- ব্যাহত হতে পারে সরকারি সেবা
- উচ্চ ঝুঁকিতে বর্তমান সরকার
সরকারি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদফতরে বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে লটারির মতো পদ্ধতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। এতে করে ফ্যাসিস্টরা পুর্নবাসিত ও গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি বা পদায়ন পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর তাতে বড় হুমকির মুখে পড়তে পারে বর্তমান সরকার।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব বণ্টনে যদি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা ও সংশ্লিষ্ট এলাকার বাস্তব চাহিদার পরিবর্তে লটারিনির্ভর ব্যবস্থা চালু করা হয়, তাহলে এর সুযোগ নিয়ে স্বার্থান্বেষী মহল প্রভাব বিস্তার করতে পারে। একই সাথে বিগত সরকারের সময় সুবিধাভোগী বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বিন্যাসের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কাও করছেন কেউ কেউ।
গণপূর্ত অধিদফতরের কার্যক্রম সরাসরি রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সেবা ও অবকাঠামোর সাথে যুক্ত। সরকারি অফিস, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে বিদ্যমান স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কার, সব ক্ষেত্রেই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কারা থাকছেন এবং কোন কর্মকর্তা কোথায় পদায়িত হচ্ছেন, সেটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এর সাথে সরকারি সেবা সচল রাখা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের নিরাপত্তার বিষয়ও জড়িত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, গণপূর্তের আওতায় থাকা বিভিন্ন প্রকল্প ও স্থাপনায় প্রকৌশল, প্রশাসন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সরকারি অফিস, আদালত, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক ভবনের নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া প্রয়োজন। কিন্তু বদলি-পদায়নে যদি যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের পরিবর্তে লটারিকে প্রাধান্য দেয়া হয়, তাহলে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ সেবা খাত গণপূর্তের আওতায়
গণপূর্ত অধিদফতর দেশের সরকারি অবকাঠামোর অন্যতম প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা। সরকারি ভবন ও স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যমান ভবনের মেরামত, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করে থাকে।
এ ছাড়া জাতীয় স্মৃতিসৌধসহ ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণ, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কেপিআইয়ের অবকাঠামোগত ও তড়িৎ প্রকৌশল কাজ, সরকারের অর্পিত ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি অফিস ও আবাসিক ভবনের ভাড়ার হার নির্ধারণের মতো কাজও এর আওতাভুক্ত।
সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল কাজের সরকারি রেট শিডিউল প্রণয়নও গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এসব কার্যক্রমে সামান্য প্রশাসনিক ভুলও বড় ধরনের আর্থিক ও জনস্বার্থের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এইসব স্থানে ফ্যাস্টিদের পদায়ন হলে সরকার বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
বদলি-পদায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
গণপূর্তের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা আলোচনা রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা ও পূর্ববর্তী কর্মদক্ষতার পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা একই স্থানে কতদিন দায়িত্ব পালন করেছেন, এসব বিষয় বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বদলি-পদায়ন নীতিমালা থাকলে কোনো মহলের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ কমে। একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে কাউকে দেয়ার আগে তার পেশাগত রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট কাজের অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। এ ছাড়াও লটারি প্রক্রিয়াতে বদলির ফলে কর্মকর্তাদের ভালো কাজ করার প্রতিযোগীতামূলক পরিবেশ নষ্ট হবে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি ও পদায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের সাথে সংশ্লিষ্ট বা অতীতে কোনো রাজনৈতিক সরকারের সুবিধাভোগী হিসেবে আলোচিত ব্যক্তিদের পুনরায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানোর অভিযোগ উঠলে তা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির আশঙ্কা
সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের আশঙ্কা, গণপূর্তের গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হলে এর প্রভাব সরাসরি সরকারি কার্যক্রমে পড়তে পারে। সরকারি ভবনের রক্ষণাবেক্ষণ, হাসপাতাল ও আদালতের অবকাঠামোগত কাজ, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তাসংক্রান্ত প্রকৌশল কাজ কিংবা চলমান উন্নয়ন প্রকল্পে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে।
তবে এ ধরনের আশঙ্কাকে বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে যাচাই করা এবং নির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে রাজনৈতিক পরিচয়ে অভিযুক্ত না করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া
প্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, বদলি ও পদায়নে লটারি পদ্ধতি কোনোভাবেই একমাত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভিত্তি হওয়া উচিত নয়। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে নির্ধারিত মানদণ্ড, জ্যেষ্ঠতা, অভিজ্ঞতা, কর্মদক্ষতা, প্রকল্পের ধরন এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রয়োজন, সবকিছু বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।
একই সাথে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্কোরিং বা মূল্যায়ন কাঠামো তৈরি করা গেলে সিদ্ধান্তের গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে। এতে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের অভিযোগও কমবে।
গণপূর্তের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা তাই এখন বড় বিষয় হয়ে উঠেছে। বদলি-পদায়নের নামে যেন কোনো গোষ্ঠী সুবিধা না পায় এবং একই সাথে যোগ্য কর্মকর্তারা যেন যথাযথ দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত না হন, এ বিষয়ে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা আরো বলছেন, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারকে নানাভাবে শক্তিশালী করত তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এ ছাড়া যেসব কর্মকর্তা সরকারকে বিপদে ফেলতে চায় তাদের ব্যাপারেও সরকারের সতর্ক থাকা উচিত।
রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সেবা সচল রাখতে গণপূর্তের প্রতিটি স্তরে দক্ষতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে বদলি-পদায়নের ক্ষেত্রে লটারি বা অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণের আগে এর প্রশাসনিক ও সেবাগত প্রভাব যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মঞ্জুর নয়া দিগন্তকে বলেন, লটারি প্রক্রিয়াটি সবাই মেনে নিয়েছে। এটা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করা উচিত হবে না। এ ছাড়া বর্তমান সরকারের আমলে জটিলতা সৃষ্টি করার সাহস কোনো কর্মকর্তার নেই।



