নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে ইসরাইলের হামলা অব্যাহত
- আরো ১ বন্দীর লাশের বিনিময়ে ১৫ ফিলিস্তিনির লাশ হস্তান্তর
- পশ্চিমতীরে অবৈধ সেটেলারদের রেকর্ড ২৬৪টি হামলা
- ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ ছিল মার্কিন গোয়েন্দাদের হাতে
গাজায় জাতিগত হত্যার অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়াামিন নেতানিয়াহু ও শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে তুরস্ক। গত শুক্রবার ইস্তাম্বুলের প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়, ৩৭ জন সন্দেহভাজনের তালিকায় রয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কার্ৎজ, জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গাভির ও সেনাপ্রধান আইয়াল জামির।
তুরস্ক অভিযোগ করেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল গাজায় ধারাবাহিকভাবে জাতিগত হত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ২০২৩ সালের ১৭ অক্টোবর আল-আহলি ব্যাপটিস্ট হাসপাতালে হামলায় ৫০০ জন নিহত হন, ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি সেনারা চিকিৎসার সরঞ্জাম ধ্বংস করে এবং গাজাকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
তুরস্ক-ফিলিস্তিন ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালেও ইসরাইল হামলা চালায়। ইসরাইল এই পদক্ষেপকে ‘প্রচারণার কৌশল’ বলে অভিহিত করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, ইসরাইল ঘৃণাভরে তুরস্কের প্রচারণা প্রত্যাখ্যান করেছে। হামাস তুরস্কের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে, এটি তুর্কি জনগণ ও নেতাদের মানবিক অবস্থান নিশ্চিত করে।
এর এক বছর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। এ ছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিগত হত্যার অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা করে, যেখানে তুরস্কও যুক্ত হয়। গাজা যুদ্ধে ইসরাইল অন্তত ৬৮ হাজার ৮৭৫ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং আহত হয়েছে এক লাখ ৭০ হাজারের বেশি।
ইসরাইলি হামলা অব্যাহত : এ দিকে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। গতকাল শনিবার হাসপাতাল সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, মধ্যাঞ্চলের গাজার বুরেইজে শরণার্থীশিবিরে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর গুলিতে একজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মার্কিন মধ্যস্থতায় গত ১০ অক্টোবর থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় ২৪০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে।
আরো বন্দীর লাশ বিনিময় : ফিলিস্তিনি সংগঠন ইসলামিক জিহাদ গত শুক্রবার গাজা যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে এক বন্দীর লাশ হস্তান্তর করেছে। গতকাল শনিবার ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, শনাক্তকরণের পর নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এটি লিওর রুদায়েফের লাশ। রেড ক্রসের মাধ্যমে লাশটি ইসরাইলি বাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয়। ইসলামিক জিহাদ জানায়, লাশটি পাওয়া গেছে খান ইউনুসে। এর বিপরীতে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় রেড ক্রসের মাধ্যমে ইসরাইল থেকে আরো ১৫ জন ফিলিস্তিনির লাশ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় হামাস ২০ জীবিত বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে, বিনিময়ে ইসরাইল দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দীকে মুক্তি দিয়েছে। চুক্তিতে বলা হয়, ২৮ জন মৃত বন্দীর লাশ ফেরত দেয়া হবে- বিনিময়ে ইসরাইল ৩৬০ জন নিহত ফিলিস্তিনি যোদ্ধার লাশ ফেরত দেবে। এখন পর্যন্ত গাজা থেকে ২৩ জন বন্দীর লাশ ফেরত দেয়া হয়েছে এবং বিনিময়ে ৩০০ জন ফিলিস্তিনির লাশ হস্তান্তর করেছে ইসরাইল।
সাহায্যপণ্য সরবরাহে বিধিনিষেধ : এ দিকে ইসরাইল গাজায় মানবিক সাহায্য প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। জাতিসঙ্ঘ জানায়, ১০ অক্টোবরের পর থেকে ৩৭ হাজার মেট্রিক টন সহায়তা সরবরাহ করা হয়েছে, যার বেশির ভাগই খাদ্য। তবে ইসরাইলের বাধার কারণে চাহিদা পূরণ সম্ভব হচ্ছে না। সীমিতভাবে আল-কারারা ও কারেম আবু সালেম ক্রসিং দিয়ে সাহায্য প্রবেশ করছে; কিন্তু উত্তর গাজা বা মিসর থেকে সরাসরি প্রবেশপথ নেই। জাতিসঙ্ঘ বলেছে, যুদ্ধবিরতির পর প্রায় ১০ লাখ মানুষের জন্য খাদ্য বিতরণ করা হয়েছে, যা পর্যাপ্ত নয়।
সেটেলারদের হামলার রেকর্ড : জাতিসঙ্ঘের মানবিকবিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, গত অক্টোবর মাসে পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতবাসকারীরা ২৬৪টি হামলা চালিয়েছে, যা ২০০৬ সালের পর সর্বোচ্চ। সংস্থাটি জানায়, চলতি বছরেই এক হাজার ৫০০টি হামলা হয়েছে, যা মোট সংখ্যার ১৫ শতাংশ। পশ্চিমতীর ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু হলেও বসতি সম্প্রসারণে অঞ্চলটি খণ্ডবিখণ্ড হয়েছে। জাতিসঙ্ঘ জানায়, চলতি বছর পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বাহিনীর হাতে ৪২ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে।
ইসরাইলি যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ : গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান চলাকালীন ইসরাইলি সামরিক আইনজীবীরা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উত্থাপনের মতো প্রমাণ থাকার বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন। এ বিষয়ে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা তথ্য সংগ্রহ করে। অভিযানটি পরিচালিত হয়েছিল মূলত মার্কিন অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে। রয়টার্সের বিশেষ প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পাঁচ কর্মকর্তার বক্তব্য উঠে এসেছে।
তারা জানান, এই তথ্য ছিল গাজা যুদ্ধ চলাকালীন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছানো সবচেয়ে উদ্বেগজনক গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোর একটি। এতে দেখা যায় ইসরাইলি বাহিনীর ভেতরেই যুদ্ধ পরিচালনার বৈধতা নিয়ে সংশয় ছিল, যা সরকারের প্রকাশ্য অবস্থানের সাথে সাংঘর্ষিক। গাজায় বেসামরিক মানুষের মৃত্যু বাড়তে থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করেন, ইসরাইলের অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও যুদ্ধের নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারে।
তবে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে নির্দিষ্ট যুদ্ধাপরাধের ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। গাজা স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, দুই বছরের অভিযানে ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছে ৬৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি। ইসরাইল দাবি করে, নিহতদের মধ্যে অন্তত ২০ হাজার ছিল যোদ্ধা। রয়টার্সের সাথে কথা বলা নয়জন সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, তারা বাইডেন প্রশাসনের সময় দায়িত্বে ছিলেন এবং ছয়জন সরাসরি গোয়েন্দা তথ্য ও বিতর্ক সম্পর্কে জানতেন।
মার্কিন আইনজীবীদের উদ্বেগ : রয়টার্স আরো জানায়, ইসরাইলি বাহিনীর ভেতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যের আগেই মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আইনজীবীরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেনকে সতর্ক করেন যে, ইসরাইলের অভিযান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন লঙ্ঘন করছে এবং তা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই তারা মতামত দেন, তবে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি।
২০২৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরাইল মার্কিন অস্ত্র ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘন করে থাকতে পারে, তবে যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কারণে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ : গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন বলেন, এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে বাইডেন প্রশাসন যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চোখ বন্ধ রেখেছিল।
ইসরাইল বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগের মুখোমুখি। তারা বলছে, অভিযান হামাসকে লক্ষ্য করে পরিচালিত, সাধারণ মানুষকে নয়। ইসরাইলি বাহিনী জানায়, তারা বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে এবং দুই হাজারটি ঘটনার তদন্ত করছে।



