বিশ্ববাণিজ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় নতুন বাজারের সন্ধান করছেন দেশের রফতানি খাতের উদ্যোক্তারা। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ ও আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের রফতানিকাঠামো এখন ধীরে ধীরে পরিবর্তনের পথে। বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বাজার বৈচিত্র্যের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যকে সম্ভাবনাময় নতুন রফতানি গন্তব্য হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো গেলে এই দুই অঞ্চল বাংলাদেশী পণ্যের বড় বাজারে পরিণত হতে পারে।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, বাংলাদেশের মোট রফতানির বড় অংশই এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও উত্তর আমেরিকায় কেন্দ্রীভূত। তৈরী পোশাক খাতের প্রায় ৮০ শতাংশ পণ্য এই দুই অঞ্চলে রফতানি হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তন, শুল্কনীতি এবং সরবরাহ চেইনের নতুন বাস্তবতার কারণে রফতানিকারকরা নতুন বাজার খুঁজতে শুরু করেছেন। এ প্রেক্ষাপটে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
ইপিবি প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশের রফতানি আয় ৮.৫৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এ সময়ে মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৪৪.৪৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, মোট ৪৮.২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রফতানি আয়ের মধ্যে তৈরী পোশাক (আরএমজি) খাত থেকে এসেছে ৩৯.৩৪ বিলিয়ন, যা ৮.৮৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
তৈরী পোশাক খাতের মধ্যে নিটওয়্যার রফতানি ৯.৭৩ শতাংশ বেড়ে ২১.১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। যেখানে ওভেন পোশাক রফতানি ৭.৮২ শতাংশ বেড়ে ১৮.১৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। গত অর্থবছরের জুলাই-জুন সময়ে হোম টেক্সটাইল ২.৪২ শতাংশ বেড়ে ৮৭১.৫৭ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৪৩.৮৯ শতাংশ এসেছে ইইউ থেকে এবং ২২.০২ শতাংশ এসেছে আমেরিকার বাজার থেকে। বিপরীতে আফ্রিকার বাজারে বাংলাদেশের রফতানি মাত্র ৩৮৪ মিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ০.৮৬ শতাংশ। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে রফতানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রফতানির প্রায় ২ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এই দু’টি অঞ্চলে বাংলাদেশের উপস্থিতি এখনো সীমিত।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, এই কম অংশীদারিত্বই ভবিষ্যতে বড় সুযোগ তৈরি করছে। কারণ আফ্রিকা বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল ভোক্তা বাজারগুলোর একটি। ১৪০ কোটিরও বেশি মানুষের এই মহাদেশে দ্রুত নগরায়ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সম্প্রসারণের ফলে খাদ্যপণ্য, পোশাক, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী ও ভোগ্যপণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, আগামী দুই দশকে আফ্রিকার অর্থনীতি ও ভোক্তা বাজারের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
তথ্যে দেখা যায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে সীমিত আকারে পণ্য রফতানি করছে। কেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নাইজেরিয়া, তানজানিয়া ও ঘানার মতো দেশে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক, ওষুধ, সিরামিক ও প্লাস্টিক পণ্যের বাজার ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে আফ্রিকার বাজারে রফতানি বাণিজ্য বাড়তে শুরু করেছে। উল্লেখিত সময়ে বাংলাদেশের রফতানি প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিল, যা কয়েক বছর আগের তুলনায় বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প আফ্রিকার বাজারে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত জেনেরিক ওষুধ আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে তুলনামূলক কম দামে সরবরাহ করা সম্ভব হওয়ায় আফ্রিকার অনেক দেশের জন্য তা আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। একইভাবে তৈরী পোশাক, চামড়াজাত পণ্য এবং সিরামিক পণ্যও এই বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের বাজারও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনার ক্ষেত্র। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো দেশগুলোতে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণ এবং বড় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, আরব দেশগুলোতে বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। বাকি অংশের মধ্যে রয়েছে সবজি, কৃষিপণ্য ও অন্যান্য ভোগ্যপণ্য।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ তুলনামূলক সহজ হতে পারে। কারণ এই অঞ্চলে প্রায় এক কোটির বেশি বাংলাদেশী কর্মরত আছেন, যারা স্থানীয় বাজারে বাংলাদেশী পণ্যের চাহিদা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।
প্রবাসীদের মাধ্যমে অনেক সময় স্থানীয় সুপারশপ ও পাইকারি বাজারে বাংলাদেশী খাদ্যপণ্য, মসলা ও পোশাকের বাজার তৈরি হয়।
ঢাকা চেম্বোর অব কর্মাস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্ররি (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে শুধু তৈরী পোশাকের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রফতানির প্রায় ৮৫ শতাংশ আসে তৈরী পোশাক খাত থেকে। কিন্তু নতুন বাজারে ওষুধ, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, সিরামিক, প্লাস্টিক পণ্য, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যেরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আফ্রিকার অনেক দেশের সাথে সরাসরি জাহাজ যোগাযোগ সীমিত হওয়ায় পরিবহন ব্যয় তুলনামূলক বেশি। সেই সাথে ব্যাংকিং লেনদেন, এলসিব্যবস্থা এবং বাণিজ্যিক তথ্যের অভাবও অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে এসব সমস্যা সমাধানে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এ দিকে বাংলাদেশের সিরামিক শিল্প ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশে বাজার তৈরি করতে শুরু করেছে। একইভাবে প্লাস্টিক পণ্য ও হালকা প্রকৌশল খাতও আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই খাতগুলোকে আরো নীতিগত সহায়তা দেয়া হলে রফতানি বহুমুখীকরণ সহজ হবে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) নয়া দিগন্তকে বলে, নতুন বাজারে প্রবেশের জন্য বাণিজ্যিক কূটনীতি জোরদার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন দেশে ট্রেড মিশন পাঠানো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যমেলায় অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠনের সাথে যোগাযোগ বাড়ানো হলে বাংলাদেশী পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ সহজ হবে। সেই সাথে বিদেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক প্রতিনিধিদের আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, এই লক্ষ্য অর্জনে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিত উদ্যোগ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কার্যকর বাণিজ্য কূটনীতি জোরদার করা গেলে এই দুই অঞ্চল ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রফতানি সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি ঐতিহ্যগত বাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে রফতানি খাতকে আরো টেকসই ও শক্তিশালী করার পথও তৈরি হবে।



