সিরাতুন্নবী সা: - সংখ্যা ২০২৫

রবিউল আউয়ালের বার্তা

মাওলানা লিয়াকত আলী
Printed Edition

হিজরি বর্ষপঞ্জির তৃতীয় মাস রবিউল আউয়াল। আরবি রবিউল আউয়াল শব্দের অর্থ প্রথম বসন্ত কিংবা বলা যেতে পারে বসন্তের সূচনা। বসন্তের আগমনে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় নবজাগরণ। প্রকৃতির পরতে পরতে জাগৃতি ও সজীবতার নতুন স্পন্দন তৈরি হয়। পত্রপল্লবে নয়া সাজ আসে উদ্ভিদ জগতে। বাগিচার প্রতিটি গাছে সমারোহ ঘটে ফুলকলির। হিন্দোলে হিন্দোলে আন্দোলিত হয় গাছগাছালি পাখ-পাখালির সাথে প্রাণিকুলের হৃদয়জগৎও। পরিবেশ ও প্রতিবেশ মোহিত হয় তাজা ফুলের সুরভিতে। উদ্ভিদজগতের শ্যামল শোভার সাথে পশু-পাখিরাও উদ্বেলিত হয় স্বাস্থ্যপ্রদ আবহাওয়ার ছোঁয়ায়। তার প্রভাব পড়ে মনুষ্য সমাজে।

হ্যাঁ, এমন এক বসন্ত এসেছিল দেড় হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে সারা বিশে^ মানবতার জগৎ যখন গ্রীষ্মের খরতাপ ও শীতের জড়তায় কাবু হয়ে পড়েছিল, মানুষের মনুষ্যত্ব যখন পশুত্বের শিকার হয়ে আশরাফুল মাখলুকাতের সুউচ্চ অবস্থান থেকে অধঃগতির টানে নেমে গিয়েছিল নিকৃষ্টতার নি¤œতম স্তরে, তখন এই মানবতা অপেক্ষার প্রহর গুনছিল নতুন এক বসন্তের আগমনের। তাদের আগ্রহ ও আকাক্সক্ষা চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল এমন কোনো অতিপ্রাকৃত বসন্তের হাওয়ার, যার প্রভাব ও প্রবাহে বিশ^ জগতে সূচিত হতে পারে সুখময় পরিবর্তন ও শান্তিময় দিন বদলের।

৫৭১ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে মরু আরবের এক জীর্ণ কুটিরে মা আমিনার কোল উজালা করে পৃথিবীর মাটিতে শুভাগমন ঘটলো যে শিশুটির, মায়ের উদরে থাকার সময়েই পিতৃহারা হওয়া যে শিশুটির আগমনে দাদা আবদুল মুত্তালিব আনন্দের আতিশয্যে উদ্বেলিত হয়েছিলেন, আর তাকে মুহাম্মদ বলে এক অসাধারণ নাম দিলেন, নামেই যার প্রশংসনীয় সবগুণের অধিকারী হওয়ার ইঙ্গিত দিলেন, তিনিই তো সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তি, যার আগমনে পৃথিবীতে মানবজগতে বসন্তের পুনরাগমনের বার্তা ঘোষিত হবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলেন মহাবিশে^র এক ও অদ্বিতীয় ¯্রষ্টা ও নিয়ন্তা। এই মহামনীষীর জন্মের সময়টা ছিল রবিউল আউয়াল মাস। রজনীর কৃষ্ণ ছায়ার বিদায় ও প্রভাতের আগমনের মুহূর্তে তাকে পৃথিবীর আলো বাতাসের মাঝখানে আবির্ভাব ঘটিয়ে এ জগতে যে নতুন বসন্তের সূচনা করা হচ্ছে, তা টের পেয়েছিল প্রকৃতির ভাষাহীন সব মহল। তাই তারা হেসে উঠেছিল নতুন মেহমানের আগমনে। বৃক্ষলতা ও পশু-পাখিরা সেদিন প্রথম শব্দ করেছিল মহান অতিথিকে স্বাগত জানিয়ে। আর ভোরের বাতাস এই সুখবর নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল দিক দিগন্তে। প্রকৃতির জগৎ তাকে আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ হিসেবে চিনতে পেরেছিল প্রথম দিন থেকেই। এজন্য শৈশব ও কৈশোরকালে তার অনুপম চরিত্র মাধুর্য ও অনন্য গুণাবলির অধিকারী হিসেবে সাধারণ মানুষেরা মুগ্ধ হওয়ার আগেই জড় পদার্থ ও উদ্ভিদের পক্ষ থেকে তিনি পেয়েছেন সম্ভাষণ।

মক্কা ও আরব সমাজে অবিসংবাদিত এই ব্যক্তিটিকে ৪০ বছর বয়সের সময় ঘোষণা করা হলো ¯্রষ্টার প্রেরিত ও বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে। নবুওয়াত ও রিসালাতের মহান দানে তাকে ভূষিত করা হলো। দায়িত্ব অর্পণ করা হলো নিজ গোত্র ও সমাজের মানুুষের কাছে জগৎপ্রভুর একত্বের বাণী প্রচারের। শিরক ও কুফরের আবিলতা থেকে অন্তরজগৎকে শুদ্ধ করতে আহ্বান জানাতে আদেশ করা হলো তাকে। বিপত্তি ঘটল এখানেই। অনুপম চরিত্র ও নিষ্কলুষ নৈতিকতায় যিনি এতদিন প্রশ্নাতীত ছিলেন, যার সততা ও সাধুতার স্বীকৃতি দিতে কারো সামান্যতম কুণ্ঠা ছিল না, জগৎপ্রভুর তাওহিদে বিশ^াসের আহবান জানানোর কারণে তার শত্রু হয়ে দাঁড়ালো সেই মানুষেরা, যারা পৃথিবীবাসীর ইবাদতের জন্য নির্মিত প্রথম ঘরের প্রতিবেশী হিসেবে পরিচিত হতে গর্ববোধ করতো। নবীর দাওয়াতে যারা সাড়া দিয়েছেন, পৌত্তলিকতা ও প্রকৃতিপূজার পঙ্কিলতা থেকে যারা নিজেদের পরিশুদ্ধ করেছেন, সেই মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের মাত্রা বেড়ে গেল দুঃসহনীয়ভাবে। স্বয়ং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপরেও আঘাত হানতেও এতটুকু দ্বিধা করল না এই অবিশ^াসীরা। তাই এক পর্যায়ে ইয়াসরিব পল্লীর বাসিন্দাদের প্রস্তাবে তিনি স্বয়ং সেখানে হিজরত করলেন। মক্কার আবাসভূমি ছেড়ে তার সাথী হলেন প্রায় সব অনুুসারী। ইয়াসরিব পল্লীর নাম বদলে হয়ে গেল মদিনাতুন নবী বা সংক্ষেপে মদিনা। ইসলামের প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের অনুকূল পরিবেশ মিলল। অচিরেই মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের নিয়ে স্থানীয় ইহুদি জনগোষ্ঠীর সাথে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সনদ প্রণয়ন করলেন এবং বিশ^বাসীকে উপহার দিলেন ইতিহাসের প্রথম লিখিত শাসনতন্ত্র। মদিনার সনদ নামে আখ্যায়িত এই দলিল মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনন্য সংযোজন।

আল্লাহর নবী ও তাঁর অনুসারীরা মদিনায় নির্বিঘেœ বসবাস করার সুযোগ পেলেন না। মক্কার কুরাইশরা নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার সুযোগকে সদ্ব্যবহার না করে প্রথম থেকেই যে আচরণ করে আসছিল, এতদিনে তাতে মোটেই পরিবর্তন আনল না। বরং নবী ও তাঁর অনুসারীদের সাথে তাদের দুশমনি এখন সশস্ত্র আক্রমণের পথে অগ্রসর হলো। তাই সামরিক উপায়ে তাদের মোকাবেলা করার অনুমতি দেয়া হলো সত্যধর্মের প্রচারক ও তার সহচরদের। বিশ^বাসীর জন্য চূড়ান্ত জীবন নির্দেশিকা আল কুরআনুল কারিমের সূরা হজের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াত নাজিল হলো এই অনুমতির বিধান নিয়ে। ইরশাদ হলো- যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, তাদের অনুমতি দেয়া হলো। কেননা তারা অত্যাচারিত হয়েছে। আর আল্লাহ তাদের সাহায্য করতে নিশ্চয়ই সক্ষম। যাদেরকে নিজেদের বাড়ি থেকে শুধু এজন্য অন্যায়ভাবে বের করে দেয়া হয়েছে যে, তারা বলে আমাদের প্রভু আল্লাহ।

মহান প্রভুর পক্ষ থেকে অনুমতি লাভের পর কাফেরদের সাথে মুসলমানদের প্রথম সশস্ত্র সামরিক মোকাবেলা হয় বদর প্রান্তরে। একবারেই অসম ছিল সেই যুদ্ধ। একদিকে সুসজ্জিত ও উপকরণ সমৃদ্ধ সহ¯্র সৈন্যের বাহিনী। অন্যদিকে এই বাহিনীর এক-তৃতীয়াংশের চেয়েও কম মাত্র ৩১৩ জন প্রায় নিরস্ত্র ও সরঞ্জামহীন মুজাহিদকে নিয়ে নেমেছেন আল্লাহর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। যুদ্ধাস্ত্র ও যুদ্ধ সামগ্রীর দিক দিয়ে তারা অসহায় হলেও তাদের প্রধান সম্বল ও পুঁজি ছিল মহান রাব্বুল আলামিনের প্রতি ঈমান ও তাওয়াক্কুল। তাদের এই সম্বলই বেশি কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হলো। অবিশ^াসীদের দর্প ও দম্ভ চুরমার হয়ে গেল অল্পক্ষণের মধ্যে। কাফেরদের প্রায় সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিই নিহত হলো। সাথীসহ তাদের নিহতের সংখ্যা দাঁড়াল ৭০। বন্দী হলো আরো ৭০ জন। অন্যদিকে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের মধ্যে মাত্র ১৪ জন শাহাদতের অমিয় সুধা পান করলেন। মানবসভ্যতার ইতিহাসে অনন্য অধ্যায়ের সংযোজন হলো। খোদায়ি মদদের সামনে পার্থিব সামগ্রী ও উপকরণাদির অকার্যকারিতা আবারো প্রমাণিত হলো পৃথিবীবাসীর সামনে।

বদরের পর উহুদ, খন্দক, খায়বর ইত্যাদি যুদ্ধেও আল্লাহর নবীর প্রচারিত দ্বীনের সত্যতা প্রমাণিত হলো। এতদিন বিরোধিতা করে আসা মক্কার কুরাইশরা বাধ্য হলো আল্লাহর নবী ও মুসলমানদের সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদনে। হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত এই চুক্তির সুবাদে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবকাশ পেলেন সমকালীন বিশে^র পরাশক্তিগুলোর উদ্দেশে দাওয়াতি পত্র প্রেরণের। পারস্য-রোমান-মিসর-হাবশার স¤্রাটদের আহবান জানানো হলো পার্থিব ও পরকালীন জীবনের শান্তি ও সুখের নিশ্চয়তার স্বার্থে ইসলামের ছায়ায় আগমনের। এভাবে শেষনবী নিজের বিশ^জনীনতার প্রমাণ দিলেন।

মক্কার কুরাইশরা হুদায়বিয়ার সন্ধি লঙ্ঘন করল। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিকার দাবি করলেন। কুরাইশরা তাতে আন্তরিকতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হলো। ফলে মক্কায় অভিযান চালানো অনিবার্য হয়ে পড়ল। প্রায় বিনা রক্তপাতে মক্কার পবিত্র ভূমিতে ইসলামের পতাকা স্থাপিত হলো। রচিত হলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে নবতর অধ্যায়। বিজিতদের সাথে বিজয়ীদের আচরণের অনুপম আদর্শ স্থাপন করলেন আল্লাহর নবী। কুরাইশদের ওপরে মহানবীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল আরবের অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠী। মক্কা বিজয়ের মাধ্যমে তাদের ইসলাম গ্রহণের সব প্রতিবন্ধকতা দূর হলো। গোটা আরব উপদ্বীপে এক অদ্বিতীয় মহান প্রভু ছাড়া অন্য কারো ইবাদতের মানুষ রইল না। নগর-পল্লীর প্রতিটি বাসস্থানে পৌঁছে গেল ইসলামের বাণী ও বার্তা। গোটা আরব ভূমিতে ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠা সম্পন্ন হওয়ার পর হিজরতের দশম বছরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বয়ং গেলেন হজ পালনে। লক্ষাধিক মুসলমানকে নিয়ে তিনি যখন জিলহজ মাসের ৯ তারিখে আরাফা ময়দানে অবস্থান করছিলেন, তখন নাজিল হলো কুরআন মাজিদের সূরা মায়েদার ৩ নম্বর আয়াত। তাতে ঘোষণা করা হলো মানবজাতির প্রতি নির্দেশিকা প্রেরণের খোদায়ি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন হওয়ার, বনি আদমের জন্য প্রেরিত বিধানের পূর্ণাঙ্গতা দানের এবং দ্বীন হিসেবে ইসলামের অদ্বিতীয়তার বার্তা। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপস্থিত মানুষকে আল্লাহ তাআলার এ বাণী শোনানোর পাশাপাশি ঘোষণা করলেন মানবাধিকারের মৌলিক ধারাগুলো। বিশ^বাসী ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শুনতে পায় মানবাধিকারের সার্বজনীন ঘোষণা। ভৌগোলিক, আদর্শিক ও প্রশাসনিক সীমারেখায় বিভক্ত হয়ে পড়া আদম সন্তানদের যদি আবার ঐক্যবদ্ধ করতে হয়, আদম-হাওয়ার সন্তান হিসেবে আবার একটি পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে শান্তিপূর্ণ ও সুষম ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হয়, তাহলে বিশ^বাসীর সামনে এই একটিই মূলনীতি ও সূত্র বিদ্যমান। এ সত্য স্বীকার ও পালনে বিশ^সমাজ যত দ্রুত অগ্রসর ও প্রস্তুত হবে, আসমানের নিচে ভূপৃষ্ঠে তত তাড়াতাড়ি প্রবাহিত হবে শান্তি ও স্বস্তির সুবাতাস।

হজ পালনের পর মদিনায় ফিরে অল্পকালের মধ্যে আল্লাহর শেষনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসুস্থ হলেন। রাব্বুল আলামিনের অমোঘ বিধান অনুযায়ী তার পৃথিবীর জীবনকাল সমাপ্ত হলো। আপন প্রভুর আহবানে সাড়া দিয়ে তিনি চলে গেলেন অন্তরালে। এটাও ঘটল রবিউল আউয়াল মাসে। সুতরাং রবিউল আউয়াল একই সাথে দুনিয়াতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভাগমন ও দুনিয়া থেকে তিরোধানের মাস। তাই এ মাস যেমন নিছক আনন্দ উৎসবে কাটানোর জন্য নয়, তেমনি শোক পালনের উপলক্ষও হওয়া সমীচীন নয়। বরং শেষনবীর রেখে যাওয়া শরিয়ত পরিপালনে যতœবান হওয়ার এবং নবীর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনের সব ক্ষেত্র ও স্তরকে সাজানোর প্রতিজ্ঞার আহবান নিয়ে প্রতি বছর আগমন করে মাহে রবিউল আউয়াল।