এস আলম গ্রুপের একক আধিপত্য ও খাতের ঝুঁকি

ইসলামী ব্যাংকের ২৪ কোম্পানির আড়ালে প্রকৃত মালিকানা প্রশ্নবিদ্ধ

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক সময় তারল্য ও আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। তবে গত কয়েক বছরে দেশের বৃহত্তম এই বেসরকারি ব্যাংকটি নজিরবিহীন অনিয়ম, নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা এবং মালিকানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ- দেশের পুরো আর্থিক খাতকে গভীর সঙ্কটে ফেলেছে।

আশরাফুল ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এক সময় তারল্য ও আস্থার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত ছিল ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। তবে গত কয়েক বছরে দেশের বৃহত্তম এই বেসরকারি ব্যাংকটি নজিরবিহীন অনিয়ম, নীতিনির্ধারণী দুর্বলতা এবং মালিকানা বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং বিপুল অর্থ সরিয়ে নেয়ার অভিযোগ- দেশের পুরো আর্থিক খাতকে গভীর সঙ্কটে ফেলেছে।

আইন লঙ্ঘনের মহোৎসব : ৫ শতাংশের সীমা বনাম ৮২ শতাংশের নিয়ন্ত্রণ

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে একটি ব্যাংকের মোট শেয়ারের ৫ শতাংশের বেশি ধারণ করতে পারে না। ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা এবং একক আধিপত্য ঠেকানোই এই আইনের মূল লক্ষ্য। তবে অভিযোগ উঠেছে, এস আলম গ্রুপ সরাসরি নিজেদের নামে শেয়ার না রেখে ২৪টি বেনামী কোম্পানির মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের প্রায় ৮২ শতাংশ শেয়ারের নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করেছে। এই কৌশলগত জটিলতাকে আর্থিক পরিভাষায় ‘লেয়ারিং’ বলা হয়, যার মাধ্যমে প্রকৃত মালিকানা আড়াল করে কৌশলে আইন ফাঁকি দেয়া হয়েছে।

২৪টি ‘শেল’ কোম্পানি : আড়ালে কারা?

তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২৪টি রহস্যময় কোম্পানি- যার মধ্যে ২২টি স্থানীয় এবং ২টি বিদেশী। প্রশ্ন উঠেছে এই কোম্পানিগুলোর প্রকৃত স্বত্বা নিয়ে। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই বাস্তবে কোনো কার্যকর ব্যবসা বা উৎপাদন নেই; এগুলো মূলত ‘শেল কোম্পানি’ বা কাগুজে প্রতিষ্ঠান। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব কোম্পানির প্রকৃত মালিকদের কখনোই ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দেখা যায়নি। বরং তাদের বদলে মনোনীত প্রতিনিধিদের পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যদি এসব প্রতিষ্ঠান সত্যিকার অর্থেই স্বতন্ত্র ও ব্যবসায়িক হতো, তবে তাদের প্রকৃত উদ্যোক্তাদের পর্ষদে উপস্থিতি থাকার কথা ছিল। এই অনুপস্থিতিই প্রমাণ করে যে, এগুলো এস আলম গ্রুপের হয়ে কাজ করা ‘ছায়া’ প্রতিষ্ঠান মাত্র।

১০ লাখ টাকার মূলধন বনাম হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ

২২টি স্থানীয় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কোম্পানির অধিকাংশেরই পরিশোধিত মূলধন মাত্র ১০ লাখ টাকা। অথচ এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমেই ইসলামী ব্যাংকের ৫০০ কোটি থেকে ২ হাজার কোটি টাকার শেয়ার কেনা হয়েছে। ১০ লাখ টাকার পুঁজি নিয়ে কিভাবে হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সম্ভব, তার কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মেলেনি। এটি স্পষ্ট নির্দেশ করে যে, এসব বিনিয়োগের অর্থের উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং সম্ভবত অবৈধ উপায়ে সংগৃহীত।

আয়কর ফাঁকি ও অপ্রদর্শিত অর্থের ব্যবহার

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের শেয়ার কিনতে চাইলে সেই অর্থের বৈধতা এবং আয়কর নথিতে তার প্রতিফলন থাকা বাধ্যতামূলক। অভিযোগ রয়েছে, উল্লিখিত ২৪টি কোম্পানির আয়কর নথিতে এই বিপুল বিনিয়োগের কোনো তথ্য নেই। এর দু’টি অর্থ হতে পারে: হয় অঘোষিত ‘কালো টাকা’ ব্যবহার করে শেয়ার কেনা হয়েছে, অথবা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবহার করে বেনামী মালিকানা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। উভয় ক্ষেত্রেই এটি মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও আর্থিক শৃঙ্খলার গুরুতর লঙ্ঘন।

চট্টগ্রামভিত্তিক নেটওয়ার্ক ও ব্রোকারেজ সংযোগ

সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর প্রায় সবক’টিই চট্টগ্রামে নিবন্ধিত। আরো একটি উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব শেয়ার কেনা হয়েছে একটি নির্দিষ্ট ব্রোকারেজ হাউজের মাধ্যমে, যা এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট। শেয়ার কেনা থেকে শুরু করে মালিকানা গোপন রাখা- পুরো প্রক্রিয়াটি যে একটি সুসংগঠিত এবং পূর্বপরিকল্পিত নকশার অংশ ছিল, তা এই যোগসূত্রগুলো থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়।

পর্ষদ নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণী সঙ্কট

বেনামী শেয়ারের শক্তিতে এস আলম গ্রুপ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে নিজেদের নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর ফলে ব্যাংকের ঋণ অনুমোদন, বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থ বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি থাকায় ব্যাংকটি কার্যত একটি শিল্পগোষ্ঠীর পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

তারল্য সঙ্কট ও আমানতকারীদের ঝুঁকি

সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগটি হলো ব্যাংক থেকে অর্থ বের করে নেয়ার প্রক্রিয়া। বিভিন্ন বেনামী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ সৃষ্টি, অযোগ্য প্রকল্পে বিনিয়োগ এবং পুনঃতফসিলের আড়ালে ইসলামী ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। এর ফলে এক সময় উদ্বৃত্ত তারল্যের অধিকারী ব্যাংকটি বর্তমানে চরম তারল্য সঙ্কটে ভুগছে। আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণ আদায়ের হার আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাওয়ায় ব্যাংকের সামগ্রিক সক্ষমতা আজ প্রশ্নের মুখে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার রহস্যজনক নীরবতা

এত বড় মাপের শেয়ার দখল এবং আইনের লঙ্ঘন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর নজর এড়িয়ে কিভাবে বছরের পর বছর চলতে পারল, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থার তদারকি ও নজরদারির অভাব বা শৈথিল্যই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির পথ প্রশস্ত করেছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। সময়োচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে একটি জাতীয় সম্পদকে এমন ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা করা সম্ভব হতো।

উত্তরণের পথ : ভবিষ্যৎ করণীয়

ইসলামী ব্যাংককে পূর্বের গৌরবে ফিরিয়ে নিতে কয়েকটি কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য : ১. ফরেনসিক অডিট : বেনামী কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থের উৎস চিহ্নিত করতে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক সংস্থা দিয়ে তদন্ত করতে হবে। ২. মালিকানা পুনর্গঠন : আইন বহির্ভূতভাবে অর্জিত শেয়ার বাজেয়াপ্ত বা পুনঃবণ্টনের মাধ্যমে পর্ষদে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে হবে। ৩. আইনি ব্যবস্থা : যারা জালিয়াতি ও অর্থ আত্মসাতের সাথে জড়িত, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। ৪. পেশাদারিত্ব নিশ্চিতকরণ : রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত হয়ে পেশাদার ব্যাংকারদের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠন করতে হবে।

ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের বিপর্যয় নয়, এটি বাংলাদেশের পুরো ব্যাংকিং খাতের তদারকি ব্যবস্থার ব্যর্থতার দর্পণ। এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে ওঠা এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করে যে, আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকলে কিভাবে একটি সবল ব্যাংকও ধসে পড়তে পারে। এখন সময় এসেছে নির্মোহ সংস্কার ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের, যাতে ভবিষ্যতে কোনো গোষ্ঠী সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে এমন ‘জুয়া’ খেলার সাহস না পায়। স্বচ্ছতা ও আইনের শাসনই পারে এই ধ্বংসপ্রায় প্রতিষ্ঠানকে পুনরুজ্জীবিত করতে।