বর্ষায় আবারো ভাঙন আতঙ্কে উপকূলবাসী

দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে দুশ্চিন্তায় শ্যামনগর ও আশাশুনিবাসী

Printed Edition

মুহা: জিললুর রহমান সাতক্ষীরা

প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলার মানুষের মনে। দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন এবং জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা এ অঞ্চলের মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। চলতি বর্ষার আগমনে আবারো সেই পুরনো শঙ্কা ফিরে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধের অন্তত ৪০ পয়েন্টে ভাঙন ও ফাটল দেখা দিয়েছে, যা এলাকাবাসীর মধ্যে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আশাশুনিতে মরিচ্চাপ নদীর উপর নির্মিত তেঁতুলিয়া সেতুর পাড়ে ভাঙন দেখা দেয়ায় সেতুটিও এখন হুমকির মুখে পড়েছে। নদীতে পানি বাড়লে ভাঙন আরো তীব্র হবে বলে শঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। এরই মধ্যে আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের কুড়িকাউনিয়া, হরিষখালী ও চাকলা এলাকায় বেড়িবাঁধের একাধিক পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে আনুলিয়া ইউনিয়নের কাকবাসিয়া খেয়াঘাট ও বিছট গ্রামের বিভিন্ন স্থানেও। একই চিত্র শ্যামনগরের গাবুরা, পদ্মপুকুর, বুড়িগোয়ালিনী, আটুলিয়া, নওয়াবেকি, হরিনগর, রমজাননগর ও মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়নেও। শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী ও পদ্মপুকুর এলাকার বাসিন্দারা জানান, বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড় মৌসুম সামনে রেখে তারা চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বহু স্থানে নদীর তীর ধসে পড়ছে, বাঁধের পাদদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব বাঁধ ভেঙে গেলে বিশাল এলাকা লোনা পানিতে প্লাবিত হয়ে যাবে, যা লবণাক্ততা বাড়িয়ে কৃষি ও মিঠাপানির সঙ্কটকে ঘনীভূত করবে।

আশাশুনির গোয়ালডাঙ্গা এলাকার আবদুল্লাহ বলেন, ‘গোয়ালডাঙ্গা বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মরিচ্চাপ নদী। সম্প্রতি নদীভাঙনে বাজার এলাকা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এখানে যেনতেন বাঁধ নয়, টেকসই বাঁধ দিতে হবে।’ প্রতাপনগরের মাওলানা রিয়াছাত আলী বলেন, ‘কপোতাক্ষের ভাঙনে আমরা বহু বছর আগে বসতভিটা হারিয়েছি। এখন যে এলাকায় আশ্রয় নিয়েছি, সেখানেও বাঁধ ভাঙতে ভাঙতে বাড়ির কাছে চলে এসেছে।’

জানা গেছে, সাতক্ষীরা পাউবোর দু’টি বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন পোল্ডারে প্রায় ২০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের ৪০টি স্থান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো: আশরাফুল আলম জানান, তার বিভাগের অধীনে ৩৮৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের পাঁচ কিলোমিটারের ১৫টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সংস্কারকাজ চলছে।

সাতক্ষীরা পাউবো বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া বলেন, ‘আশাশুনির প্রতাপনগর ও আনুলিয়া এবং শ্যামনগরের পদ্মপুকুর ইউনিয়নের ১৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর মধ্যে পাঁচ কিলোমিটারে সংস্কারকাজ চলছে, বাকি ১০.৮৮ কিলোমিটারের জন্য বরাদ্দ পেলে সেখানেও কাজ শুরু হবে।’

এলাকাবাসীর দাবি, বর্ষার পূর্ণ মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ সব পয়েন্টে জরুরি সংস্কার ও টেকসই বাঁধ নির্মাণ করা হোক। অন্যথায় প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে অস্থায়ী সংস্কারে সরকারি অর্থ অপচয় হবে বলে মনে করছেন তারা।

সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনের সংসদ সদস্য মুক্তিযোদ্ধা গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘শ্যামনগর উপজেলার ১২টি ইউনিয়নের মধ্যে ৯টিই নদীবেষ্টিত উপকূলীয় অঞ্চল। সিডর, আইলা, আমফানের মতো ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানির ঘটনা এখানে বারবার ঘটছে। টেকসই বেড়িবাঁধ না থাকায় দুর্যোগ মোকাবেলায় উপকূলবাসী চরম অসহায়। মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে নদী ও সাগরতীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে এ জনপদের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।’