ত শক্তিশালী এই প্রমাণটি এভিডেন্সে আনা হয়নি। এ জন্য এটি আমাদের দেয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিষয়টি সম্প্রতি নজরে এসেছে। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে ট্রাইব্যুনালের কাছে আবেদন করা হয়েছে, যেন ভিডিওটি মামলায় সংযুক্ত করে উপস্থাপন করা যায়। এ জন্য চার সপ্তাহ সময় চাওয়া হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছেন। শুরু থেকেই সাক্ষ্যগ্রহণের প্রয়োজন হবে কি না জানতে চাইলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সাক্ষ্যগ্রহণ প্রয়োজন হবে না। এটা আমরা যদি টেন্ডার করি, তা হলে সরাসরি এভিডেন্সে দিতে পারবো। ডিফেন্সকে শুধু আমাদের নোটিশ দিলেই হবে। গাফিলতি কি না সাংবাদিকদের প্রশ্নে আমিনুল ইসলাম বলেন, এটা গাফিলতি নয়। ত্রুটি-বিচ্যুতি হতে পারে। এভিডেন্সটা হয়তো তখন ছিল না। যেহেতু বিষয়টি আমার কাছে আসছে, এ জন্য তাৎক্ষণিকভাবে মনে হলো এভিডেন্সটা উপস্থাপন করা প্রয়োজন। এ মামলায় মোট আসামি পাঁচজন। এর মধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন রামপুরা পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার। তাকে আজ সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পলাতকরা হলেন- ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, খিলগাঁও জোনের সাবেক এডিসি মো: রাশেদুল ইসলাম, রামপুরা থানার সাবেক ওসি মো: মশিউর রহমান ও রামপুরা থানার সাবেক এসআই তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্দোলন চলাকালীন প্রাণ বাঁচাতে রামপুরার বনশ্রী-মেরাদিয়া সড়কের পাশে থাকা একটি নির্মাণাধীন ভবনে ওঠেন আমির হোসেন নামের এক তরুণ। ওই সময় পুলিশ সদস্যরাও তার পিছু পিছু যান। একপর্যায়ে ছাদের কার্নিশের রড ধরে ঝুলে থাকলেও তার ওপর ছয় রাউন্ড গুলি ছোড়েন এক পুলিশ সদস্য। এতে গুরুতর আহত হন তিনি। এ ছাড়া একই দিন বনশ্রী এলাকায় পুলিশের গুলিতে মারা যান নাদিম ও মায়া ইসলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর হাবিবসহ পাঁচ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। একই বছরের ৭ আগস্ট ফর্মাল চার্জ দাখিল করে প্রসিকিউশন।

শামীম ওসমানকে হাজিরে বিজ্ঞপ্তির নির্দেশ

এ দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সাইনবোর্ড এলাকায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামিকে হাজির হতে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের খুঁজে না পাওয়ায় আদালত এই আদেশ দেন। একই সাথে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৫ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। বুধবার ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই আদেশ দেন। আদালতে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর তারেক আবদুল্লাহ। তিনি আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির অগ্রগতি নিয়ে আদালতকে অবহিত করেন। প্রসিকিউটর জানান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আসামিদের স্থায়ী ও অস্থায়ী ঠিকানায় গিয়ে তাদের খুঁজে পাননি। এই প্রেক্ষাপটে ১২ আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজিরের নির্দেশ দিয়ে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের অনুমতি চাওয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল আবেদন মঞ্জুর করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন। এই মামলার অন্যতম প্রধান আসামি শামীম ওসমান ও তার ছেলে অয়ন ওসমান। মামলার বাকি ১০ আসামির নাম এখনো প্রকাশ করেনি প্রসিকিউশন। এর আগে, গত ১৯ জানুয়ারি এই ১২ জনের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল-১ এবং তাদের নামে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা-সাইনবোর্ড এলাকায় ১০ জনকে হত্যা করা হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে অভিযুক্ত আসামিরা সবাই অস্ত্রধারী ছিলেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে শামীম ওসমানসহ ১২ জনকে আসামি করে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগ আনা হয়।

জয়-পলকের মামলায় প্রথম সাক্ষ্য শেষ

একই দিন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যাযজ্ঞের দায়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় ও সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দী ও জেরা শেষ হয়েছে।

ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়। প্যানেলের বাকি সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো: মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। প্রথম সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা। এ সংক্রান্ত তথ্যপ্রমাণ কিংবা আলামত কবে, কখন, কোথায় থেকে জব্দ করেছেন তা ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেন। এ ছাড়া জয় ও পলকের ফোনালাপসহ অন্যান্য ডিজিটাল এভিডেন্স কীভাবে পেয়েছেন, সে সবের বিবরণ দেন। পরে আসামি পলকের পক্ষে জোহাকে জেরা করেন আইনজীবী আমিনুল গণি টিটো ও জয়ের পক্ষে করেন স্টেট ডিফেন্স আইনজীবী মনজুর আলম। জেরায় আমিনুল গণির প্রশ্নে জোহা বলেন, নিজেদের সার্ভার থেকে এ মামলা সংক্রান্ত রেকর্ড দিয়েছে এনটিএমসি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা হওয়ার আগে আমি সরকারের আইসিটি বিভাগের অধীনে একটি প্রকল্পে প্রশিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলাম।

পলকের ভয়েস সংক্রান্ত কোনো অডিও-ভিডিও বা মোবাইল ফোন জব্দ করেছেন কি না- আইনজীবীর প্রশ্নে না সম্বোধন করেন বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমি সরাসরি জব্দ করিনি। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কল রেকর্ড জব্দ করেছি। তাদের কথোপকথনের মধ্যে বি-পার্টি হিসেবে পলকের ভয়েস রয়েছে। এ ছাড়া পলকসহ এ মামলার সব ভয়েসের ফরেনসিক পরীক্ষা করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তানভীর হাসান জোহা কখনো ডিজিএফআই বা এসবিতে ছিলেন কি না জানতে চান আইনজীবী টিটো। জবাবে ছিলেন না বলে জানান তিনি। জেরা শেষে পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য আগামী ১০ মার্চ দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, সুলতান মাহমুদ, গাজী এম এইচ তামিমসহ অন্যরা।