পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্মম বাস্তবতা

পদ দখলের লড়াইয়ে জাঁতাকলে শিক্ষার্থীরা

হারুন ইসলাম
Printed Edition

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা খাতের মূল চালিকাশক্তি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এগুলো সবসময়ই জাতীয় রাজনীতির পটপরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়। চব্বিশের ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান এবং পরবর্তী প্রশাসনিক শূন্যতা ক্যাম্পাসগুলোকে স্থবির করে দিয়েছিল, যার জেরে তৈরি হয় ভয়াবহ এক নতুন সেশনজট। এরপর ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন উপাচার্যরা (ভিসি) দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু ক্ষমতার এই হাতবদলের পর শিক্ষক রাজনীতিতে আদর্শিক লড়াইয়ের চেয়ে পদ-পদবি ভাগাভাগি এবং ক্ষমতার সুপ্ত কোন্দলই এখন প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। শিক্ষাবিদদের চেয়ার দখলের এই ব্যস্ততা উচ্চশিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশকে নতুন সঙ্কটে ফেলেছে।

মূলত জুলাই-আগস্টের ছাত্র আন্দোলনের সময় দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। স্বৈরাচারী সরকার পতনের পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো অভিভাবক না থাকায় তিন-চার মাস সম্পূর্ণ অচলাবস্থা চলে, যার ফলে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত ৬ থেকে ৯ মাসের তীব্র সেশনজট তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের বেশ কয়েকটি শিক্ষাবর্ষের চূড়ান্ত পরীক্ষা মাঝপথে আটকে যায়। নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নিয়ে পরীক্ষা শুরু করতে বিপুল সময় নেয়। পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে না হতেই আসে ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের পর ভিসি থেকে শুরু করে প্রধান প্রশাসনিক কাঠামোতে আবারো বড় পরিবর্তন আসে। দফায় দফায় এই পরিবর্তনের ফলে স্নাতক শেষ বর্ষ ও স্নাতকোত্তরের হাজার হাজার শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, নির্দিষ্ট সময়ে ডিগ্রি শেষ না হওয়ায় তাদের চাকরির বয়স শেষ হয়ে যাচ্ছে।

এই সঙ্কটের একটি বড় কারণ তৈরি করেছেন সাবেক ক্ষমতাসীন দলপন্থী শিক্ষকেরা। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের ঠিক আগে, গত বছরের ১-৩ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে আওয়ামীপন্থী ‘নীল দল’ সংবাদ সম্মেলন ও মিছিল করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী চক্র’ ও ‘স্বার্থান্বেষী মহল’ হিসেবে আখ্যা দেয়। তৎকালীন ফ্যাসিবাদের সাথে সুর মিলিয়ে শিক্ষকদের এই অবস্থান শিক্ষার্থীদের চরমভাবে ক্ষুব্ধ করে। ফলশ্রুতিতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষকদের পুরোপুরি বয়কট করেন। গত দুই বছর ধরে এই শিক্ষকরা কোনো ক্লাস, পরীক্ষা বা থিসিস মূল্যায়ন করতে পারছেন না। অনেকেই বিভাগে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থেকেও লাখ লাখ টাকা বেতন-ভাতা তুলছেন। শিক্ষকদের এই দীর্ঘমেয়াদি অনুপস্থিতি একাডেমিক সঙ্কটকে আরো তীব্র করেছে।

চব্বিশের পটপরিবর্তনের পর বিতর্কিত ও দলকানা শিক্ষকদের ক্লাস বর্জন এবং গণ-পদত্যাগের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজিরবিহীন প্রশাসনিক শূন্যতা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান নির্বাচিত সরকার দফায় দফায় ভিসি নিয়োগ দেয়। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি এসেও দেশের শীর্ষস্থানীয় অন্তত ১৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে-যার মধ্যে বুয়েট, ঢাবি, রাবি, চবি, জকসু, ইবি, নোবিপ্রবি এবং ববি অন্যতম-ভিসি পরিবর্তন করা হয়েছে। ঘন ঘন এই পরিবর্তনের কারণে নীতিগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হচ্ছে এবং সেশনজট কাটাতে যে দীর্ঘমেয়াদি ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ দরকার ছিল, তা আলোর মুখ দেখছে না।

এদিকে, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ‘নীল’ ও ‘সাদা’ দলের স্পষ্ট দ্বিমুখী মেরুকরণ থাকলেও বর্তমানে নীল দল দৃশ্যপট থেকে উধাও। ফলে বিএনপিপন্থী সাদা দল এবং বাম ও ইসলামপন্থী শিক্ষকদের প্রভাব একচ্ছত্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখন এই একক ভাবধারার মধ্যেই নতুন কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং তৈরি হয়েছে। অনুসন্ধান করে দেখা গেছে, নতুন ভিসিরা দায়িত্ব নেয়ার পর যোগ্যতার চেয়ে ‘আনুগত্য’ দেখে নিজস্ব বলয় তৈরি করছেন। সাদা দলের এক পক্ষ নিজেদের ‘আন্দোলনের ত্যাগী’ দাবি করে সব গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে ধরতে চাইছে, অন্য দিকে অন্য পক্ষটি ভিসি কর্তৃক অবমূল্যায়িত হওয়ার অভিযোগ তুলছে। শিক্ষকরা এখন অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় শিক্ষার মান নিয়ে কথা না বলে পদায়ন ও চেয়ার দখল নিয়ে বাগবিতণ্ডায় লিপ্ত হচ্ছেন।

ক্যাম্পাসভিত্তিক অস্থিরতার চিত্র আরো উদ্বেগজনক। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের প্রাধ্যক্ষ ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক পদ নিয়ে ‘সংস্কারপন্থী’ শিক্ষকদের কোন্দলে সাধারণ প্রশাসনিক ফাইল আটকে থাকছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি পদে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে শিক্ষকদের একাধিক উপদল তৈরি হয়েছে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে তীব্র শিক্ষক সঙ্কট থাকলেও অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কোন্দলের কারণে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া ঝুলে আছে।

ঢাকা ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানান, তারা ভাইদের রক্ত দিয়ে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করেছিলেন শিক্ষকদের পদ ভাগাভাগি দেখার জন্য নয়। শিক্ষকরা খাতা মূল্যায়ন না করে প্রশাসনিক ভবনে লবিংয়ে ব্যস্ত থাকায় ফল প্রকাশে মাসের পর মাস দেরি হচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গুচ্ছ পদ্ধতি থেকে বের হয়ে নিজস্ব স্বতন্ত্র ভর্তি পরীক্ষা চালু করলেও প্রশাসনিক গ্রুপিংয়ের কারণে অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডার ঠিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক কর্মকর্তা এবং উচ্চশিক্ষা বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরলোকগত ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘শিক্ষকরা যখন ক্লাসরুম আর গবেষণাগার ছেড়ে ভিসির দফতরে পদের জন্য ঘোরেন, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অবশিষ্ট থাকে না। ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশের স্বায়ত্তশাসন মুক্তবুদ্ধির চর্চার জন্য দেয়া হয়েছিল, ক্ষমতার হাতিয়ার বানানোর জন্য নয়।’

উচ্চশিক্ষা সংস্কারকর্মী অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন মনে করেন, শুধুমাত্র ভিসির মুখ পরিবর্তন করে কোনো লাভ নেই, এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। একদল যাওয়ার পর আরেক দল এসে চেয়ার দখলের লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি শুরু করেছে। এর সমাধানে ভিসি নিয়োগে নিরপেক্ষ সার্চ কমিটি গঠন করে প্রকৃত গবেষকদের দায়িত্ব দিতে হবে। ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘এই সেশনজট জাতীয় জীবনের জন্য অশনিসঙ্কেত। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ‘ক্র্যাশ প্রোগ্রাম’ হাতে নিয়ে ছুটির দিনগুলোতে অতিরিক্ত ক্লাস-পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষার মানকে রক্ষা করতে হলে শিক্ষকদের নোংরা অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। শিক্ষকরা যদি তাদের নৈতিক জায়গা পুনরুদ্ধার করতে না পেরে শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের চেয়ে নিজেদের পদ-পদবিকে বড় করে দেখেন, তবে উচ্চশিক্ষার এই সঙ্কট অচিরেই এক অপূরণীয় জাতীয় বিপর্যয়ে রূপ নেবে।