সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধের জেরে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে অপরিশোধিত তেলের দাম এখন ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছুঁই ছুঁই করছে। এর উত্তাপ ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও পড়তে শুরু করেছে। ফলে চলতি অর্থবছরে জ্বালানি খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ আরো বেড়ে যেতে পারে। শঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে পরিস্থিতির আশু উন্নতি না হলে শুধু জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই বাস্তবতায় চলতি সপ্তাহে অর্থ মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটি বৈঠকের আয়োজন করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। এই বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের আর্থিক খাতের ওপর চাপ সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের জন্য একটি পেপার তৈরি করা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এতে জ্বালানির দাম সমন্বয় (বৃদ্ধি) করার প্রস্তাব দেয়া হতে পারে। তবে এর পাশাপাশি মূল্য না বাড়িয়ে জ্বালানি আমদানির ওপর বিদ্যমান কর হ্রাসেরও প্রস্তাব দেয়ার চিন্তা করা হচ্ছে। এটি অর্থমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করা হবে। অর্থ ও জ্বালানি বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
অর্থ বিভাগের সূত্র জানায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ খাতের জন্য ভর্তুকি বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে এলএনজি খাতে ভর্তুকি ধরা রয়েছে আরো ছয় হাজার কোটি টাকা। এখন পর্যন্ত এ খাতে ভর্তুকির অর্থ ছাড় করা হয়েছে ২০ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা। ফলে অব্যয়িত অর্থ রয়েছে ১৫ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। এ ছাড়াও বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য দুই হাজার কোটি টাকা বকেয়া অর্থ চাওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত এই অর্থের বিষয়ে কোনো সুরাহা হয়নি বলে জানা গেছে। এর বাইরে ভারতের আদানির বেশ খানিক অর্থ বকেয়া রয়ে গেছে।
এখন বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল ও এলএনজির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ভর্তুকির ওপর নতুন করে চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের আগে অর্থাৎ ১০ দিন আগেও আমরা দুই কার্গো এলএনজি আমদানি করেছি এক হাজার কোটি টাকা দিয়ে। এখন সেই দুই কার্গো এলএনজিই স্পট মার্কেট আমদানি করতে দুই হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এই ক্রয় প্রস্তাবটি গত বৃহস্পতিবার অনুমোদনও করা হয়েছে। এই এলএনজির বেশির ভাগই ব্যবহৃত হয় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্টে। এখন দেশের বাজারে যদি জ্বালাানি তেল ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি না করা হয় তবে এই খাতে ভর্তুকির পরিমাণ বছর শেষে যে অনেক বেড়ে যাবে তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। দাম বাড়ানোর বিষয়ে এখনি সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে কি না তা বলা যায় না। কারণ গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতি আট থেকে ১০ শতাংশের ঘরে রয়েছে। এই অবস্থায় যদি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয় তবে মূল্যস্ফীতি তো বাড়বেই, উপরন্তু ঈদের আগে সবধরনের গণপরিবহনের ভাড়া বেড়ে যাবে। তাই সরকারের এই মুহূর্তে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম না বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে। তবে পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে অবাক হবার কিছুই থাকবে না। তখন জ্বালানির ওপর আমদানি শুল্ক কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে। এ দিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক সপ্তাহের ব্যবধানে ৩০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। গত শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৮.৫ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেল-প্রতি ৯৩ মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে, যা গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আমরা চলতি সপ্তাহেই একটি বৈঠকের আয়োজন করতে যাচ্ছি। এতে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। তবে বিদ্যুৎ ও এলএনজি খাতে দাম সমন্বয় না করা হলেও বছর শেষে এই দুই খাতে রেকর্ড পরিমাণ ভর্তুকির অর্থ সরকারকে বহন করতে হবে। এটি ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। যা কিনা সার্বিক আর্থিক শৃঙ্খলাকে নাজুক করে তুলতে পারে।
বিগত পাঁচ অর্থবছরে বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে দুই লাখ ছয় হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে প্রায় এক লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা এবং ৬৮ হাজার কোটি টাকা দেয়া হয়েছে গ্যাস ও জ্বালানির অন্যান্য খাতে। ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর সময়কালে এ পরিমাণ অর্থ ভর্তুকি দিয়েছে সরকার। অর্থবছর ধরে ভর্তুকির পরিমাণ বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, এই পাঁচ বছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি বেড়েছে ৫৯৩ শতাংশ এবং জ্বালানি খাতে ৩১০ শতাংশ।
অর্থ মন্ত্রণালয়ে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিদ্যুতে বিপিডিবিকে ভর্তুকি দেয়া হয়েছে আট হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ভর্তুকি তিন হাজার ১৮ কোটি টাকা বেড়ে দাঁড়ায় ১১ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দেয়া হয় ২৩ হাজার কোটি টাকা, যা তার আগের অর্থবছরের চেয়ে ১১ হাজার ৩৭ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ভর্তুকি দেয়া হয় ৩৩ হাজার কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ সংশোধিত অর্থবছরে বিপিডিবির ভর্তুকি ছিল ৬২ হাজার কোটি টাকা। বিগত পাঁচ অর্থবছরের হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিদ্যুতের ভর্তুকি পাঁচ অর্থবছরের ব্যবধানে ৫৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে এই ভতুর্কি ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।


