পতিত আ’লীগের দাবার ঘুঁটি জাপা

সংসদ নির্বাচন বিতর্কিত করার চিন্তা

মনিরুল ইসলাম রোহান
Printed Edition

কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় টানা তিনবার একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের কারিগর পতিত আওয়ামী লীগ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারছে না। তবে দীর্ঘদিনের সহযোগী জাতীয় পার্টি নির্বাচন কেন্দ্রিক ব্যাপক তৎপর হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে নানা অনিশ্চয়তার মুখে থাকা জাতীয় পার্টি এবার কৌশলগত দিক বিবেচনায় দুইভাগে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনী লড়াই করছে। এ দিকে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও দেশ থেকে বিতাড়িত হলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতে বসেই নির্বাচনী মাঠের ঘুঁটি চালছে আওয়ামী লীগ। সেই নির্বাচনী মাঠে আওয়ামী লীগের দাবার ঘুঁটি হিসেবে জাতীয় পার্টি রোল প্লে করবে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য অভ্যন্তরীণ চাপ থাকা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের দোসর ও সহযোগীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়। কিন্তু সম্প্রতি জাতীয় পার্টির একাংশের চেয়ারম্যান জিএম কাদের আসন্ন নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড গঠনের অজুহাত দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়ে রেখেছেন। তার মানে এটা বোঝা যায়- বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের কারিগর আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠান হোক জাতীয় পার্টি কখনোই চায়নি। ফলে নির্বাচনকে বিতর্কিত করার চিন্তা মাথায় রেখেই আগেভাগেই নির্বাচন থেকে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য জাতীয় পার্টি পথ খোলা রেখেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, প্রতিবেশী দেশ থেকে সিগন্যাল পেলেই হয়তো জি এম কাদের এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নেতৃত্বাধীন ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ জোট নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে পারে।

ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের সাথে সখ্যতা রয়েছে বর্তমান জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচন বিএনপি বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ ঠিকই অংশগ্রহণ করে। ১৯৭৫ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়। যদিও ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাট্টা সমর্থন ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় পার্টি ৮৬ সালের ঋণ ঠিক ১০ বছর পর পরিশোধ করার সুযোগ পায় ৯৬ সালে গিয়ে। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির একাট্টা সমর্থন নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। পরবর্তীতে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি কিছু দিনের জন্য সঙ্গী হলেও ২০০৬ সালে পল্টি মেরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আওয়ামী লীগের সাথে যোগ দেয়। পরে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হয়ে জাতীয় পার্টি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তারা সরকার গঠন করে।

তা ছাড়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারকে কর্তৃত্ববাদী শাসক হয়ে ওঠার পেছনে যে দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তারমধ্যে অন্যতম ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনে যখন আন্তর্জাতিক চাপের মুখে বৈধতার মহাসঙ্কটে ভুগছিল ঠিক তখনই আওয়ামী লীগকে উদ্ধারে ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয় ওই জাতীয় পার্টি। সেই সহানুভূতির জায়গা থেকে এবার আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মধ্যে ভোট আদান-প্রদানে বড় ধরনের সমঝোতায় যাওয়ার হিসাব-নিকাশ চলছে। যদিও জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের) প্রেসিডিয়াম সদস্য মীর আব্দুস সবুর আসুদ বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা নির্বাচনী মাঠে থাকলে বিএনপির সুবিধা হবে। আমাদের ভোট বিএনপি পেতে পারে, কিন্তু কখনোই জামায়াত পাবে না। আর আমরা নির্বাচনী মাঠে না থাকলে বিএনপির অসুবিধা হবে। কারণ তখন আমাদের ভোট বিএনপি কখনোই পাবে না। বিএনপির স্বার্থেই নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড খুবই প্রয়োজন। এক প্রশ্নের জবাবে জাপার এই শীর্ষ নেতা বলেন, আমরা নির্বাচনে অংশ নেবো এটা ভাবতে পারিনি। নির্বাচনের জন্য আমরা আসলে প্রস্তুত ছিলাম না। এ জন্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও সব জায়গা মনোনয়ন দিতে পারিনি। ২২৪ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছে আমাদের প্রার্থীরা। এরমধ্যে ১৬২ জন বৈধ ঘোষণা হয়েছে। বাকিরা আপিল করবে। এ দিকে গত ৫ আগস্ট রাজনৈতিক মেরুকরণের পর দীর্ঘদিন চুপচাপ থেকে একতরফা নির্বাচনের ঘনিষ্ঠ মিত্র জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি থেকে বের হয়ে যাওয়া সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর নির্বাচনী জোট ‘জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট’ গঠন করে শতাধিক আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছে। যারা গত ১৫ বছর ধরে আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থনে একাট্টা হয়ে একযোগে কাজ করেছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে দেশে এবং বিদেশে অবস্থান করা আওয়ামী লীগের মধ্যম সারির এবং সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে না। ইতোমধ্যে স্বতন্ত্র হিসেবে বিভিন্ন জায়গায় দলীয় লোকজন মনোনয়ন ফরম উত্তোলন করেছেন আবার কেউ কেউ জমাও দিয়েছেন। তাদের যদি প্রার্থিতা টিকে যায় তাহলে শেষমেশ দীর্ঘদিনের সহযোগী জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি ও জোট সঙ্গী জেপির নেতৃত্বাধীন নতুন জোটের সাথে কৌশলগত ভোটের আদান-প্রদান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যদিও সেটা রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে।

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক ড. আবদুল লতিফ মাসুম নয়া দিগন্তকে বলেন, আওয়ামী লীগ যখন রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্কটে পড়েছে ঠিক তখনই বৈধতা দিয়েছে জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের সহযোগী জাতীয় পার্টি- এটা ঐতিহাসিক সত্যও বটে। গত ১৫ বছর জাতীয় পার্টি যদি আওয়ামী লীগকে একাট্টা সমর্থন না দিত তাহলে দেশের রাজনীতিতে এই সঙ্কট তৈরি হতো না। তিনি বলেন, আগে আওয়ামী লীগের ঘাড়ে বসে সব সুযোগ সুবিধা ভোগ করেছে ফ্যাসিবাদের দোসর জাতীয় পার্টিসহ অন্যরা। এখন হয়তো সেই ঋণ শোধ করবে তারা। বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে জাতীয় পার্টি কাজ করবে। এমনও হতে পারে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য অদৃশ্য শক্তির ইশারায় ঠুনকো অজুহাতে জাতীয় পার্টিসহ ফ্যাসিবাদ আওয়ামী লীগের সহযোগীরা শেষ মুহূর্তে গিয়ে সরে দাঁড়াতে পারে। এতে তখন অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।