সাক্ষাৎকার : প্রকৌশলী শেখ আল আমিন

৫০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে দেশে

বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শক্তি প্রযুক্তি। গত এক দশকে এর উৎপাদন খরচ প্রায় ৮০% কমেছে এবং নতুন বিদ্যুৎ স্থাপনার বড় অংশ এখন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

বিশেষ সংবাদদাতা
Printed Edition

ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের-আইইবি ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী শেখ আল আমিন বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারে।

তিনি সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে নয়া দিগন্তের সাথে এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশে সৌরিবিদ্যুতের সম্ভাবনার নানা দিক নিয়ে কথা বলেন। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বিস্তারিত।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে সৌরবিদ্যুতের গুরুত্ব আপনি কিভাবে দেখছেন?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : বাংলাদেশ দ্রুত বর্ধনশীল বিদ্যুৎচাহিদা মোকাবেলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে। এর মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ সবচেয়ে সম্ভাবনাময় উৎস। বর্তমানে মোট উৎপাদনের মাত্র ৪৫% সৌর থেকে এলেও ভবিষ্যতে এটি জ্বালানি নিরাপত্তার প্রধান স্তম্ভ হতে পারে।

প্রশ্ন : বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুতের অবস্থান কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : বিশ্বজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল শক্তি প্রযুক্তি। গত এক দশকে এর উৎপাদন খরচ প্রায় ৮০% কমেছে এবং নতুন বিদ্যুৎ স্থাপনার বড় অংশ এখন নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে। এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে।

প্রশ্ন : বর্তমানে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের অবস্থা কেমন?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : দেশে নবায়নযোগ্য শক্তির মোট স্থাপিত ক্ষমতা প্রায় এক হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট, যার মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ। এ ছাড়া হাইড্রো (পানি বিদ্যুৎ) ও উইন্ডের (বায়ু বিদ্যুৎ) অবদান তুলনামূলক কম। তবে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে সৌরের অংশ এখনো সীমিত।

প্রশ্ন : বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা সোলার হোম সিস্টেম (এসএইচএস) নিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : বাংলাদেশ একসময় বিশ্বের বৃহত্তম সোলার হোম সিস্টেম কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ছয় মিলিয়নের বেশি সিস্টেম গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে একটি সফল মডেল হিসেবে স্বীকৃত।

প্রশ্ন : ছাদ বিদ্যুৎ বা রুফটপ সোলার কতটা এগিয়েছে?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : ছাদ বিদ্যুৎ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৩৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ স্থাপিত হয়েছে এবং চার হাজারের বেশি নেট-মিটারিং সিস্টেম চালু রয়েছে। বিশেষ করে শিল্প ও গার্মেন্টস খাতে এর ব্যবহার বেশি। সরকার তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে। নেট মিটারিং হলো একটি বিলিং-ব্যবস্থা যা সৌরশক্তির মালিকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে ফেরত পাঠানোর সুযোগ দেয় এবং এর বিনিময়ে তারা বিদ্যুতের মূল্য পান, যা তাদের বিদ্যুৎ খরচ কমিয়ে দেয়। একটি দ্বিমুখী মিটার ব্যবহার করে, এটি গ্রিডে প্রবেশ করা এবং গ্রিড থেকে বের হওয়া উভয় বিদ্যুৎই পরিমাপ করে। এই ক্রেডিটগুলো পরবর্তী সময়ে ব্যবহারের জন্য জমা রাখা যায়, যা রোদহীন সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে ‘এনার্জি ব্যাংকিং’ হিসেবে কাজ করে।

প্রশ্ন : বড় আকারের সৌর প্রকল্পের অবস্থা কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : ইউটিলিটি-স্কেল সোলার পার্ক প্রকল্প শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রায় ২.৬ গিগাওয়াট প্রকল্পের টেন্ডার ঘোষণা হয়েছে এবং ১০০ থেকে ২৫০ মেগাওয়াটের একাধিক প্রকল্প পরিকল্পনায় রয়েছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে সৌরশক্তির সম্ভাবনা কতটা?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : সম্ভাবনা অত্যন্ত বড়। বছরে ৩০০ দিনের বেশি সূর্যালোক পাওয়া যায় এবং সৌর বিকিরণ গড়ে ৪৫ শডয/সক্ষ্ম/ফধু। গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৫০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে পারে।

প্রশ্ন : সরকারের লক্ষ্য ও নীতিমালা কী বলছে?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে ২০% এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০% নবায়নযোগ্য শক্তি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। নেট মিটারিং, ছাদ বিদ্যুৎ কর্মসূচি, কর ছাড়সহ নানা নীতি ইতোমধ্যে চালু হয়েছে।

প্রশ্ন : প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো কী কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পর্যাপ্ত জমির অভাব; গ্রিডে সৌরবিদ্যুতের অনিয়মিত সরবরাহ সামলানোর সীমাবদ্ধতা; প্রথমেই বেশি বিনিয়োগ এবং নীতিগত দুর্বলতা ও বিনিয়োগ ঘাটতি।

প্রশ্ন : সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুবিধা কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : অর্থনৈতিকভাবে জ্বালানি আমদানি কমবে, উৎপাদন খরচ কমবে এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে। পরিবেশগতভাবে কার্বন নিঃসরণ কমবে, বায়ুদূষণ কমবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা সহজ হবে।

প্রশ্ন : ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা কী দেখছেন?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : ২০২৫-২০৪১ সময়কালে সৌরবিদ্যুৎ দ্রুত বিস্তার লাভ করবে। সৌর পার্ক, ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকলকারখানায় ছাদ বিদ্যুৎ, সৌর বিদ্যুতে কৃষি সেচ এবং সৌরবিদ্যুৎ ব্যাটারিতে সংরক্ষণ। এসব খাতে বড় উন্নয়ন হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে তিন-চার গিগাওয়াট বিদ্যুৎ অর্জন সম্ভব।

প্রশ্ন : আপনার কৌশলগত সুপারিশ কী?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : বড় আকারের সৌর পার্ক স্থাপন; শিল্প খাতে বাধ্যতামূলক ছাদ বিদ্যুৎ, ব্যাটারিতে সৌরবিদ্যুৎ সংরক্ষণ সংযোজন; প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডার ব্যবস্থা এবং স্থানীয়ভাবে সৌর প্যানেল উৎপাদন।

প্রশ্ন : শেষ কথা হিসেবে কী বলবেন?

প্রকৌশলী শেখ আল আমিন : বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ ছোট অংশ হলেও এর সম্ভাবনা বিশাল। সঠিক নীতি, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে আগামী দুই দশকে এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও টেকসই উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।