- পরীক্ষা নিয়ে সৃষ্ট সঙ্কটের কারণ অনুসন্ধান শুরু
- ফিজিক্স পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বিকল্প প্রস্তাব
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে গত সোমবার এইচএসসি ও সমমানের একটি পরীক্ষা নেয়াকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ চলছে। ভারী বর্ষণের কারণে ওই দিনের পরীক্ষা স্থগিতের দাবি থাকলেও শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সেই দাবি উপেক্ষা করেছেন। উল্টো তিনি এখন দায় চাপিয়েছেন জেলা প্রশাসক, শিক্ষা বোর্ড ও আবহাওয়া অফিসের ওপর। অথচ দেশের প্রত্যেক নাগরিকরাই গত রোববারই জেনেছেন যে, ভারী বর্ষণের ধারাবাহিকতা পরের দিন সোমবার পর্যন্ত সারা দেশেই চলমান থাকবে। এমনকি সাংবাদিকদের প্রশ্ন কিংবা দাবিও ছিল সোমবারের পরীক্ষা এক দিনের জন্য হলেও বন্ধ বা স্থগিত করার। উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন পরীক্ষা বন্ধ বা স্থগিতের বিষয়টি জেলা প্রশাসক এবং বোর্ড ও আবহাওয়া অফিস যৌথভাবে সমন্বয় করেই সিদ্ধান্ত নেবে। গতকাল বুধবার ফেসবুকে এক পোস্টে বিকল্প একটি প্রস্তাব দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া কিংবা সংশ্লিষ্ট অনিবার্য কারণে যারা চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার কোনো বিষয়ে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, সেই অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরা চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের ইতোমধ্যে স্থগিত হওয়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অভিন্ন পরীক্ষাপত্রে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত একই তারিখ ও সময়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে।
যদিও ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের এই দুর্ভোগের বিষয় এবং পরবর্তী জটিল এবং কঠোর পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের ভেতরে চুলচেরা বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রীকে ডেকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সার্বিক বিষয়ে নিজেই অবহিত হয়েছেন। তবে একটি কথা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যে কোরো উপরেই হয়তো দায় চাপানো যাবে কিন্তু সব চাপ এবং অভিযোগ কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওপরেই বর্তাবে।
নিজের ফেসবুক পেজে শিক্ষামন্ত্রী সোমবারের পরীক্ষার বিষয়ে বিকল্প প্রস্তাবে তিনি আরো লিখেছেন, চলমান এইচএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে নিতে পাঁচটি শিক্ষার্থীবান্ধব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বোর্ড ব্যতীত সারা দেশে দুই হাজার ৫৮৩টি পরীক্ষাকেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্বতঃস্ফূর্ত ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। আবহাওয়ার উল্লেখযোগ্য উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীরাও যথেষ্ট উদ্দীপনা ও উৎসাহ নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছে। সম্প্রতি বৈরী আবহাওয়ার কারণে পরীক্ষা গ্রহণে জটিলতা নিরসনে নির্বাচিত সরকার সময়োপযোগী ও শিক্ষার্থীবান্ধব কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
পোস্টে বলা হয়, সারা দেশের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা গ্রহণের বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান, আবহাওয়া অধিদফতরের কর্মকর্তারা এবং অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীর স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সর্বসম্মতিক্রমে পূর্বনির্ধারিত সময় অনুযায়ী চট্টগ্রাম বোর্ড ছাড়া সারা দেশে পরীক্ষা চালু রাখা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ড. মিলনের পোস্টে বলা হয়েছে, কোথাও যাতায়াত বা জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যা হলে প্রয়োজনে কেন্দ্র পরিবর্তন, পরীক্ষা স্থগিত, কিংবা পরীক্ষার সময় বৃদ্ধিসহ যেকোনো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
অপর দিকে দেশের শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে শিক্ষার্থীদের জীবনে অন্যতম বৃহৎ পাবলিক পরীক্ষা এইচএসসি। প্রতি বছর প্রায় ১২ থেকে ১৩ লাখ শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। কিন্তু চলতি বছরের পরীক্ষা ঘিরে বন্যা, আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ, পরীক্ষা স্থগিত, কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সঙ্কটের জন্য একক কোনো পক্ষ নয় বরং একাধিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা দায়ী। তবে এবার সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে রয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি। পরীক্ষার সময়সূচি নির্ধারণের সময় সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চলের মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে দেশের বেশির ভাগ বোর্ডে পরীক্ষা চললেও চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা বারবার স্থগিত করতে হয়েছে। এতে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে বৈষম্য ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের প্রতিবেদন অনুযায়ী অনেক এলাকায় পরীক্ষা নেয়ার পরিবেশ ছিল না, তবুও কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে বেশির ভাগ বোর্ডে পরীক্ষা অব্যাহত রাখা হয়। পরে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আংশিক স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, যা পরিকল্পনার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে। তৃতীয়ত, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, কোথাও নৌযান বা বিকল্প যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল না। যদিও প্রশাসনের সহযোগিতায় কিছু শিক্ষার্থী শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নেয়, তবে সঙ্কট মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতির অভাব স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরীক্ষা পরিচালনায় শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ঝুঁকিভিত্তিক পরিকল্পনা। এ বছর দুই হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে সিসিটিভি, অভিন্ন প্রশ্নপত্র ও কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকলেও পরীক্ষার্থীদের যাতায়াত, আঞ্চলিক বৈষম্য ও দুর্যোগজনিত বাস্তবতা মোকাবেলায় কার্যকর বিকল্প পরিকল্পনা ছিল সীমিত।
এ দিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, বারবার সূচি পরিবর্তন ও অনিশ্চয়তার কারণে মানসিক চাপ বেড়েছে। শিক্ষা মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এমন পরিস্থিতি পরীক্ষার ফলাফলেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এমন সঙ্কট এড়াতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলের জন্য পৃথক পরীক্ষা পরিকল্পনা, আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্যের ভিত্তিতে সময়সূচি নির্ধারণ, শিক্ষা বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় এবং পরীক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প কেন্দ্র বা পরিবহন পরিকল্পনা প্রয়োজন।



