মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধাবস্থা

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে আবারো যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। ওয়াশিংটন ইরানের সামরিক ও নৌ সক্ষমতার ওপর ব্যাপক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর পর পাল্টা জবাবে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলার দাবি করেছে। ফলে গত মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে; আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দুই সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। খবর এএফপি, রয়টার্স, বিবিসি ও আলজাজিরার।

যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইরানের তেল রফতানির ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সুবিধা প্রত্যাহার করে। ওয়াশিংটনের দাবি, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জবাব হিসেবেই এ সামরিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, হরমুজ প্রণালীর উপকূলবর্তী এলাকায় একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। কেশম দ্বীপে অন্তত ছয়টি, সিরিক এলাকায় সাতটি এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের আশপাশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।

অপর দিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আইআরআইবিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি দাবি করেছে, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা নিশ্চিত করেনি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, অভিযানে ইরানের ৮০টিরও বেশি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর মধ্যে ছিল আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় রাডার কেন্দ্র, ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামো এবং আইআরজিসির প্রায় ৬০টি দ্রুতগতির নৌযান। সেন্টকমের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক নৌপথে হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা দুর্বল করাই ছিল অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।

ইরানের প্রধান আলোচক ও পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক ‘গুরুতরভাবে লঙ্ঘন’ করেছে। তিনি বলেন, ইরানের তেল রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল, দক্ষিণ ইরানে হামলা এবং ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থনের মাধ্যমে ওয়াশিংটন চুক্তির মৌলিক শর্ত ভঙ্গ করেছে।

কালিবাফ বলেন, ‘ধমক ও চাপ প্রয়োগের যুগ শেষ। ইরান কখনোই জবরদস্তির কাছে নতি স্বীকার করবে না।’

বুধবার ভোরে বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কুয়েতের সশস্ত্রবাহিনী জানায়, সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হুমকির কারণে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছিল। তবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, হরমুজ প্রণালীতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা ওয়াশিংটনের কাছে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। তবে সামরিক উত্তেজনার মধ্যেও আলোচনার পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর কাছে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার পর আগুন ধরে যায়। পরে আরো দু’টি জাহাজ হামলার শিকার হয়, যার অন্তত একটিতে ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।

সেন্টকমের তথ্য মতে, আক্রান্ত জাহাজগুলোর মধ্যে ছিল মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী আল-রেকাইয়াত, সৌদি আরবের পতাকাবাহী ওয়েদিয়ান এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী সাইপ্রাস প্রসপারিটি। তিনটি জাহাজই ওমান উপকূলের কাছে হামলার শিকার হয়।

কাতার আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে ইরানের উপরাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা এক বিবৃতিতে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তেহরান আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা বিঘিœত করতে চায় না।

নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর বুধবার এশিয়ার লেনদেনের শুরুতেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ২ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ বলেন, বর্তমানে হরমুজ প্রণালীর বিকল্প নৌপথ নিয়ে আলোচনা চললেও ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কোনো বিকল্প ব্যবস্থাকে তারা সহজে মেনে নেবে না। তার মতে, সাম্প্রতিক হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না এবং বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রফতানির ওপর আরোপিত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ওই সমঝোতার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এ দিকে আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘ইরানের সাথে যুদ্ধবিরতি কার্যত শেষ। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার মাধ্যমে তারা সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। এখন আগের মতো আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কোনো অর্থ নেই।’

উপসাগরে প্রায় ৬ হাজার নাবিক আটক

আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গেজ জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে শত শত জাহাজে কর্মরত প্রায় ৬ হাজার নাবিক এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। তিনি সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন এবং বেসামরিক নৌপরিবহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘শুধু নিজের দায়িত্ব পালন করার কারণে কোনো নাবিকের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়া উচিত নয়।’ তিনি পতাকাবাহী রাষ্ট্র, জাহাজের মালিক ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের আহ্বান জানান।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।