বিশেষ সংবাদদাতা
চলতি বছরের ডিসেম্বরে প্রথম ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর পরিকল্পনা নির্বাচন কমিশনের। আগামী সেপ্টেম্বরেই ভোটের তফসিল দিতে হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, ২০২১ সালের জুনে ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন হয়েছে, আইনিভাবে সেগুলোর নির্বাচন আগে দিতে হবে। নির্বাচন আয়োজনে প্রস্তুতিগত ঘাটতি নেই। আচরণবিধি-সংক্রান্ত প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয় থেকে এসেছে। প্রয়োজনীয় ম্যানুয়াল তৈরি হচ্ছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। সেপ্টেম্বরেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উপনির্বাচনে পোস্টাল ব্যালটে ভোটের ব্যবস্থা থাকছে। বৃহস্পতিবার এক ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য দেন সিইসি। সকালে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে এই ব্রিফিং করেন তিনি।
সেপ্টেম্বরেই তফসিলের লক্ষ্য
সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, তফসিল ঘোষণা করলেই যে সব নির্বাচন চলতি বছরের মধ্যে শেষ হবে, তা নয়। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী এ বছরের মধ্যেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে হবে; ভোটের একটি অংশ বছরের শেষ দিকে এবং প্রয়োজনে কিছু নির্বাচন পরবর্তী বছরের শুরুতেও গড়াতে পারে। কারণ দুর্গাপূজা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরীক্ষা, আবহাওয়া, রমজানসহ বেশ কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের সময় নির্ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, একই সাথে ঠাকুরগাঁও-১ জাতীয় সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন ৯০ দিনের মধ্যে শেষ করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে উপনির্বাচনের সময়সূচি এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপের ভোট যাতে একই সময়ে পড়ে না যায়, সেটিও বিবেচনা করছে কমিশন। তিনি বলেন, এর আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোও ছয় ধাপে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ফলে তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত সময়, আইনগত বাধ্যবাধকতা এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি- সবকিছু একসাথে বিবেচনা করতে হচ্ছে।
প্রথম অগ্রাধিকার ২০২১ সালের ৩৭১ ইউপি
সিইসি বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রথম ধাপে কোন এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে, এ বিষয়ে কমিশনের একটি স্পষ্ট আইনি হিসাব রয়েছে। প্রথম ধাপে ২০২১ সালের ১০ জুন ৩৭১টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মেয়াদ ও আইনগত প্রয়োজনীয়তার বিবেচনায় এসব ইউনিয়ন পরিষদকে প্রথম দিকের নির্বাচনের তালিকায় রাখতে হবে। তিনি বলেন, এসব ইউনিয়ন পরিষদ একই ভৌগোলিক অঞ্চলে অবস্থিত নয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা এসব ইউপির নির্বাচন আলাদা আলাদা পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা ও ভোটকেন্দ্রে যাতায়াতে সমস্যা তৈরি হতে পারে, সেখানে অনুকূল মৌসুমে ভোট হবে। তিনি বলেন, ভোটারদের সুবিধার জন্যে শুষ্ক মৌসুমকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য বেশি উপযোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনেও ৯০ দিনের হিসাব
নাসির উদ্দিন বলেন, সংবিধান নির্ধারিত ৯০ দিনের সময়সীমার মধ্যে এই আসনে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই আসনের সংসদ সদস্য রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি ছেড়ে দিলে শূন্য ঘোষণা করে সংসদ সচিবালয়।
তিনি বলেন, এখানেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সাথে সময়সূচির সমন্বয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনের সময় ওই এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হলে একই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক জনবল ও নির্বাচন পরিচালনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। তাই কমিশন কোনো নির্বাচন যাতে আরেকটির সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, সেই হিসাবেই এগোতে চাইছে।
ভোটের সময় নির্ধারণে যত বাধা
সিইসি নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে কমিশনের সামনে শুধু প্রশাসনিক প্রস্তুতিই নয়, রয়েছে একাধিক বাস্তব সমস্যা। এর মধ্যে অন্যতম দুর্গাপূজা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় শত শত পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্য মোতায়েন করতে হয়। একই সময়ে নির্বাচন আয়োজন করলে নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, এরপর রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুলসংখ্যক স্কুল-কলেজ ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সাথে এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোট গ্রহণের দায়িত্বেও নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি বলেন, কমিশন এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা করে পরীক্ষার সময়সূচি কিছুটা সমন্বয়ের চেষ্টা করবে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জানান, বর্ষাকালে দেশের অনেক এলাকায় সড়ক ও নৌযোগাযোগে সমস্যা হয়। বিশেষ করে দুর্গম ইউনিয়নগুলোতে ভোটার ও নির্বাচনী সরঞ্জাম কেন্দ্রে নেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কমিশন অনুকূল আবহাওয়ার সময়কে অগ্রাধিকার দিতে চায়।
রমজানও বড় বাস্তবতা
এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, চলতি বছরের শেষ দিকে নির্বাচন শুরু করা হলেও সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করার জন্য সময় খুবই সীমিত। কারণ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির দিকে রমজান শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রমজানের আগে যদি নির্বাচন শেষ করা সম্ভব না হয়, তাহলে পরবর্তী সময়ে ঈদ, গরম ও বর্ষাকালসহ একের পর এক বাস্তব সমস্যা সামনে আসবে। ফলে নির্বাচন কমিশনের হাতে সঙ্কুচিত সময়সীমা রয়েছে। এই কারণেই কমিশন সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরু করতে চাইছে।
পোস্টাল ব্যালটেও নতুন পরিকল্পনা
সিইসি বলেন, ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রবাসী ভোটারদের বিষয়টিও বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে। আসনটিতে ভোটারের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে সীমিত হওয়ায় পরীক্ষামূলকভাবে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থায় প্রবাসী ভোটারদের ভোট দেয়ার সুযোগ থাকছে। জাতীয় নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে উপনির্বাচনেও এ পদ্ধতি প্রয়োগের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কমিশনের লক্ষ্য শুধু একটি নির্বাচন আয়োজন করা নয়, বরং ভবিষ্যতের নির্বাচনেও যাতে এই ব্যবস্থাপনা ব্যবহার করা যায়, সে জন্য কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও ম্যানুয়াল তৈরির কাজও চলছে।
নিরাপত্তায় প্রয়োজনে সেনাবাহিনী
সিইসি নাসির উদ্দিন সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় নির্বাচনেও আইনশৃঙ্খলা সমন্বয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কমিশনারকে দেয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়া হবে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির সাথে আলাদা কোনো নির্দিষ্ট আলোচনা হয়নি। তবে প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেয়ার সুযোগ রয়েছে।
এনআইডি জালিয়াতি ঠেকাতেও সতর্ক ইসি
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সিইসি জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধন নিয়েও সতর্ক রয়েছে কমিশন। ২০২০ সালে মৃত ব্যক্তির নামে মুখমণ্ডল যাচাইয়ের মাধ্যমে এনআইডি সংশোধনের আবেদন করার ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ঘটনার তদন্ত চলছে। এনআইডি-সংক্রান্ত জালিয়াতি শুধু নির্বাচন কমিশনের একক সমস্যা নয়, তবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে এমন প্রতারণা ঠেকাতে তারা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।
‘ভোটার সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি
এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কমিশনের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ভোটারের অধিকার। নির্বাচনের প্রতিটি পর্যায়ে ‘ভোটার সার্বভৌমত্ব’ প্রতিষ্ঠা করা হবে। তার ভাষায়, জাতীয় নির্বাচনে যে পেশাদারিত্ব, নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার মানদণ্ড বজায় রাখার চেষ্টা করা হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হবে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত যেন বিশ্বাসযোগ্য হয়, সেটিই কমিশনের লক্ষ্য।



