চীনের সাথে জোরালো সম্পর্ক ভারতের ক্ষেত্রে স্থবিরত

সরকারের ১৮০ দিন

Printed Edition

কূটনৈতিক প্রতিবেদক

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর বিএনপি সরকার পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ বা ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতি গ্রহণ করেছে। এই নীতি বাস্তবায়নে বাংলাদেশের স্বার্থকে সমুন্নত রেখে সব দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করছে সরকার। তবে আঞ্চলিক দুই বৃহৎ শক্তি চীনের সাথে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সরকার যতটা সক্ষম হয়েছে, ভারতের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অংশগ্রহণে দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিধানসভা নির্বাচনের আগে-পরে দুই রাজ্যের বিজেপির নেতৃবৃন্দের বাংলাদেশবিরোধী কথাবার্তা এবং পুশইনের নামে ভারতের বাংলাভাষীদের বাংলাদেশের ভেতর ঠেলে দেয়ার অপচেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির সরকার গঠনের আগে-পরে বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক জোরদারে ভারত যে বার্তা দিয়ে এসেছিল, বিদ্যমান পরিস্থিতি তার চেয়ে ভিন্ন। ভারতের এই দ্বিমুখী আচরণে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ভারত তাই শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনায় গুরুত্ব দিচ্ছে। এর পথ সুগম করতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাতের পরদিনই দিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠক করেছেন।

অন্য দিকে ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সই হওয়া বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের থিঙ্কট্যাঙ্ক ও গণমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা হলেও সংসদের আলোচনায় ইস্যুটি গুরুত্ব পায়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান চুক্তিটির পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছেন, যিনি সার্বিক আয়োজনের অন্যতম কারিগর ছিলেন। দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত সার্জিয়ো গোর সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করে গেলেও তা নিয়ে আলোচনার চেয়ে সমালোচনাই বেশি হয়েছে। এই সফরে গোর বিরোধী দলগুলোর সাথে সাক্ষাৎ না করলেও দীনেশ ত্রিবেদীর সাথে বৈঠক করেছেন। তিনি দিল্লিতে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ভারতের প্রভাবমুক্ত হয়ে কতটা ভূমিকা রাখতে পারবেন তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ সফর শেষে গোর যৌথ সংবাদ সম্মেলন বা কার্যকর কোনো বিবৃতি না দেয়ায় সার্বিক বিষয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। মালয়েশিয়া সফরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার প্রেক্ষাপটে দেশটিতে বাংলাদেশের কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা ও জনশক্তির বাজার আবারো উন্মুক্ত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ায় গুরুত্ব, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে মুক্ত বাজার অর্থনীতি (এফটিএ) চুক্তি সইয়ে সম্মতি এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন, পর্যটন ও সন্ত্রাসদমনে সহযোগিতা সংক্রান্ত একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। অন্য দিকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং সামরিক ও বৈশ্বিক রাজনীতির দিক থেকে ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠা চীনের সাথে উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ সহযেগিতা, মংলা সমুদ্র বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন, মংলা বন্দর অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা, চট্টগ্রাম অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল উন্নয়নসহ মোট ১৭টি দলিল সই হয়েছে। এই সফরে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (জিডিআই) সাথে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন সামর্থ্য অনুযায়ী সমর্থন ও সহায়তা দিতে সম্মত হয়েছে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ ত্বরান্বিত করতে উভয় দেশের বিশেষজ্ঞরা কাজ করবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ৫ থেকে ৭ জুন তিন দিনের সরকারি সফরে বাংলাদেশে এসেছেন। ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে তুরস্কের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। হাকান ফিদান এই সফরকে বাংলাদেশের সাথে তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে কৌশলগত পর্যায়ে উন্নীত করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছেন। উভয় দেশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের নিয়মিত পরামর্শ সভা এবং দুই দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে ২+২ বার্ষিক পরামর্শ সভা শুরু করতে সম্মত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এক দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে দুই বিলিয়ন ডলার করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নিউ ইয়র্কে ২ জুন অনুষ্ঠিত জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন। জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠিত গোপন ব্যালটের নির্বাচনে তিনি সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস কাকুরিসকে ৯৯-৯১ ভোটে পরাজিত করেন। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে এক বছরের জন্য সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন খলিলুর রহমান। অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে সাইপ্রাসের মতো শক্তিশালী দেশকে নির্বাচনে হারানোটা সরকারের সফলতা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ১৯৮৬ সালে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী। খলিলুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে সভাপতিত্ব করবেন।

সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের (বিইআই) প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবির গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতিকে সামনে রেখে সরকার কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এই উদ্যোগগুলো ফলপ্রসূ হলে আমাদের জন্য কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক সুযোগ সৃষ্টি করবে। প্রধানমন্ত্রী প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রয়োজন। এক্ষেত্রে চীন ও মালয়েশিয়া বাংলাদেশকে সহায়তা করতে পারে। চীনের সহায়তায় মংলা সমুদ্র বন্দর উন্নয়ন ও সম্প্রসারন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর ধারে চীনের অর্থনৈতিক শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি উদ্যোগ হিসেবে ভালো হয়েছে, বাস্তবায়নের জন্য সময়ের প্রয়োজন হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিবাচকভাবে সক্রিয় রয়েছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, আমরা জ্বালানি খাতসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে তাদের সহযোগিতা চাচ্ছি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে উচ্চ পর্যায়ের কয়েকটি সফর হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন। অন্য দিকে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্থবির হয়ে আছে। ভারতে দ্বিপক্ষীয় ও ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের আউটরিচ অধিবেশনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে দিল্লি গেলে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক স্বাভাবিকরন প্রক্রিয়াটা গতি পেতে পারে। সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ভারতের সাথে আমাদের দ্বিপক্ষীয় ইস্যুগুলো নিয়ে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হবে। কাজেই এক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি, ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ রয়েছে, এখন ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

হুমায়ুন কবির বলেন, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকারের সময়েও দেশটির সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক রয়েছে। পাকিস্তানের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদারের সুযোগ রয়েছে। এটা নিয়ে কাজ হচ্ছে। এর বাইরে শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতেও দুই দেশের সম্পর্ক সম্প্রসারনের সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমারের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে আমরা কোনো সমাধান দেখতে পাচ্ছি না।

মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চিত পরিস্থিতি বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গালফ অঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসতে ইরান যুদ্ধের সমাপ্তি প্রয়োজন। এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল, গ্যাস ও সার আমদানি এবং আমাদের জনশক্তির কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা না ফিরলে এই প্রভাব অব্যাহত থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির ওপর আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমরা কেবল অপেক্ষা করতে পারি।

সৌদি আরবের নেতৃত্বে গঠিত সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সম্পর্কে বিইআই প্রেসিডেন্ট বলেন, লোহিত সাগর ইউরোপ ও আমেরিকায় আমাদের আমদানি-রফতানি জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল বাধামুক্ত রাখার প্রচেষ্টা থেকে আমরা সৌদি জোটে যোগ দিয়েছি। বাংলাদেশের এই অবস্থান সঠিক এবং নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্য। তবে সৌদি জোটের সাথে আমাদের সংশ্লিষ্টতা হবে প্রতীকী। সীমিত সক্ষমতা নিয়ে ওই অঞ্চলের সঙ্ঘাতে আমরা জড়াতে চাই না।