যে তিনটি শর্ত দিল্লিকে দিয়ে ঢাকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরে অনুকূল পরিবেশ তৈরির কথা বলছে তার অন্যতম হচ্ছে বিনাশর্তে শেখ হাসিনাকে দণ্ডিত আসামি হিসেবে ফেরত দিতে হবে। হাসিনা ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার ঘোষণা দেয়ার পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন তার আগেই বাংলাদেশ অচল হয়ে যাবে, কোনো সরকার থাকবে না, এমনকি গৃহযুদ্ধ বেধে যাবে এমন হুঙ্কারও দিচ্ছেন। কিন্তু ভারত হাসিনাকে ফেরত দিতে চায় না কেন? হাসিনাকে বাদ দিয়ে ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ার ভারতীয় শর্তে বাংলাদেশের বিপরীত অবস্থানে দুই দেশের কূটনীতি পয়েন্ট অব নো রিটার্নে চলে যাচ্ছে মনে হলেও ভারতীয় এই শর্ত বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্ববিনাশী হয়ে উঠছে।
ভারত এখন বলছে হাসিনা দেশে ফিরবেন কী না তা ভারতীয় আদালতের ব্যাপার। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভারতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা বলেছেন, হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর হবে কি না সে সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত। এবং বাংলাদেশের তরফ থেকে সেজন্য উদ্যোগ নিতে হবে। একই কথা বলেছেন ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী।
পিনাকের ব্যাখ্যা
একসময়ে বিবিসিখ্যাত সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার ও মানসীর ইউটিউব চ্যানেল নিউজিচ্যাটে পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, হাসিনাকে ভারত ইনভাইট করে আনেনি। বাংলাদেশের আর্মি হাসিনাকে নিজের কাস্টডিতে নিয়ে ভারতে রেখে গেছে। এটা ফ্যাক্ট। আর হাসিনাও ভারতে প্রথম আসেনি। এর আগে তার পরিবারকে হত্যার পর ভারতে আশ্রয় নিয়ে ফের বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ফিরে এলে হাসিনা ফেরত গিয়েছিলেন। এবারো হাসিনাকে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। তিনি বলেন, প্রত্যর্পণ একটি জুডিশিয়াল প্রসেস। এ প্রসেসে বাংলাদেশকেও অংশ নিতে হবে। কোর্ট অর্ডার ছাড়া হাসিনাকে ভারত ফিরিয়ে দিতে পারবে না। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। প্রত্যর্পণ চুক্তির ইলেভেন আর্টিকেল অনুযায়ী রাজনৈতিক মামলা থাকলে তার বিষয়টি আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। হাসিনার ফিরে যাওয়ার বিষয়টি আমরা ডিসাইড করব।
ভারতের অনুমোদন ছাড়া হাসিনা কিভাবে বক্তব্য রাখছেন জানতে চাইলে পিনাকি বলেন, তার মুখ সেলোটেপ দিয়ে আমরা বন্ধ করে রাখতে পারব না। হাসিনাকে কিভাবে ডিল করা হবে তাতে ভারতের রেসপন্সিবিলিটি আছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী যেতে চাইলে যাবে কিন্তু উনি ফিরে গেলে কী রকম সিচুয়েশন তৈরি হয়, তাকে ফাঁসি দেয়ার জন্য ওঁৎ পেতে বসে আছে। হাসিনার মৃত্যুদণ্ড হয়েছে, এরকম পলিটিক্সে হয়, তারেক রহমানও বিদেশে নির্বাসনে ছিলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ এখন একটাওতো নেই।
ভারত হাসিনার পুনর্বাসন চায় কি না এ প্রশ্নের জবাবে পিনাকি বলেন, নিশ্চয়ই না। উই ওয়ান্ট হাসিনা ব্যাক। রাজনীতি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার। যে সরকার আসবে ভারত তার সাথে কাজ করবে। টারময়েলতো বাংলাদেশে কম হয়নি।
ভারতের আপত্তি
পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, চীন বাংলাদেশে সেতু, রাস্তা বানাক আপত্তি নেই। মেগা-উন্নয়নে চীনের সৈন্য না এলেই হয়। তিস্তার মতো মেগা-অবকাঠামোতে ভারতের নিরাপত্তা উদ্বেগের কথাও স্বীকার করেন তিনি। একই কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর দেশটির সাথে করিডোর, তিস্তা মেগা প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন চুক্তিগুলো ফ্রিজবন্দী হয়ে আছে বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শাহীদুজ্জামান। চ্যানেল ২৪’এর মুক্তবাক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, চীনকে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ নিশ্চিত কমিটমেন্ট দেয়া বা চীন এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্বে না যাওয়া পর্যন্ত তারেক রহমানের ভারত সফরে যাওয়া ঠিক হবে না। তার ধারণা, সিচুয়েশন ফ্রেমিংয়ে অভ্যস্ত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের অভিন্ন নদীর পানির হিস্যা, তিস্তা চুক্তি, পুশইন, বাণিজ্যসহ সব বিষয়ে পূর্ণ আশ্বাস দেবে এক শর্তে এবং তা হচ্ছে চীনের সাথে কোনো করিডোর বা মেগা প্রকল্পে যাওয়া যাবে না। বরং বাংলাদেশের উচিত মক্কা প্যাক্টে যোগ দেয়া। আগামী মাসে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স ঢাকায় আসছেন, তখনই বিষয়টি চূড়ান্ত করতে হবে।
শাহীদুজ্জামান সতর্ক করে দিয়ে বলেন, মনে রাখতে হবে জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশে গণহত্যায় ভারতের অংশগ্রহণ ছিল। বাংলাদেশ পিওর অ্যান্ড সিম্পল হাসিনাকে ফেরত চাচ্ছে কোনো জুডিশিয়াল রিভিউ নয়। তারেক ভারতে সফরে গেলে ডিসেম্বরের মধ্যেই বাংলাদেশে ভারত বিরোধী মনোভাবকে চাঙ্গা ও জ্বালানিসহ বিভিন্ন সঙ্কটকে উসকে দিয়ে সরকার ফেলে দেয়ার জন্য সব কিছুই করা হবে। পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও দলটির সমর্থক সাংবাদিকরা সেই মিথই তৈরি করছে।
হর্ষ ভি পান্থের অভিমত
ভারতীয় বিশ্লেষক হর্ষ ভি পান্থ বলেন, বঙ্গোপসাগরে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার মধ্যে তারেককে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন ও সম্পর্ক বজায় রেখে এগোতে হবে। কোনো একটি শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কাটাতে চাইছে ঢাকা। এ বাস্তবতায় ঢাকার পক্ষে ভারতে তারেক রহমানকে সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ সহজ নয়, ফিরিয়ে দেয়াও কঠিন।
আউটলুকের বিশ্লেষণ
বাংলাদেশ সরকার হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত করার তাগিদ দিলেও, নয়াদিল্লি এই বিষয়টিকে আইনি কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে মূল দ্বিপক্ষীয় আলোচনা থেকে পৃথক রাখার পক্ষে। বাংলাদেশ অতিরিক্ত ডিজেল সরবরাহের জন্য ভারতের কাছে অনুরোধ জানানোর পর ভারত তাদের নিজস্ব পরিশোধন ক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করে এই সরবরাহের মূল্যায়ন করছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। নদীর পানি বণ্টন ও দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে চুক্তিটি নবায়ন করা আগামী দিনের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম বড় পরীক্ষা। আউটলুক মনে করে দীর্ঘ সীমান্ত নিরাপত্তা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্যিক সংযোগ এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় দুই দেশের মধ্যবর্তী সুসম্পর্ক উভয় পক্ষের জন্যই কৌশলগতভাবে প্রয়োজনীয়।



