নয়া দিগন্ত ডেস্ক
আগামী সপ্তাহের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরবর্তী বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এতে ইরানের সাথে যুদ্ধ শেষ হওয়ার আশাবাদ আরো জোরালো হয়েছে। এমনকি ট্রাম্প চূড়ান্ত আলোচনায় যোগ দিতে এবং চুক্তি স্বাক্ষরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আসতে পারেন।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বলেছেন- ইরান আগামী ২০ বছর কোনো পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার প্রস্তাব দিয়েছে। গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনায় তেহরানের পারমাণবিক আকাক্সক্ষার বিষয়টিই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
হোয়াইট হাউসের বাইরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা দেখছি কী ঘটে। তবে আমি মনে করি, ইরানের সাথে চুক্তিতে পৌঁছানোর খুব কাছাকাছি আছি আমরা।’ কয়েক ঘণ্টা পর নেভাদার লাস ভেগাসের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, এ যুদ্ধ ‘খুব শিগগির শেষ হওয়া উচিত’।
ইরানের সাথে একটি চুক্তি হলে পাকিস্তান সফরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এ সম্ভাবনার কথা জানান।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান। ট্রাম্পের দাবি, বোঝাপড়ার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই একমত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধে অবসানের জন্য শিগগিরই চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে বলে মনে করছেন তিনি। এমন হলেই ট্রাম্প নিজে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যেতে পারেন বলে জানিয়েছেন। চুক্তিতে সই করতে ইসলামাবাদ সফর করবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পাকিস্তান যাবো।’
পাকিস্তানের প্রশংসা করে তিনি বলেন, পাকিস্তান দারুণ কাজ করছে। তারা খুব ভালো ভূমিকা রাখছে। যদি ইসলামাবাদে কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, তবে আমি সেখানে যেতে পারি।
গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে দুই দেশের মধ্যকার শান্তি আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র, ইরান এবং পাকিস্তান এখনো নিজেদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার নিশ্চিত করেছে যে, দ্বিতীয় দফা আলোচনার পরিবেশ তৈরিতে ওয়াশিংটন ও তেহরান ইসলামাবাদের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখছে। তবে বৈঠকের কোনো দিনক্ষণ এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি আল-জাজিরাকে বলেন, কারা আসবেন, প্রতিনিধি দল কত বড় হবে এবং কারা আলোচনায় থাকবেন তা দুই পক্ষই ঠিক করবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আলোচনার বিষয়বস্তু গোপন রাখা আমাদের দায়িত্ব।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে বর্তমানে দু’সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চলছে। আগামী সপ্তাহেই সেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ফুরাচ্ছে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে ট্রাম্প জানান, তিনি চাইলে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরো বাড়াতে পারেন। তবে তেমন করার আর প্রয়োজন হবে না বলেই মনে করছেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরানের সাথে এ যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর ফলে তেলের দাম হু হু করে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্টের জন্য বড় রাজনৈতিক ঝুঁঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি লেবানন যুদ্ধবিরতি ইরানের সাথে বৃহত্তর শান্তি চুক্তির পথ প্রশস্ত করে, তবে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বিশাল বিজয় হবে।
সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে চুক্তির সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, ‘আর যদি তা ঘটে, তবে তেলের দাম অনেক কমে যাবে, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পাবে এবং... তার চেয়েও বড় কথা, কোনো পারমাণবিক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটবে না।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানান, গত সপ্তাহে ইরানের সাথে যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি হয়েছিল, সেটি আগামী সপ্তাহের পর বাড়ানোর প্রয়োজন হবে কি না সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। তবে তেহরান একটি চুক্তি করতে চায় বলে তিনি যোগ করেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘বিশ্বাস করা কঠিন হলেও, ইরানের সাথে বর্তমানে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক। আমি মনে করি, প্রায় চার সপ্তাহের বোমাবর্ষণ এবং অত্যন্ত শক্তিশালী অবরোধের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন আগামী এক বা দুই সপ্তাহের মধ্যে হোয়াইট হাউসে বৈঠক হতে পারে। আর যদি ইসলামাবাদে ইরান চুক্তি চূড়ান্ত ও স্বাক্ষরিত হয়, তবে তিনি সে অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সেখানে যেতে পারেন।
এ দিকে গত সপ্তাহের আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সব পারমাণবিক কার্যক্রম ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, তেহরান তিন থেকে পাঁচ বছরের জন্য স্থগিত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে। ওয়াশিংটন দাবি করেছে যে সমস্ত উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ইরান থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে। অন্য দিকে, তেহরান তাদের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার দাবি জানিয়েছে। দুই ইরানি সূত্র জানিয়েছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত নিয়ে একটি সমঝোতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তেহরান তাদের মজুতের একটি অংশ দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেয়ার কথা বিবেচনা করছে, যা তারা আগে প্রত্যাখ্যান করেছিল। এক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বুধবার তেহরানে পৌঁছান এবং কিছু ‘জটিল বিষয়ে’ অগ্রগতি অর্জন করেছেন। যদিও তেহরান বলেছে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির ভাগ্য এখনো নির্ধারিত হয়নি। ট্রাম্প জানিয়েছেন, এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেয়া হবে।
রয়টার্সকে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসিম মুনিরের এ সফর দ্বিতীয় দফার আলোচনা এবং যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আশা জাগিয়েছে। তবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে এখনো মৌলিক মতপার্থক্য রয়ে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথ বলেছেন, চুক্তি না হলে মার্কিন সেনারা পুনরায় যুদ্ধ অভিযান শুরু করতে প্রস্তুত রয়েছে।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন চুক্তির বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের আটকে থাকা বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। সূত্রটি আরো যোগ করেছে, ইরান কেবল তখনই হরমুজ প্রণালী খুলবে যদি একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং জাতিসঙ্ঘ গ্যারান্টি দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ভবিষ্যতে আর হামলা করবে না।
হরমুজ প্রণালী ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’ ঘোষণা
এ দিকে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির সাথে সংহতি জানিয়ে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালীকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য ‘পুরোপুরি উন্মুক্ত’ ঘোষণা করেছে ইরান। গতকাল শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘোষণা দেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এক্সে দেয়া পোস্টে জানান, লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে বর্তমানে যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি চলছে, সে অবশিষ্ট সময় পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারবে। ধারণা করা হচ্ছে, লেবাননের শান্তিপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই ইরান এ নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করেছে। আরাকচি তার পোস্টে আরো বলেন, জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ইরানের ‘পোর্টস অ্যান্ড মেরিটাইম অর্গানাইজেশন’ কর্তৃক ইতঃপূর্বে ঘোষিত ও সমন্বিত রুট বা পথটি অনুসরণ করতে হবে।
এর আগে লেবানন ও ইসরাইলের মধ্যে ১০ দিনের একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে জানান, চুক্তি করার আগে তিনি লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাথে ‘চমৎকার’ আলোচনা করেছেন। তিনি আরো জানান, দুই দেশের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এ ১০ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছেন দুই নেতা।
পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান চায় ইরান
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইদ খতিবজাদেহ আনাতোলিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তেহরান কোনো ধরনের সাময়িক যুদ্ধবিরতি মেনে নেবে না। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, লেবানন থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের স্থায়ী অবসান হতে হবে, যা তেহরানের জন্য একটি ‘রেডলাইন’। এ অস্থিতিশীলতার জন্য তিনি সরাসরি আমেরিকা ও ইসরাইলকে দায়ী করে বলেন যে তাদের কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জাতিসঙ্ঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি ওয়াশিংটনের সামুদ্রিক অবরোধকে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং একটি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন যে আমেরিকা সামরিক শক্তিপ্রয়োগ করে এ সঙ্কট তৈরি করেছে যা তৃতীয় পক্ষের নৌ-বাণিজ্যকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।



